ভোটার উপস্থিতি হ্রাসবৃদ্ধির বিষয়টি সরল নহে

গণতন্ত্র ও নাগরিকদের ভোটাধিকার প্রয়োগের কথা ভাবিলে যে কোনো নির্বাচনে বিপুল ভোটারের উপস্থিতি নিঃসন্দেহে উত্সাহব্যঞ্জক। সমপ্রতি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলিয়াছেন যে, নির্বাচন লইয়া জনগণ আগ্রহ হারাইয়া ফেলিয়াছে। উপজেলা নির্বাচনেই তাহার প্রমাণ পাওয়া যাইতেছে। মসজিদে-মসজিদে ঘোষণা দিয়াও ভোটারদের কেন্দ্রে আনা যাইতেছে না। তাঁহার মতে, এই প্রবণতা কেবল নির্বাচনের জন্য নহে, গণতন্ত্রের জন্যও বিপজ্জনক। ভোটাধিকারের জন্য ১৯৬৩ সাল হইতে শুরু করিয়া সর্বশেষ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আন্দোলন করিবার কথা তুলিয়া ধরিয়া মেনন বলিয়াছেন যে, আবার যেন এই বৃদ্ধ বয়সে সবটাই ‘পুনর্মূষিকোভব’ করিতে না হয়। তাঁহার মতে, নির্বাচনকে যথাযথ মর্যাদায় ফিরাইয়া আনিবার কাজটি আমাদের করিতে হইবে।

যদিও অনেকের মতে, জাতীয় কিংবা স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতির তারতম্য খুব অস্বাভাবিক নহে। অন্তত পরিসংখ্যান তাহাই বলে। ইহা ঠিক যে, বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা এবং ভোট প্রদান নিয়া ভোটারদের উচ্ছ্বাস যথেষ্ট উচ্চমাত্রায় এবং পরিসংখ্যান অনুযায়ী তাহা সর্বাধিক মাত্রা ছিল ১৯৯১ হইতে ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্ব পর্যন্ত। ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সকল দলের অংশগ্রহণ না করা, বিরোধী দলের সহিংসতা এবং বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল কম। তবে ইহার পূর্বে অনুষ্ঠিত বাকি চারটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের নির্বাচনটি বাদ দিয়া) গড়ে ভোটারের অংশগ্রহণ ছিল ৭৩ দশমিক ১ শতাংশ। অন্যদিকে এযাবত্ ২০০৮ সালের নির্বাচনে সবচাইতে বেশি ভোটার সমাগম হইয়াছিল, যাহার গড় ছিল ৮৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ।

ইহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না যে, বিপুল ভোটার উপস্থিতি বা ভোটপ্রাপ্তি প্রত্যেক রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীর পরম আকাঙ্ক্ষিত বিষয়। এই লক্ষ্যে তাহারা নানা রকমের চেষ্টাচরিত্র করিয়া থাকেন। কোনো নির্বাচনে যত বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকে, সেইখানে ভোটারদের আগ্রহও তুলনামূলক বেশি থাকে। পরিসংখ্যান হইতে দেখা যায়, অতীতে স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যা এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা অধিক থাকিবার কারণে ভোটারের উপস্থিতিও ছিল অধিক। সুতরাং ভোটার উপস্থিতির বিষয়টি অনেকগুলি বিষয়ের উপর নির্ভর করিয়া উঠানামা করে। এমনকি বিশ্বের যেইসকল দেশে গণতন্ত্র বহুদিন ধরিয়া বিকশিত হইয়াছে, সেইসকল দেশেও ভিন্ন ভিন্ন দশকে ভোটার উপস্থিতির পরিসংখ্যান জোয়ার-ভাটার মতো উঠানামা করে। গত ২০ বত্সরের মধ্যে সর্বশেষ ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল সবচাইতে কম। ভোটাধিকার প্রয়োগ করিয়াছিলেন মোট ভোটারের মাত্র ৫৫ শতাংশ। অথচ ২০০৮ সালে মোট ভোটারের ৬৪ শতাংশ ভোট দিয়াছিলেন। আবার ১৯৯৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দিয়াছিলেন মাত্র সাড়ে ৫৩ শতাংশ ভোটার। আবার ভারতের কমিশনের তথ্য অনুযায়ী ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের নিরিখে ২০১৯ সালে ভোটার উপস্থিতির হার অনেক রাজ্যেই কমিয়াছে।

সুতরাং ভোটার উপস্থিতির হ্রাসবৃদ্ধির বিষয়টি এত সরল নহে। এবং তাহার নিরিখে স্পষ্ট করিয়া উপসংহার টানাও খুব সহজ নহে।