জলবায়ু পরিবর্তন ও বাংলাদেশ

জলবায়ু পরিবর্তন হলো আবহাওয়ার ধরন পরিবর্তনের ফলাফল যা পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে হয়ে থাকে। ঘূর্ণায়মান এ বিশাল পৃথিবীর জলবায়ুর পরিবর্তন দুই দশক আগের চেয়ে বর্তমানকালে আরো সুস্পষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশের জলবায়ুর ক্ষেত্রে এ পরিবর্তন কিছু কিছু লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিগত এক যুগ যাবত্ দেখা যাচ্ছে যে, পরিবর্তনশীল পৃথিবীর জলবায়ুর সঙ্গে বাংলাদেশের জলবায়ুর বিভিন্ন ঋতুর আগমন ও প্রস্থানের সময়কালেরও সামান্য পরিবর্তন হচ্ছে। বিগত প্রায় এক যুগ ধরে লক্ষ করা যাচ্ছে যে, মাঘ ও ফাল্গুন মাস পার হয়ে যাওয়ার পরেও চৈত্র ও বৈশাখ মাসে দেশের উত্তরাঞ্চলে রাতে প্রচণ্ড শীত অনুভূত হয়। এ অঞ্চলের রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলায় আকাশে দুপুর পর্যন্ত ঘন কুয়াশা দেখা যায়। বর্ষাকাল কোনো কোনো বছর পূর্বের চেয়ে সামান্য দীর্ঘ হয় কিংবা গ্রীষ্মকাল, শীতকালের অংশবিশেষ পর্যন্ত গড়ায়। পদ্মা ও যমুনার দক্ষিণ ও পূর্ব অংশে বৃষ্টিপাত পূর্বের মতো থাকলেও উত্তরাঞ্চলের বৃহত্তর রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া অঞ্চলের প্রচণ্ড খরা ও লু হাওয়া প্রবাহিত হওয়ায় জলবায়ুর সাম্প্রতিক বৈশিষ্ট্য সূচক রূপ নিয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের পরিবেশ অর্থনীতিবিদ সুস্মিতা দাশগুপ্ত বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা করেছেন। সেই গবেষণায় দেখা গেছে ২০৫০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২০ সেন্টিমিটার বাড়বে। বর্তমানে উপকূলীয় এলাকার ৪৩ লাখ মানুষ সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার।

এতে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়, বাংলাদেশের জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে এবং তা ভবিষ্যতে বৃদ্ধি পেয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করবে। আর সেদিক থেকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে আমাদের কৃষির। আর কৃষির সঙ্গে খাদ্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পরিবেশের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিভিন্ন মাত্রায় দেখা যায়। গরমকাল আরো তাপময়, অনিয়মিত ও অসময়ে বৃষ্টি, কম সময়ে অধিক পরিমাণে বৃষ্টি এবং এর ফলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা ও ভূমি ধস, আকস্মিক বন্যা, খরার ফলে ফসলের ক্ষতি, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ত জমির পরিমাণ বেড়ে যাওয়া, নদী তীরবর্তী এলাকার ভাঙন ভূমিক্ষয় ও সুপেয় পানির কম প্রাপ্যতা এসবই দায়ী।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তিন জেলা খুলনা, সাতক্ষীরা ও ভোলায় জলবায়ু পরিবর্তন ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলছে। আবার অন্যদিকে বাড়ছে পানির লবণাক্ততা। বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বাসিন্দারা। এসব এলাকায় শিশুদের ঝুঁকি বড়দের চেয়ে বেশি।

জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ একটি প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে, ‘বাংলাদেশে এক কোটি নব্বই লাখেরও বেশি শিশুর জীবন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সরাসরি ঝুঁকিতে রয়েছে।’

জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য কারণগুলো হলো— পৃথিবীর বিভিন্ন গতিশীল প্রক্রিয়া, অভিন্ন নদীর উজানে অবকাঠামো নির্মাণ করে নদীর গতিপথ পরিবর্তন ও যথেচ্ছ পানি প্রত্যাহার, নদীগর্ভে পলিজমে নাব্য ও পানি ধারণ ক্ষমতা হ্রাস, নির্বিচারে বৃক্ষ ধ্বংস এবং ভূগর্ভের মাত্রাধিক্য পানি ব্যবহার এবং বর্তমান সময়ে মনুষ্যজনিত গ্রিন হাউজ গ্যাসের ফলে পৃথিবীর উষ্ণায়নকে জলবায়ু পরিবর্তনের একটি অন্যতম কারণ ধরা হয়।

জলবায়ুর এই পরিবর্তন দুই-একদিন বা দুই-এক বছরে হয়নি। দীর্ঘ বছরের পর বছর মানুষ পরিবেশকে তার প্রয়োজনে ব্যবহার করতে গিয়েই বিপর্যয়ের সম্মুখীন করেছে। আর এইভাবে চলতে থাকলে আগামী শতাব্দীতে বাংলাদেশ তথা পৃথিবী বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠবে। জলবায়ু পরিবর্তনে মনুষ্যসৃষ্ট কারণসমূহ নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। হতে হবে সচেতন। যেমন: পরিবেশ বিজ্ঞানের জ্ঞান রাখা, বায়ুদূষণ রোধ (কার্বন ডাই-অক্সাইড এর কম ব্যবহার), পানিদূষণ প্রতিরোধ, মাটিকে দূষণমুক্ত রাখা ইত্যাদি।

এছাড়া এই নাজুক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট ঝুঁকিগুলোকে শনাক্ত করেছে বাংলাদেশ সরকার। গত কয়েক বছরে সরকার দুর্যোগ ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে (ডিআরআর) অনেক অগ্রগতি অর্জন করেছে। সরকার জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন খাতে বার্ষিক বরাদ্দের ৬ থেকে ৭ শতাংশ ব্যয় করছে। বছরে এই অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ।

শুধু সরকারের একার প্রচেষ্টায় জলবায়ুর পরিবর্তন রোধ সম্ভব নয়। এই প্রেক্ষাপটে সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টা একান্ত কাম্য।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়