ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত আর্থিক খাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক খাত। শুধু বাংলাদেশ নয় যে-কোনো দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বড় চালিকশক্তি হলো ব্যাংকিং খাত। এবার আশাব্যঞ্জক হলো, সরকার ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমিয়ে সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে জানিয়েছে। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে তা ক্রমবিকাশমান শিল্পের উন্নয়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অগ্রগতি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গঠনে ব্যাপক ভূমিকা পালন করবে। কিন্তু হতাশাজনক হলেও এ কথা সত্য যে, ব্যাংকের উদ্যোক্তারা ঋণের সুদ সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরকারের কাছ থেকে নানা সুবিধা আদায় করে নেওয়ার পর একবছর অতিক্রান্ত হলেও এখনো সুদ সিঙ্গেল ডিজিটে নামেনি। তাই সরকারের প্রতিশ্রুতি কতোটা ফলপ্রসূ হবে এটা এখন দেখার বিষয়।

প্রায়শই দেখা যায়, ব্যাংকগুলো বড় ব্যবসায়ীদেরকে ঋণ দিলেও ক্ষুদ্র অথবা মাঝারি ব্যবসায়ীরা তা থেকে বঞ্চিত হয়। ডাবল ডিজিটের বড় সুদের বোঝা বহন করা দুঃসাধ্য বিধায় তারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিতেও ভয় পায়। ফলশ্রুতিতে সম্ভাবনাময় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পখাতগুলোর উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শিল্পের ক্ষেত্রে যদি সহজশর্তে সিঙ্গেল ডিজিটে ঋণ পাওয়া যায়, তা অবশ্যই তরুণ উদ্যোক্তাদের উদ্যোগী হতে সহায়তা করবে, ত্বরান্বিত হবে ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি ও বিনিয়োগ। সাম্প্র্রতিক সময়ে ঋণের সুদহার ব্যাংক ভেদে ১২ থেকে ১৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। যদিও সরকার ব্যাংকগুলোকে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ এবং ৬ শতাংশ সুদে আমানত সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছে; কিন্তু সরকারি ব্যাংকগুলো ছাড়া বেসরকারি ব্যাংকগুলো এ নির্দেশমতো কাজ করেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, সব সুবিধা ব্যাংকের পরিচালকরাই পাচ্ছেন। নিজেরা ভাগাভাগি করে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার পাশাপাশি এখন সিঙ্গেল ডিজিটেও ঋণ সুবিধা নিতে তারা সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। যেসব ব্যাংক সিঙ্গেল ডিজিটে শিল্পঋণ দেওয়ার দাবি করছে, তারা হয়তো তাদের পরিচালকদের এ সুবিধা দিচ্ছে। ব্যাংক পরিচালকদের ঋণ ভাগাভাগির মতো সিঙ্গেল ডিজিটের সুবিধাও এখন ভাগাভাগি হয়ে যাচ্ছে। আর এরা রাজনৈতিকভাবে এতটাই প্রভাবশালী যে, বাংলাদেশ ব্যাংকও এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না।

সরকার যদি সত্যিই চায় ব্যাংকের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনবে তাহলে হয় সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে হবে অথবা সব ব্যাংক এবং অ ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করে আমানত আর ঋণের সুদের হার ঠিক করতে হবে। আবার ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় যদি কমানো যায়, তাদের ব্যবস্থাপনা দক্ষতা যদি আরো বাড়ানো যায়, তাহলে তারা ঋণের সুদের হারও কমাতে পারবে সাময়িকভাবে।

অন্যদিকে,  ঋণ খেলাপি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম প্রধান সমস্যা। সরকারের ভাষ্যমতে- সর্বত্র ব্যাংকিং সেক্টরে সিঙ্গেল ডিজিট চালু হলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। যদিও এটা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে অর্থনীতি অঙ্গনে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা। এরফলে প্রথমবারের মতো অবলোপনের হিসাব বাদে খেলাপি ঋণ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেলো। গত মার্চ শেষে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ৯ লাখ ৩৩ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে ১ লাখ ১০ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা। ২০১৮ সাল শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। এখন কথা হচ্ছে, গৃহীত পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকার কী সফল হবে খেলাপি ঋণের হার কমিয়ে আনতে? কেননা বড় খেলাপিরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। ঋণ গ্রহীতাদের অনেকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী অথবা প্রভাবশালী কারো সহায়তায় ঋণ পেয়েছে। যে কারণে তারা ঋণ ফেরত না দেবার সুযোগ নিচ্ছে। এতে করে সিঙ্গেল ডিজেট সুদ খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে সক্ষম হবে না। কেননা বড় খেলাপিদের ক্ষেত্রে ০% সুদ ধার্য করা হলেও তারা তা পরিশোধ করবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত ব্যাংক খাতে সুষ্ঠু জবাবদিহিমূলক প্রশাসন, স্বচ্ছ ও কার্যকরী মুদ্রানীতি নিশ্চিত হবে। যদিও এটা আমার নিজস্ব মতামত। আর আশাব্যঞ্জক যে সরকার যেহেতু প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠিন পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং বিদ্যমান ব্যাংক-কোম্পানি আইন সংশোধন করে যুগোপযোগী করা হবে। আমরা চাই সরকার এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে সাধারণ জনগণের আস্থা অর্জনে সচেষ্ট হবে।

n লেখক: শিক্ষার্থী,  রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়