ব্লু ইকোনমিতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা

বেলজিয়ামের বিখ্যাত লেখক গুন্টার পাওলি তার ‘দ্য ব্লু ইকোনমি’ গ্রন্থে লিখেছেন, ব্লু ইকোনমি হলো অর্থনীতির এমন একটি বিষয়, যেখানে একটি দেশের সামুদ্রিক পরিবেশ কিংবা সামুদ্রিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে আলোচনা করা হয়। এর আরেক নাম ‘সুনীল অর্থনীতি’। একে ‘সমুদ্র অর্থনীতি’ হিসেবেও আখ্যায়িত করা যায়। ব্লু ইকোনমি হচ্ছে সমুদ্র সম্পদনির্ভর অর্থনীতি। সমুদ্রের বিশাল জলরাশি ও এর তলদেশের বিভিন্ন ধরনের সম্পদ কাজে লাগানোর অর্থনীতি হচ্ছে এটি। সমুদ্র থেকে আহরণকৃত যেকোনো সম্পদ দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হলে তা-ই ব্লু ইকোনমির আওতায় পড়বে। জাতিসংঘ ব্লু ইকোনমিকে মহাসাগর, সমুদ্র ও উপকূলীয় অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি পরিসর হিসেবে উল্লেখ করে। সমুদ্র অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো টেকসই মাছ ধরা, সমুদ্রের স্বাস্থ্য, বন্যপ্রাণী ও দূষণ বন্ধ করা।

বিশ্বব্যাংকের মতে, ব্লু ইকোনমি এমন একটি ধারণা, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং জীবিকার সংরক্ষণকে উন্নীত করতে চায় এবং একই সঙ্গে সমুদ্র ও উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশগত স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। সুনীল অর্থনীতির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করা, দেশের সম্পদ বৃদ্ধি করা, সামাজিক পুঁজি সৃষ্টি করা, আয় বৃদ্ধি এবং সর্বোপরি পরিবেশে সঞ্চয় ও বিনিয়োগের মধ্যে ভারসাম্য সৃষ্টি করা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীর জনসংখ্যা প্রায় ৯০০ কোটি হতে পারে। এই বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীর খাবারের জোগান দিতে তখন সমুদ্রের ওপর নির্ভর করতে হবে। জাতিসংঘ ২০১৫ সাল-পরবর্তী যে টেকসই উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, তার মূল বক্তব্যই হচ্ছে ব্লু ইকোনমি। আর ব্লু ইকোনমির মূল ভিত্তি হচ্ছে টেকসই সমুদ্র নীতিমালা। বিশ্ব অর্থনীতিতে সমুদ্র অর্থনীতি বিভিন্নভাবে অবদান রেখে চলেছে। বছরব্যাপী ৩ থেকে ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের কর্মকাণ্ড সংগঠিত হয় সমুদ্রকে ঘিরে। বিশ্বের ৪৩০ কোটি মানুষের ১৫ ভাগ প্রোটিনের জোগান দিচ্ছে সামুদ্রিক মাছ, উদ্ভিদ ও প্রাণী। পৃথিবীর ৩০ ভাগ গ্যাস ও জ্বালানি তেল সরবরাহ হচ্ছে সমুদ্রের বিভিন্ন গ্যাস ও তেলক্ষেত্র থেকে। বিগত বছরগুলোতে যতগুলো আন্তর্জাতিক সম্মেলন হয়েছে, তার সবগুলোতেই আলোচনার কেন্দ্র ছিল ব্লু ইকোনমি। ২০১২ সালে রিও+২০, সমুদ্রবিষয়ক এশীয় সম্মেলন, ২০১৩ সালে বালিতে অনুষ্ঠিত খাদ্য নিরাপত্তা এবং ব্লু গ্রোথ প্রভৃতি সম্মেলনের নাম আমরা উল্লেখ করতে পারি। অর্থনৈতিক সহায়তা এবং উন্নয়ন সংস্থা, জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি, বিশ্বব্যাংক, খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার উন্নয়ন কৌশলের মূলেও রয়েছে ব্লু ইকোনমি।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে প্রথম সমুদ্রে মৎস্য জরিপ হয়। বঙ্গবন্ধুর আমন্ত্রণে মি. ওয়েস্ট এই জরিপকাজে অংশ নেন। সমুদ্র থেকে কী পরিমাণ মাছ আহরণ করা যাবে, তার একটি সুপারিশ তিনি করেছিলেন। দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে বঙ্গবন্ধু সরকার স্বাধীনতার মাত্র তিন বছরের মধ্যে ১৯৭৪ সালে Territorial Waters and Maritime Zones Act পাশ করে। তাছাড়া ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণে আলোচনাও ১৯৭৪ সালে শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯৬ সালে জাতীয় সমুদ্রবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার জন্য একটি রিভিউ কমিটি গঠন করা হয়। উক্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ২০০০ সালে জাতীয় সমুদ্রবিজ্ঞান গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০০৯ সালে জাতীয় সমুদ্রবিজ্ঞান গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়। ২০০৯ সালের ২ জুলাই একনেক সভায় চার একর থেকে ৪০ একর বৃদ্ধি করে প্রকল্প এলাকায় গবেষণাগার, আবাসিক ভবন, মেরিন একুরিয়াম এবং বায়ুবিদ্যুত্ ব্যবস্থাসহ প্রকল্পটি পুনর্গঠনের নির্দেশ দেন।

