বাংলাদেশ থেকে প্রবাসে পাড়ি দেওয়ার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে । উচ্চশিক্ষা, শ্রমবাজারের ব্যাপ্তি, ব্যবসা-বাণিজ্য, বাহিরদেশে বিনিয়োগসহ নানান কারণে এর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রবাসে প্রবাসীর জীবন-যাপনের সংখ্যা যেমন বাড়ছে একইসঙ্গে মৃত্যুর হারও প্রতি নিয়ত বেড়ে চলেছে।
বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের এক তথ্যমতে ২০০৫ থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত ৩৫ হাজার প্রবাসীর লাশ দেশে এসেছে। যারা মারা গেছেন তাদের মধ্যে ২৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী মানুষের লাশও আছে। বেশির ভাগ হার্ট অ্যাটাক, ব্রেনস্ট্রোক করে মারা গেছেন।
জানা যায়, ২০২০ সালে সবচেয়ে বেশি লাশ এসেছে সৌদি আরব থেকে ৭৬২টি এবং মালয়েশিয়া থেকে এসেছে ৬৯৬টি লাশ। এই তালিকায় এরপরে আছে কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, বাহরাইন। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশিই লাশ আসে। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসীকল্যাণ ডেস্কের তথ্য অনুযায়ী ২০২০ সালে মোট লাশ এসেছে ২ হাজার ৮৮৪টি আর ২০২১ সালের মে মাস পর্যন্ত লাশ এসেছে ১ হাজার ৫৫৪টি।
তবে যে সংখ্যক লাশ দেশে আসে তার দিগুণেরও বেশি লাশ প্রকৃতপক্ষে বিদেশের মাটিতেই পড়ে থাকে। যা প্রবাসীদের জন্য অত্যন্ত দুঃখ ও কষ্টের।
নানান জটিলতা বাধা বিপত্তির কারণে লাশ দেশে আনতে বা পাঠাতে সমস্যা হয়। যেমন করোনায় মৃত কর্মীদের, প্রবাসীদের কোনো লাশ দেশে আসেনি, দাফন হয়েছে বিদেশের মাটিতেই। করোনার বাইরে নানা কারণে জানুয়ারি ২০২০ থেকে ২০২১ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, বিভিন্ন দেশে ৪ হাজার ২৬২ কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। এদের বেশির ভাগই স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন। তাদের বেশির ভাগের বয়স ২৮-৪১ বছরের মধ্যে।
সারাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশির সংখ্যা সরকারি হিসেবে এক কোটির ওপরে। বেসরকারি মতে, এই সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম খাত রেমিট্যান্স। এর পরিমাণ রেডিমেড গার্মেন্টসে বা পোশাকশিল্প খাতের চাইতেও বেশ খানিকটা বেশি।
পোশাক খাতকে ছাড়িয়ে বৈদেশিক মুদ্রার জন্য এটিই শীর্ষ খাত। যার কারণে রাজনৈতিক বক্তব্যে যদিও প্রবাসীদের রেমিট্যান্স যোদ্ধা বলা হয় বাস্তবে তাদেরকে নিজ দেশের মাটিতে লাশটা ফেরাতে বা কোন প্রকার স্বসম্মানে নূনতম অধিকারটুকু পেতে দেখা যায় না।
অন্যদিকে আমাদের চারপাশে এমন ডামাডোল খুব শোনা যায়, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক রপ্তানি। সমাজের উঁচুতলার একটা শক্তিশালী গ্রুপ হওয়ার কারণে তৈরি পোশাক মালিকরা খুব জোর গলায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আমদানির মূল খাত হিসেবে নিজেদের দাবি করেন। আর সরকার থেকে বাগিয়ে নেন নানা সুবিধা। আর সমাজের অনগ্রসর শ্রেণির মানুষ হওয়ার কারণে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসী কর্মীরা সংগঠিত নন এবং তাদের আর্থসামাজিক অবস্থানের কারণেই রাষ্ট্র তাদের প্রাপ্য ন্যূনতম স্বীকৃতিটুকুও দিতে চায় না।
বিদেশে কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে প্রবাসী কর্মীদের মৃত্যুর হার দুঃখজনকহারে বেশি। এতোটা বেশি কেন তা কখনও খতিয়ে দেখা হয়নি। সঠিক কারণ জানতেও অনুসন্ধান করা হয়নি। তাদের মৃত্যুর কারণে যা লেখা হয় তাও পুনরায় খতিয়ে দেখারও নজির নেই। প্রবাসী কর্মীদের অভিযোগ, কর্মস্থলে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ এড়াতেও স্ট্রোকে বা হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুর কথা ডেথ সার্টিফিকেটে লেখা হয়।
অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) চেয়ারম্যান শাকিরুল ইসলামের মতে, অভিবাসী কর্মীদের মৃত্যুর ঘটনা পুনরায় ময়নাতদন্ত করার সুযোগ বের করা দরকার। কারণ, নিয়োগকর্তার দায় এড়ানোর সুযোগের জায়গা থেকে ম্যানিপুলেশন করা হতে পারে! যারা হার্ট অ্যাটাকে মারা যাচ্ছে বেশির ভাগই খুব কম বয়সের। এই হার্ট অ্যাটাকের কারণটি আসলে কী সেটা জানা দরকার।
প্রবাসী কর্মীদের এই ধরনের অকাল মৃত্যুতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার পুরো পরিবার। এ প্রসঙ্গে শাকিরুল ইসলাম আরও বলেন, আমরা যখন অভিবাসী কর্মীদের সুরক্ষার কথা বলি, তখন এই মারা যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে নিয়োগকর্তাদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ে কতটুকু কাজ করা হয়? কর্মীদের স্বাস্থ্যবীমা আছে, সেক্ষেত্রেও বীমার টাকা আদায়ে দূতাবাস একটি বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু আমরা জানি না বিভিন্ন কারণে মারা যাওয়া কর্মীদের বীমার টাকা দাবি করা হয় কিনা।
প্রবাসীদের লাশ দেশে আনতে যেসব কারণে সময় লাগে: প্রবাসী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোনও বাংলাদেশি বিদেশে মারা গেলে, সেদেশে বেশ কিছু আনুষ্ঠানিকতা থাকে। মৃত ব্যক্তির ময়নাতদন্ত, প্রকৃত স্বজনদের যাচাই, ঠিকানা, মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণ, মূল পাসপোর্ট, বকেয়া বেতন ও ইন্স্যুরেন্স- এসব বিষয় সামনে চলে আসে। জানা গেছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দূতাবাসের পক্ষ থেকে দ্রুত সহায়তা পাওয়া যায় না।
অন্যদিকে, কোনো প্রবাসী অবৈধপথে বিদেশে গেলে, তার ক্ষেত্রে ভোগান্তি হয় আরও বেশি। তার নাগরিকত্বসহ বিভিন্ন আইনি জটিলতা মিটিয়ে লাশ দেশে আনা সম্ভব হয়। এ ছাড়া, লাশ দেশে আনার ক্ষেত্রে বিমানের কার্গো খালি পেতেও অপেক্ষা করতে হয়।
এ প্রসঙ্গে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের বক্তব্য হলো, কোনো প্রবাসী যে দেশে মারা যায়, সেদেশের কিছু আনুষ্ঠানিকতা থাকে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে এসব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে সময় লেগে যায়। আর যাদের বৈধ পাসপোর্ট থাকে না, তাদের ক্ষেত্রে দূতাবাসের কিছু কার্যক্রমে সময় লাগে। তবে কোনও প্রবাসী মারা গেলে তাকে দ্রুত দেশে আনার জন্য সবসময় চেষ্টা থাকে।
প্রশ্ন হচ্ছে কেন, সরকারি খরচে প্রবাসীদের লাশ দেশে ফেরত আনতে হবে? মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য শ্রমবাজারে যেসব কর্মী প্রবাসে যান, তারা সবাই কোন না কোন কোম্পানির অধীনে চুক্তিবদ্ধ হয়ে যান। তাদের চুক্তিতেই থাকে শারীরিক অসুস্থতা বা মৃত্যুজনিত কারণে দেশে ফেরত পাঠানোর বিমানভাড়া ও মর্গের পাওনা সমুদয় অর্থ উক্ত কোম্পানি বহন করবে। তাই এই অংশটির কথা তখনই অন্তর্ভুক্ত হবে যখন চাকরিদাতা কোম্পানি দায় অস্বীকার করবে। কিন্তু শ্রমবাজার ছাড়া, চুক্তিছাড়া যেসব কর্মী নিজ প্রচেষ্টায় বিদেশ গেছেন। বছরের পর বছর দেশে কষ্টার্জিত অর্থ পাঠাচ্ছেন; তাদের লাশ দ্রুত প্রবাস থেকে দেশে ফেরত আনার ক্ষেত্রে সরকারকেই অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। এজন্য সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যৌথ ডেটাবেজ তৈরি করা জরুরি। এ স্পর্শকাতর বিষয়টি সরকারকে অবশ্যই মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিতে হবে।
কীভাবে প্রবাসে মৃত ব্যক্তির লাশ দেশে আনা হয়? বিদেশের মাটিতে প্রবাসীর মৃত্যুর খবর শোনার পর ব্যক্তির পরিবার ও নিকটাত্মীয়রা দুশ্চিন্তায় পড়ে যান কীভাবে এবং কতো দ্রুত সময়ে লাশ দেশে আসবে। আমরা অনেকেই বিদেশ থেকে দেশে লাশ আনার সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে জানি না। সেই কারণে আমরা আমাদের প্রবাসী ভাই-বোন বা আত্মীয়ের লাশ দেশে আনতে পারি না।
