১৯৪৯ সনের ২৩ জুন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে আওয়ামী লীগের জন্ম হয়েছিল। বাংলার মানুষের প্রাণপ্রিয় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের আজ ৭০তম শুভ জন্মদিন। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শামসুল হক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতাদের আজ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। ঐতিহাসিক ২৩ জুন ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার লাল সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতাগণ দলের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশের দিন হিসেবে ইতিহাস থেকে ২৩ জুন তারিখটি বেছে নিয়েছিলেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আওয়ামী লীগ ইতিহাস সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক দল। ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ভাষা আন্দোলনের বীজ রোপিত হয়েছিল এবং বায়ান্নর মহান ভাষা আন্দোলনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব দিয়েছিল। যদিও আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার আগেই ’৪৮-এর জানুয়ারির ৪ তারিখে প্রাণপ্রিয় ছাত্রপ্রতিষ্ঠান ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। একই বছরের ১১ মার্চ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ছাত্রলীগের উদ্যোগে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে প্রদেশব্যাপী সফল ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। ’৫৩ সালে দলের কাউন্সিল অধিবেশনে সাংগঠনিক রিপোর্ট পেশকালে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘জনতা ও বুদ্ধিজীবীদের সচেতন প্রতিরোধ প্রচেষ্টাতেই আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম।’ প্রতিষ্ঠার পর থেকে নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রামের পথে মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদানের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় সংগঠিত করে বাঙালির ইতিহাসে আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ এই তিনটি নাম সমার্থক হয়ে আছে।
আজ থেকে ৫৯ বছর আগে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ শাখা ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে আমার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা। জাতির পিতার নির্দেশে ও উপস্থিতিতে ’৭০-এর ২ জুন আমি আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগদান করি এবং একই বছরের ৭ জুন ঐতিহাসিক ‘৬ দফা দিবস’ পালন উপলক্ষে রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) অনুষ্ঠিত জনসভায় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বক্তৃতা প্রদানের দুর্লভ সুযোগ পাই। সেদিন জাতির পিতা ৬ দফা ও ১১ দফার স্মারক হিসেবে ১৭টি কবুতর উড়িয়ে সভার কার্যক্রম শুরু করেন। ’৬৯-এর ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জাতির পিতাকে কারাগার থেকে মুক্ত করার পর তাঁর সান্নিধ্যলাভ করি। ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্যই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক মুক্তি।
আওয়ামী লীগের ইতিহাস অবিরাম পরিবর্তন ও বিপ্লবের ইতিহাস। আওয়ামী লীগের ইতিহাস ও বাংলাদেশের ইতিহাস অভিন্ন। ’৫৪-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টের ২২৮টি আসনে জয়লাভ কার্যত মুসলিম লীগের কবর রচনা করে এবং রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে সাম্প্রদায়িকতা বিদায় করার প্রেক্ষাপট তৈরি করে। ফলাফল, ’৪৯-এ প্রতিষ্ঠিত ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ ’৫৫-এর ২১ অক্টোবর হয় অসাম্প্রদায়িক ‘আওয়ামী লীগ’। দেশের চরম সাম্প্রদায়িক প্রেক্ষাপটকে মাত্র ছয় বছরের মধ্যে আমূল বদলে দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। ’৫৫-তে সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্টে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আওয়ামী লীগ জন্ম হওয়ার পর থেকে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ ও এর কর্ম্মীগণ এক দিনের জন্যও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারে নাই। অত্যাচার ও জুলুম শাহীর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ যে জোরালো প্রতিবাদের ধ্বনি তুলেছিল তারই ফলস্বরূপ জনগণের মধ্যে এসেছিল নব নব চেতনা, নতুন আশা ও উদ্দীপনা এবং অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার বজ্র কঠিন শপথ।’ বায়ান্নর মহান ভাষা আন্দোলন, ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ’৬২-এর সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ। ’৬২তে আমাদের স্লোগান ছিল ‘জাগো জাগো বাঙালি জাগো’; ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা, তোমার আমার ঠিকানা’। ’৬৬-এর ৫ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু ছয় দফা দিয়েছিলেন লাহোরে। তখন তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। ’৬৬-এর ১৮, ১৯ ও ২০ মার্চ আওয়ামী লীগের সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু সভাপতি ও তাজউদ্দীন আহমেদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ছয় দফা দেওয়ার পর বঙ্গবন্ধু আমাদের বলতেন ‘সাঁকো দিলাম, এই সাঁকো দিয়েই একদিন আমরা স্বাধীনতায় পৌঁছাব।’