দীর্ঘ কয়েক দশকেও আলোচনার মাধ্যমে মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়ায় মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের জন্য বাংলাদেশ ২০০৯ সালে জার্মানির হামবুর্গভিত্তিক সমুদ্র আইনবিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে (ইটলস) মামলা করে। ২০১২ সালের ১৪ মার্চ ‘ইটলস’ রায় ঘোষণা করলে সেটিকে সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের বিজয় হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এদিকে ভারতের সঙ্গেও আলোচনায় কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় বাংলাদেশ নেদারল্যান্ডেসের দ্য হেগ শহরে অবস্থিত আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে যায়। ২০১৪ সালের ৮ জুলাই এক রায়ে বাংলাদেশ নতুন প্রায় সাড়ে ১৯ হাজার বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকা পেয়েছে; যা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশে সরকারের এক অভাবনীয় কূটনৈতিক অর্জন। এর ফলে নিজস্ব সমুদ্রসীমার বাইরে মহীসোপানে এক বিরাট এলাকার ওপর বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই এলাকায় মৎস্য আহরণ এবং সমুদ্রের তলদেশে প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বাংলাদেশের অধিকার নিশ্চিত হয়েছে। এই রায়ের ফলে বাংলাদেশ ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি টেরিটোরিয়াল সমুদ্র, ২০০ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশে অবস্থিত সব ধরনের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্র বিরোধপূর্ণ ১৭টি ব্লকের ১২টি পেয়েছে বাংলাদেশ। ভারতের কাছ থেকে দাবিকৃত ১০টি ব্লকের সবগুলো পেয়েছে বাংলাদেশ। দুই বছরের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল প্রদত্ত এ রায় দুটিকে বাংলাদেশের ‘সমুদ্রবিজয়’ বলে অভিহিত করা হয়েছে।

সমুদ্রসীমা অর্জনের পরের বছরই ২০১৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। সমুদ্রসম্পদ আহরণ ও যথাযথ ব্যবস্থাপনায় ২০১৪ সালে একটি কমিটি গঠন করা হয়। ২০১৫ সালের ৫ মার্চ ‘বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিচার্স ইনস্টিটিউট আইন, ২০১৫’ পাশ হয়। ফলে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রকল্পের কাজ সমাপ্তির মাধ্যমে ইনস্টিটিউটের কার্যক্রম শুরু হয়, যা দেশের সমুদ্রসম্পদ ব্যবহার এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি মাইলফলক। ২০১৭ সালে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘ব্লু ইকোনমি সেল’ গঠন করা হয়। ২০১৮ সালে নৌবাহিনীর সদর দপ্তরের সহায়তায় গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব মেরিটাইম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বদ্বীপ পরিকল্পনা বা ডেলটা প্ল্যানে সমুদ্র অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনার আওতায় ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পাঁচ ধরনের কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় তেল ও গ্যাস রয়েছে। এখানে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলে তা দেশের ব্লু ইকোনমির একটি বড় শক্তি হয়ে উঠবে। দেশের সমুদ্রসীমায় অনুসন্ধান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ গ্যাস হাইড্রেট বা মিথেন গ্যাসের জমাট স্তরের উপস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞরা আরো বলেন, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার একান্ত অর্থনৈতিক এলাকায় শূন্য দশমিক ১১ থেকে শূন্য দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফুট সম্ভাব্য প্রাকৃতিক গ্যাস হাইড্রেট থাকার বিষয়টি অনুমিত হয়েছে, যা ১৭ থেকে ১০৪ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফুট প্রাকৃতিক গ্যাসের সমান।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ১৪ নম্বরে বলা আছে, ‘লাইফ বিলো ওয়াটার’ অর্থাৎ পানির নিচে জীবন। বাংলাদেশও এসডিজির লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। বৈশ্বিক দিক থেকে আটটি দেশ মিলে ‘বে অব বেঙ্গল লার্জ মেরিন ইকো সিস্টেম প্রোজেক্ট’টি খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বাস্তবায়ন করছে। বাংলাদেশও এর সঙ্গে যুক্ত আছে। ইতিমধ্যে একটি কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে মৎস্য আহরণের সক্ষমতা নিরূপণ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আছে। উপকূলীয় এলাকায় ভারী বস্তু দূষণ দূর করার প্রযুক্তি আছে। বাংলাদেশের শতবর্ষী ডেলটা প্ল্যান একটি বড় সফলতা।

উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারলে সামুদ্রিক মাছ আহরণের পরিমাণ বাড়বে। সামুদ্রিক বিভিন্ন জীব থেকে কসমেটিক, পুষ্টি, খাদ্য ও ওষুধ পাওয়া যায়। মেরিন সেলফিশ, ফিনফিশ ফার্মিং করে ব্যাপক বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। মেরিন জৈবপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে মৎস্য সম্পদের উন্নয়ন ঘটানো যায়। বঙ্গোপসাগরে ভারী খনিজের সন্ধান পাওয়া গেছে। এগুলোর মধ্যে ইলমেনাইট, টাইটেনিয়াম অক্সাইড, রুটাইল, জিরকন, গার্নেট, ম্যাগনেটাইট, মোনাজাইট, কোবাল্ট প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এগুলো সঠিকভাবে উত্তোলন করতে পারলে হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। দেশের শিপইয়ার্ড ও ওয়ার্কশপের মাধ্যমে বর্তমানে ছোট ও মাঝারি আকারের জাহাজ নির্মাণ করে রপ্তানি করা হচ্ছে। বড় জাহাজ তৈরির সক্ষমতা বাড়াতে পারলে রপ্তানি আয়ও বাড়বে। ক্রুশ শিপের মাধ্যমে ভ্রমণের ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিতে পারলে পর্যটন খাত আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হবে।

লেখক : শিক্ষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়