প্রবাসে কোনো বাংলাদেশি মারা গেলে, তার লাশ দেশে ফিরিয়ে আনা; মৃত ব্যক্তির পরিবার বা নিকটাত্মীয়ের ইচ্ছানুযায়ী লাশ শনাক্ত বা দাফনের জন্য- প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং জনশক্তি, কর্মসংস্থান এবং প্রশিক্ষণ ব্যুরো এর সঙ্গে সমন্বয় করে; পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে।
এক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির পরিবার বা নিকট আত্মীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কনস্যুলার ও কল্যাণ অনুবিভাগ বরাবর মৃত ব্যক্তির প্রয়োজনীয় তথ্যসহ একটি আবেদন করতে হয়। মৃত ব্যক্তির প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো হলো, ১. বাংলাদেশি নাগরিকত্ব প্রমাণের সনদপত্র, ২. পাসপোর্ট (প্রথম পাঁচ পাতা), ৩. ট্রাভেল পারমিট-এর অনুলিপি, ৪. চাকরি সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্যাদি (যেমন, চাকরিস্থল, চাকরিদাতার পূর্ণাঙ্গ নাম, ঠিকানা, টেলিফোন নম্বর ইত্যাদি এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য তথ্যাদি যদি থাকে)। উল্লিখিত তথ্য সংবলিত আবেদনপত্র প্রাপ্তির পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সাধারণত তিন কর্মদিবসের মধ্যে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট দূতাবাসে প্রেরণ করে থাকে।
উল্লেখ্য, লাশ দেশে ফিরিয়ে আনার পর তা পরিবার বা নিকট আত্মীয়ের নিকট হস্তান্তর এবং এই সংক্রান্ত আনুষঙ্গিক অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজ বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো করে থাকে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো এর ঠিকানা : ৮৯/২, কাকরাইল, ঢাকা। প্রবাসে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তির কোন পরিবারের সদস্য, নিকটাত্মীয় বা পরিচিত ব্যক্তি যদি তাঁর সঙ্গে থাকে তবে তিনি সেই দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করলে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসে একইভাবে সহযোগিতা করবে।
সবাইকে আরও সচেতন হতে হবে : এই দেশের প্রায় দেড় কোটি মানুষ দেশের বাইরে থাকেন। আশপাশের অনেক দেশের তুলনায় ৪/৫ গুণ বেশি টাকা খরচ করে, ধার-দেনা করে, জমিজমা বেঁচে (অনেক সময় ভিটেমাটিও) তারা বিদেশে যান। কর্মী হিসেবে বিদেশ যাওয়াদের মধ্যে- ওখানে গিয়ে বেতন কম পাওয়া, সঠিক সময়ে বেতন না পাওয়া, মালিকদের হাতে অত্যাচারিত/লাঞ্ছিত হওয়া, মানবেতর পরিবেশে বসবাস করা, চিকিৎসার পর্যাপ্ত সুবিধা না পাওয়া, বিকলাঙ্গ হলে ক্ষতিপূরণ না পাওয়া, মৃত্যু হলে স্বজনদের লাশ পেতে সমস্যা হওয়া- ইত্যাদি কোনো না কোনো সমস্যার মুখোমুখি হন।
এসব সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য সবাইকে আরও সচেতন হতে হবে, অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়া থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকতে হবে। এছাড়া কোনো কোম্পানির পক্ষে চুক্তি করে কাজ করতে গিয়ে, বেশি বেতনের প্রত্যাশায় চুক্তি শেষ হওয়ার আগে অন্য কোম্পানিতে চলে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। তা নাহলে কোম্পানির ক্লিয়ারেন্স না থাকাতে সে অবস্থায় মৃত্যু হলে বিড়ম্বনার শেষ থাকে না। লাশ দেশে আসতে অনেক দেরি হয়। অনেকে আবার উচ্চশিক্ষা, চিকিৎসাসহ নানা কাজে বিদেশে গিয়ে ভিসার মেয়াদ শেষ হলেও বাংলাদেশে ফেরত না এসে সে দেশে থেকে যেতে যান। আর সেটা যদি হয় ইউরোপ বা আমেরিকার মতো উন্নত দেশ, তাহলে তো কথাই নেই। কিন্তু এ অবস্থায় যদি মৃত্যুবরণ করেন, একটিবার ভেবে দেখুন, দেশে লাশটা আনতে স্বজনদের কী-ই না বিড়ম্বনায় পড়তে হয়! ক্ষেত্র বিশেষে দূতাবাসও অনেকটা অসহায় হয়ে পড়ে!