ছুটিতে মহাসড়কগুলো তুলনামূলক ফাঁকা থাকে। সেই সুযোগটাই কাজে লাগাতে আমি আর আসিফ মটরবাইকে ছুটলাম চট্টগ্রামের মিরসরাই। বছরখানেক আগেই গোপনসূত্রে আমার কাছে খবর ছিল মস্তান নগরের সোনাপাহাড়ে পাদদেশে একটি খুম রয়েছে। সেই টার্গেট মাথায় রেখেই মটরবাইক নিয়ে ঘণ্টায় ৯০-১০০ স্পিডে ছুটলাম।
নানা জায়গায় চা-নাশতার বিরতি দিতে দিতে রাত প্রায় সোয়া তিনটায় পূর্ব আমবাড়িয়া গিয়ে পৌঁছি। দ্রুত সাফ-সুতর হয়ে স্থানীয় এক মসজিদে এবাদত বন্দেগী শেষে ফজরের সালাত আদায় করি। এরইমধ্যে খুমের খোঁজ দেওয়া ব্যক্তি গাইড নিজাম এসে হাজির। ঘণ্টা দুই মরিচপোড়া ঘুম (চোখ বুজে থাকা) দিয়ে ছুটলাম খুমের খোঁজে। মস্তাননগর রেল লাইন পার হয়ে ৩ নং জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের দক্ষিণ সোনাপাহাড় গ্রামের মেঠোপথ ধরে এগুতে থাকি। যেতে যেতে জংলি পথে ঢুকে পড়ি।
নির্জন সরু পথে কান পাতলে ফাগুনের পাতা ঝরার শব্দ পাই। বেশ উচ্ছ্বাস নিয়ে সামনে পা ফেলি। জংলি পথটা পার হওয়ার পরই চোখ আটকায় দুই পাহাড়ের ফাঁকে থাকা ঝিরিপ, সুবহানাল্লাহ। পাহাড় দুটো খাড়া হয়ে উপর দিকে উঠে গেছে। তার মাঝ দিয়ে বয়ে চলছে হিমশীতল ঠান্ডা পানি। বাতাসটাও ছিল বেশ শীতল। যা সচরাচর এরকম হাওয়া পাহাড়ে মিলে না। খুশিতে বেশ কিছুক্ষণ ফটোসেশন চলে।
অপ্রত্যাশিত নয়নাভিরাম সৌন্দর্য আমাদেরকে সামনের দিকে টানতে থাকে। লক্ষ্য একটাই, খুমের শেষ পর্যন্ত দেখা। যতই সামনের দিকে এগুচ্ছি ততই যেন মুগ্ধতা আচ্ছন্ন করছে। দুচোখ ভরা বিস্ময় নিয়ে হাইকিং-ট্র্যাকিং করার সময় হুঁশ ফেরে তখন, যখন খুমের পানির নীচে থাকা গাছের ডালপালার সঙ্গে পায়ের ধাক্কা লাগে। কখনো কখনো পথটা এত সরু, নিজের দেহটা ঠিকঠাকমত ঢুকবে কি না তা নিয়েই সন্দিহান হয়ে পড়েছি। সে এক অপার বিস্ময়। অন্যরকম ভালোলাগা, অনুভূতি। প্রতিটা সরু পথ দিয়ে সামনে আগানোর পরেই নতুন কোনো প্রাকৃতিক দৃশ্যে চোখ আটকায়। সোনাপাহাড়ের আকৃতি ও প্রাকৃতিকভাবে থাকা এর কারুকার্য বর্ণনাতীত। প্রায় ঘণ্টা দেড়েক চলার পর দেখা হলো স্থানীয় কয়েকজন তরুণের সঙ্গে। তারা খুম হতে চিংড়ি ধরে থাকে। নামমাত্র মূল্যে কিছু চিংড়ি নিয়ে নিলাম।
পাহাড়ি ঝিরির কালো চিংড়ি। বেশ বড়সড়। তাদেরকে সঙ্গে নিয়েই আসিফ আগুন জ্বালিয়ে দিল। কাঠিতে গেঁথে ঝিরির চিংড়ি পুড়ে খাওয়ার স্বাদ—যে একবার খেয়েছে সেই একমাত্র বুঝে থাকে এর মজা। কুচকুচে কালো চিংড়িগুলো আগুনে ঝলসানোর পর লাল টকটকে বর্ণ ধারণ করে। এককথায়, হেব্বি টেস্ট। খেয়েদেয়ে শক্তি সঞ্চয় করার পর বাঁধলো এক নয়া বিপত্তি। চিংড়ি শিকারি তরুণদের মাঝে দু’একজন ক্ষণিক সময়ের ভালোবাসার সৃষ্টি হতে, সামনের দিকে যেন আর না যাই সে ব্যাপারে নিষেধ করতে লাগল। কিন্তু না। আমাদেরকে যে সামনে যেতেই হবে। খুমের পুরোটা সৌন্দর্য দেখব বলেই তো প্রিয় সংগঠন দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের অনেককে না জানিয়েই অনেকটা চুপিসারে চলে এলাম। পাহাড়, খুম, বনজঙ্গলে ভ্রমণসঙ্গী যত কম—তত বেশিই ট্র্যাকিং করতে সুবিধা।
তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দুই পাহাড়ের মাঝে প্রশস্ত এক পথে ঢুকে গেলাম। কিছুদূর যেতেই বুঝতে আর বকি রইল না—কেন বার বার নিষেধ করেছিল তারা। এপাশটায় খুমের গভীরতা বেশ। সাঁতার কেটে যাওয়ার মতও প্রশস্ত নয়। অনেকগুলো পাহাড়ি বাঁক। এপাশ হতে ওপাশের কিছুই দেখা যায় না। গুল্লাআলী খুমে প্রবেশের আসল মজাটা মনে হয় এখান হতেই শুরু। অবশ্য খুমের নামটা যে গুল্লাআলী তখনো জানা ছিল না। খানিকটা সময় নিজেদের মধ্যে শলাপরামর্শ করে, দুই পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে পা ফেলে এগিয়ে চলতে শুরু করলাম। সেই আনন্দ। অবশ্য পা পিছলে পড়লেই থোতা ব্রেক! কিংবা দেহ ঝুলে থাকবে শূন্যে, নয়ত খুমের জলে চিরতরে সোনার দেহটা হারিয়ে যেতে পারে। যখনি মনে হয়েছে এ বাঁকের পর আর যাওয়া যাবে না—তখনি নব উদ্যমে দেহটা কাত্-চিত্ করে এগিয়ে গিয়েছি। কখনো-বা আবার লিকলিকে শরীরের গাইডকে আগে পাঠিয়ে নিশ্চিত হয়েছি। যেতে যেতে কানে ভেসে আসে পানির কলকল শব্দ। এখানটায় দিনদুপুরেই প্রায় অন্ধকার। পাহাড়ের আকৃতিও যেন দৈত্যাকার রূপ ধারণ করে আছে। বেশ রোমাঞ্চকর পরিবেশ।
প্রত্যাশার চাইতেও অনেক বেশি নয়নাভিরাম প্রকৃতির রূপ দেখেতে পেরে খুবই আনন্দিত। বেশ উচ্ছ্বাসের সাথে আগাতে থাকি। কিন্তু প্রকৃতির আপন খেয়ালেই পথ হয়েছে রুদ্ধ। দু’পাশ হতে সোনাপাহাড় এরকমভাবে মিলিত হয়েছে যে—কাত হয়েও আর আগানোর সুযোগ না থাকায় ফিরতি পথ ধরি।
আরও যা দেখবেন
ছবির মতো সুন্দর সোনাপাহাড় গ্রামটি ফেরার সময় ঘুরে দেখতে পারেন। পড়ন্ত বিকালে পেতি/রাম ছাগলের পালের ঘরে ফেরার দৃশ্য বেশ আনন্দ দিবে। এ গ্রামেই রয়েছে কিশোর রানার বিশাল বিশাল লেবু বাগান। তরতাজা লেবুর শরবত পান করতে চাইলে, মূল্য পরিশোধের মাধ্যমে তা করা যাবে।
যোগাযোগ
ঢাকা হতে চট্টগ্রাম রুটে চলাচল করা যেকোনো পরিবহনে চড়ে নেমে যাবেন মস্তান নগর। সেখান হতে সোনাপাহাড় গ্রাম পার হয়ে গুল্লাআলী খুম। গ্রাম হতে স্থানীয় কাউকে সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে সঙ্গে নিলে নির্বিঘ্ন ভ্রমণের জন্য সহায়ক হবে।
ছবি দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ
সতর্কতা
সাঁতার না জানলে লাইফজ্যাকেট সঙ্গে নিবেন। ভালোমানের ট্র্যাকিং উপযোগী জুতা/স্যান্ডেল পড়ে যাবেন। খাবার পানি, চকলেট ও পরিমাণমত শুকনো খাবার সঙ্গে রাখবেন। সাপ, বিচ্ছু কিংবা কোনো জন্তু-জানোয়ারের সামনে পড়লে হত্যা করবেন না। দিনের আলো থাকতেই ফিরতি পথ ধরবেন। খাবারের অপচনশীল মোড়কগুলো পুড়িয়ে ফেলবেন।