ছয় দফা দেওয়ার পর স্বৈরশাসক আইয়ুব খান বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠ চিরদিনের জন্য স্তব্ধ করে দিতে ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য’ মামলা তথা আগরতলা মামলার আসামি করে ফাঁসি দেওয়ার চেষ্টা করে। জাগ্রত ছাত্র সমাজ সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে। আমরা ৬ দফাকে হুবহু ১১ দফায় অন্তর্ভুক্ত করে আসাদ, মকবুল, রুস্তম, মতিউর, আলমগীর, সার্জেন্ট জহুরুল হক, ড. শামসুজ্জোহাসহ নাম না জানা অসংখ্য শহিদের রক্তের বিনিময়ে ’৬৯-এ প্রবল গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি করে জাতির জনককে ফাঁসিকাষ্ঠ থেকে মুক্ত করে স্বৈরশাসক আইয়ুব খানকে পদত্যাগে বাধ্য করি। তখন আমাদের স্লোগান ছিল ‘পাঞ্জাব না বাংলা, পিন্ডি না ঢাকা’। জাতির পিতাকে ফাঁসির মঞ্চ থেকে ’৬৯-এর ২২ ফেব্রুয়ারি মুক্ত করে ২৩ ফেব্রুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতি ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে। এরপর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ’৭০-এর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। যখন ’৭১-এর ১ মার্চ জাতীয় সংসদের পূর্বঘোষিত ৩ মার্চের অধিবেশন একতরফাভাবে স্থগিত ঘোষণা করা হয়, তখন দাবানলের মতো আগুন জ্বলে ওঠে। লাখ লাখ লোক রাজপথে নেমে আসে। শুরু হয় এক দফা তথা স্বাধীনতার সংগ্রাম। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ’৭১-এর ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক বক্তৃতা দিয়ে নিরস্ত্র বাঙালি জাতিকে সশস্ত্র জাতিতে রূপান্তরিত করেন এবং বজ্রকণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করে বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বর্তমানে জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত ‘বিশ্ব ঐতিহ্যের প্রামাণ্য দলিল’ হিসেবে স্বীকৃত অতুলনীয় এ বক্তৃতাই ছিল মূলত আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের দিকনির্দেশনা। বঙ্গবন্ধুর ডাকে এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে হাতিয়ার তুলে নিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুজিব বাহিনীর অন্যতম অধিনায়ক হিসেবে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং সমাপ্ত করে শপথ করাতাম এই বলে যে, ‘বঙ্গবন্ধু মুজিব, তুমি কোথায় আছ, কেমন আছ, আমরা জানি না। কিন্তু যতক্ষণ তোমার স্বপ্নের বাংলাদেশকে আমরা হানাদার মুক্ত করতে না পারব, ততক্ষণ আমরা মায়ের কোলে ফিরে যাব না।’ ’৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর ৩০ লক্ষাধিক শহিদ আর ৪ লক্ষাধিক মা-বোনের আত্মত্যাগে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়! সেদিন দেশ শত্রুমুক্ত হলেও স্বাধীনতার পরিপূর্ণ স্বাদ আমরা পাই নাই। যেদিন ’৭২-এর ৮ জানুয়ারি, বঙ্গবন্ধুর মুক্তি সংবাদ পেলাম, সেদিন সারাদেশে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। ১০ জানুয়ারি যেদিন তিনি স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন, সেদিন মনে হয়েছে আজ আমরা প্রকৃতই স্বাধীন।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে খুনিচক্র মনে করেছিল বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করে দেবে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু কন্যা স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে দীর্ঘ নির্বাসন শেষে ’৮১-এর ১৭ মে বাংলাদেশের মাটি স্পর্শ করে আওয়ামী লীগের পতাকা হাতে তুলে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ তথা স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সমুন্নত রেখে অর্থনৈতিক মুক্তির। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ষড়যন্ত্র শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগকে এদেশের রাজনীতি থেকে নিশ্চিহ্ন করার। প্রায় দুই যুগ স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয় আওয়ামী লীগকে। দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ’৯৬-এর ১২ জুন অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে। ২৩ জুন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন শেখ হাসিনা। জাতীয় ঐকমত্যের সেই সরকারে আমি শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলাম। উন্নয়ন আর অগ্রগতির লক্ষ্যে গঠিত আমাদের সরকারের বাস্তবভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ করায় শিল্পোন্নয়ন ও রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের সফল কূটনীতির ফলে ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি সম্পাদন হয়। এই চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে দেশের দীর্ঘদিনের গঙ্গার পানিবণ্টন সংকটের সমাধান হয়।
মহান জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের নেতৃত্বপ্রদানকারী দল আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এ বছরটি বিশেষ তাত্পর্য বহন করে। ‘বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট’ উেক্ষপণের মধ্য দিয়ে আমরা ৫৭তম দেশ হিসেবে স্যাটেলাইট ক্লাবের গর্বিত সদস্য হয়েছি। এর আগে পরমাণু বিদ্যুত্ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের লাইসেন্স প্রাপ্তির মাধ্যমে ‘নিউক্লিয়ার নেশন’ হিসেবে আমরা বিশ্ব পরমাণু ক্লাবের সদস্য হয়েছি। আর স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছি।
অনেক বড় বড় প্রকল্প প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সমাপ্তির পথে এগিয়ে চলেছে। পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন বন্ধ করার পরেও দৃঢ়তার সঙ্গে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর কাজ শুরু করে আজ তা সমাপ্তির পথে।
এদেশে অতীতে ইতিহাস বিকৃতির বহু প্রচেষ্টা হয়েছে। কিন্তু আজ বাংলার মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম সত্যিকারের ইতিহাস জানতে পেরেছে। এখন ইতিহাস নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদানের কোনো সুযোগ নাই। তারপরও কেউ কেউ ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা করছে। তারা জানে না, সত্যকে কখনো ধামাচাপা দেওয়া যায় না।
n লেখক :আওয়ামী লীগ নেতা; সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি