ছেলে বড় হবে, মানুষের মতো মানুষ হবে। ধীরে ধীরে পরিবারের হাল ধরবে, ঘর-সংসার করবে। এই যেন যুগ যুগ ধরে চলে আসা নিয়ম। তবে যদি কোনো পরিবারের বড় তিন সন্তানই বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তি (প্রতিবন্ধী) হয় তাহলে তো সেই পরিবারের লোকজনের আক্ষেপ আর অভিযোগের সীমা থাকে না। কিন্তু না, এমনটি ঘটেনি চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার হাইলধর ইউনিয়নের গুজরা গ্রামের আবুল কাশেম (৭০) এবং মনজুরা বেগম (৬০) দম্পতির মাঝে।
জানা যায়, নিজেদের ৫ ছেলে এবং ৩ মেয়ের মধ্যে বড় তিন ছেলে হুমায়ুন (৩৫), নুরুল কবির (২৫), মুবিন (২২) শারীরিক প্রতুবন্ধী। ছোটো দুই ছেলে আহমদ কবির ও আলম শহরে কাজ করে। আর তিন মেয়ের মধ্যে নারগিস আক্তারকে বিয়ে দিতে পারলেও এখনো বিয়ের উপযুক্ত হয়ে ঘরে আছে শাহিন আক্তার ও রেশমা আক্তার। পরিবারের অস্বচ্ছলতার কারণে প্রাইমারির গণ্ডি পেরিয়েই পড়াশোনার পাঠ চোকাতে হয়েছে তাদের।
সরজমিনে গুজরা গ্রামে গিয়ে দেখে যায়, সুঠাম দেহের দুই যুবক খালি গায়ে মাটিতে বসে আছে। শান্তশিষ্ট এই বড় দুইজনের মাঝে কোনো ঝগড়াঝাটি নাই। শারীরিক গঠন দেখে বুঝার উপায় নেই এরা প্রতিবন্ধী। তখনও বাড়িতে ছিলো না চঞ্চল স্বভাবের ছোটো ভাই মুবিন।
পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বড় দু'জনের চেয়ে মুবিন একটু চঞ্চল স্বভাবের। তবে অবাক করার বিষয় হলো, অভাবের সংসারে বড় তিন ছেলের এই অবস্থার জন্য বিন্দুমাত্র আক্ষেপ নেই আবুল কাশেম এবং মনজুরা বেগম দম্পতির মাঝে। নিজেদের অসুস্থ শরীর নিয়েও ছেলেদের যত্ন নিয়ে যাচ্ছেন বৃদ্ধা মা এবং তাদের খাবার যোগাতে বর্গা চাষ করছেন তাদের সত্তরোর্ধ পিতা।
ছেলেদের এই অবস্থা নিয়ে পিতা আবুল কাশেম বলেন, সব আল্লাহর ইচ্ছা। তিনি ভালো মনে করেছেন বিধায় আমাকে এমন তিনটা ছেলে দিয়েছেন। নিজেদের দুর্দশার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, নিজেদের কোনো জায়গা সম্পত্তি নাই। অন্যের জায়গায় বর্গা চাষ করি৷ ছোটো ছেলে দু'টা কাজ করে আর বিয়ের উপযুক্ত মেয়ে দু'টা ঘরেই আছে। থাকার ঘর ছিলোনা। ব্যাংক লোন নিয়ে টিনের ঘর করেছি। এখন লাখ-তিনেক টাকা ঋণের বোঝা মাথার উপর।
তাদের মা মনজুরা বেগম জানান, আমরা ছেলেগুলো জন্ম থেকেই এমন। একটু-আধটু কথা বলতে পারে, শুনতেও পারে তবে চলাচল করতে পারে না। নিজের বাপের সম্পত্তি বিক্রি করে তাদের চিকিৎসা করেছি তবে কিছুতেই কিছু হয়নি। ডাক্তার বলেছে তারা আর ভালো হবে না। তাই সর্বশেষ ভাগ্যকেই মেনে নিয়েছি। কিছুদিন ধরে আমি নিজেও অসুস্থ হয়ে মেডিকেলে ভর্তি ছিলাম।
এ বিষয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য মুহাম্মদ মোজাহের জানান, ওই পরিবারের তিনজনকেই প্রতিবন্ধী ভাতা দেওয়া হয়। সরকারের পক্ষ থেকে যেসব ভাতা আসে আমি এই পরিবারের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকি। সমাজের বিত্তশালীদের এই পরিবারের সহযোগিতায় এগিয়ে আসা উচিত বলে এই ইউপি সদস্য মনে করেন।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোঃ রিজওয়ান উদ্দিন বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীর আওতায় সমাজসেবা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এদেরকে প্রতিমাসে ৮৫০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হয়। এর বাইরেও এদের জন্য কিছু করার সুযোগ থাকলে উপজেলা সমাজসেবা অধিদপ্তর তা করবে।