বরিশালে এখনো নৌকার প্রার্থীর পাশে নেই স্থানীয় নেতাকর্মীরা

আওয়ামী লীগের মনোনয়নের ১৫ দিনেও জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা পাশে না থাকায় সাবেক ও বর্তমান ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। গতকাল শনিবার বিকালে বরিশাল শিল্পকলা একাডেমিতে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে সাবেক ও বর্তমান ছাত্রলীগ নেতাদের মতবিনিময়কালে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। 

মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী কর্নেল (অব.) জাহিদ ফারুক শামীম এমপি বলেন, বরিশালবাসীর জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা বরিশালবাসীর অন্তরের কথা। জনগণ শান্তিতে বসবাস করতে চেয়েছিলেন আর প্রধানমন্ত্রী দক্ষিণাঞ্চলবাসীর মনের কথা বুঝে সৎ ব্যক্তিকেই মনোনীত করেছেন। জনগণের যত আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণসহ শান্তির বরিশাল গড়তে খোকন সেরনিয়াবাতকে নৌকার পক্ষে কাজ করে যাওয়ার আহ্বান জানান। দল-মত নির্বিশেষে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে বরিশালে আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে খোকন সেরনিয়াবাতকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করতে হবে। 

এ সময় আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী আবুল খায়ের আবদুল্লাহ (খোকন সেরনিয়াবাত) বলেন, বিগত দিনে যত অনিয়ম হয়েছে তা ঠিক হবে, যদি তাকে নির্বাচিত করে জনগণ। পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী কর্নেল (অব.) জাহিদ ফারুক শামীম এমপি ভাই, আমি-আমরা দুই ভাই মিলে বরিশালকে একটি আধুনিক সমৃদ্ধশালী স্মার্ট বরিশাল হিসেবে বিনির্মাণ করব। এ সময় তিনি বারবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বরিশাল মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি জসিম উদ্দিনের সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অসীম দেওয়ান, বিএম কলেজ বাকসুরর সাবেক ভিপি মঈন তুষার, মহানগর যুবলীগের আহবায়ক নিজামুল ইসলাম নিজাম, যুগ্ম আহ্বায়ক মাহামুদুল হক খান মামুনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

গত ১৫ দিনে বরিশাল সদর আসনের এমপি ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী কর্নেল (অব.) জাহিদ ফারুক শামীম ও সাবেক প্রয়াত মেয়র শওকত হোসেন হিরনের অনুসারীরা মাঠ পর্যায়ে সরব থেকে নির্বাচনি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করছেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়ে আবেদন করা প্রার্থীরাসহ ১০ জন ওয়ার্ড কাউন্সিলর, বিসিক শিল্প নগরীর এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী শো-ডাউনসহ নানান কর্মতৎপরতার মাধ্যমে নিজেদের জানান দিচ্ছেন। বিগত সাত-আট বছর যাবত এদের সঙ্গে বর্তমান মেয়রের বিরোধ থাকায় তারা কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ও নৌকা প্রতীকের প্রার্থীকে নিয়ে নির্বাচনি বৈতরণী পার হতে চাচ্ছেন। সর্বশেষ প্রার্থীর প্রধান কার্যালয় উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে সাবেক শিল্পমন্ত্রী আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য বর্ষীয়ান নেতা আমির হোসেন আমু, প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ বক্তৃতা করেন। দীর্ঘদিন পর বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ আমির হোসেন আমু ও জাহাঙ্গীর কবির নানক বরিশালের নেতাকর্মীদের মাঝে অবস্থান করায় সাদিকবিরোধী শিবিরে আনন্দ-উল্লাস পরিলক্ষিত হচ্ছে। এসব নেতাকর্মী জানিয়েছেন, শওকত হোসেন হিরনের মৃত্যুর পর তার অনুসারীদের মাঝে যে সংকট ছিল, তা আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবুল খায়ের আবদুল্লাহকে পেয়ে কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে করে দীর্ঘদিন পর কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে যারা বিগত সময়ে শওকত হোসেন হিরন এর মাধ্যমে বরিশালে কর্তৃত্ব রেখেছেন তারাই বর্তমান মেয়র প্রার্থীর মাধ্যমে পূর্বের অবস্থানে যেতে চাইছেন। এতে করে দিন যতই যাচ্ছে ততই পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছে। 

এদিকে মনোনয়ন বঞ্চিত বর্তমান মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বরিশালের বাইরে অবস্থান করছেন। মনোনয়ন ঘোষণার পর সাদিক আবদুল্লাহ তার নিজস্ব ফেসবুক লাইভে জানিয়ে ছিলেন ঈদের পরে তার পিতা আবুল হাসানাত আবদুল্লাহকে নিয়েই বরিশালে ফিরবেন। বিষয়টি নিয়ে দিন যত যাচ্ছে ততই ঘোলাটে পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। তবে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এ কে এম জাহাঙ্গীর একাধিকবার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর নেতৃত্বে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ যৌথ সভা করে নৌকার প্রার্থীকে বিজয়ী করতে যা যা দরকার তাই করবেন।

বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে গত ১৫ এপ্রিল আওয়ামী লীগের নতুন মুখের প্রার্থী ঘোষণার পর থেকে এখানকার দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করে। মনোনয়ন থেকে বর্তমান মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ ছিটকে পড়ার পর তার হাতে গড়া মহানগর আওয়ামী লীগ সহ অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মাঝে হতাশা লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বিগত ১৫ দিনের মধ্যে নাগরিক সংবর্ধনা, প্রধান কার্যালয় উদ্বোধনসহ বিভিন্ন সভা-সমাবেশে আওয়ামী লীগের পদ-পদবি প্রাপ্তদের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। যদিও নাগরিক সংবর্ধনা ও দলীয় প্রার্থীর প্রধান কার্যালয় উদ্বোধনে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ কে এম জাহাঙ্গীর ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুস উপস্থিত থাকলেও তাদেরকে অসম্মান করার অভিযোগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষোদগার করছেন পদ-পদবিপ্রাপ্ত নেতারা। জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, সহ-সভাপতি সহ বিভিন্ন পদ-পদবিধারী নেতাকর্মীরা শুক্রবার আওয়ামী লীগ প্রার্থীর প্রধান কার্যালয় উদ্বোধনকালে একজন কাউন্সিলর চেয়ারে বসা থাকলেও মহানগর সভাপতি ও জেলা সাধারণ সম্পাদককে চেয়ার ব্যতীত নিচে বসতে দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষোদগার করেন। যদিও তারা কেউই আওয়ামী লীগ প্রার্থীর ঐ অনুষ্ঠানসহ কোনো সভাতেই যোগদান করেননি।

নৌকা ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রধানমন্ত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হবেন : সেরনিয়বাত সাদিক আবদুল্লাহ

এদিকে গতকাল শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বরিশাল মহানগরীর ৩০টি ওয়ার্ডের সভাপতি-সম্পাদকসহ কাউন্সিলর, ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে জুম কনফারেন্সের মাধ্যমে মতবিনিময় করেন সিটি মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ। রাজধানী ঢাকায় অবস্থানরত সাদিক আবদুল্লাহর সঙ্গে মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি এ কে এম জাহাঙ্গীর উপস্থিত ছিলেন। বরিশাল প্রান্তে নগরীর কালীবাড়ী রোডস্থ সেরনিয়াবাত ভবনে নেতাকর্মীরা যুক্ত হন। এ সময় তিনি নেতাকর্মীদের আশ্বস্ত করে বলেন, ছিলাম আছি ইনশাল্লাহ থাকব। মেয়র পদের জন্য রাজনীতি করি না। আমার বাপ-দাদারা রাজনীতি করে আসছে। অনেকে অনেক ধরনের কথাবার্তা বলবে নৌকাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে। নৌকা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেরনিয়বাত সাদিক আবদুল্লাহ, আওয়ামী লীগ ও প্রধানমন্ত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

এ সময় সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ আগামী ১২ জুন আওয়ামী লীগের প্রার্থী তার আপন চাচা আবুল খায়ের আবদুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাতকে বিজয়ী করতে প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশনা দেন। তিনি এসময় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেন, কে মনোনয়ন পেয়েছে সেটা বিষয় না। নৌকা প্রতীকের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে হবে। এ বিষয়ে কাউকে কোনো সুযোগ নিতে দেওয়া যাবে না। তিনি বারবার বলেন, মহানগর আওয়ামী লীগ নৌকাকে বিজয়ী করতে কাজ করবে। তিনি বলেন, নির্বাচনি আচরণবিধির বিষয় রয়েছে, তাই পরিকল্পনা মাফিক কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে সঙ্গে নিয়ে যৌথ সভা করে নৌকার প্রার্থীকে বিজয়ী করা হবে।

ইভিএম বাতিল ও সেনাবাহিনী মোতায়েন দাবি করে বরিশালে জাতীয় পার্টির প্রার্থীর সংবাদ সম্মেলন :

আসন্ন বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইভিএম বাতিল করে ব্যালটে ভোট গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপস। গতকাল শনিবার বেলা সাড়ে ১১টায় বরিশাল প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ দাবি জানান। এছাড়া ১২ জুনের বিসিসি নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়ন এবং সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার দাবিও জানান এ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে। সংবাদ সম্মেলনের লিখিত বক্তব্যে প্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপস বলেন, বিগত নির্বাচনগুলোতে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত না হওয়ায় সবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয়নি এবং ভোটাররা ভোট দিতে পারেনি। যার কারণে বিএনপিসহ অনেক দল নির্বাচনে অংশ গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত দিয়েছে। এ সময় তিনি আরো বলেন, ইভিএমএ নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করা অত্যন্ত সহজ। প্রযুক্তির কারণে ইভিএম ব্যবহার করে জালিয়াতিও করা যায়। তাই ইভিএম বাতিল করে বাংলাদেশের মতো দেশে কাগজের ব্যালটে প্রচলিত পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণ করাই সর্বোত্তম বলে তিনি মনে করেন।

সংবাদ সম্মলে এসময় জাতীয় পার্টি বরিশাল মহানগর আহ্বায়ক মহসিন উল ইসলাম হাবুল, মহানগর সহ-সভাপতি আক্তার হোসেন সপ্রু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান চৌধুরীসহ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।