দেশে নির্বাচনের আবহ তৈরি হইয়াছে। পেশ করা হইয়াছে বর্তমান সরকারের শেষ বাজেট। ইহা সত্য যে, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভালো নাই। পূর্বের তুলনায় রিজার্ভ কমিয়াছে, ডলার-সংকট তৈরি হইয়াছে, কলকারখানায় স্থবিরতা তৈরি হইয়াছে। এই সময় আসিয়া নির্বাচনের ইস্যু হইতে পারিত অর্থনীতির এই বিষয়গুলি, যাহা সাধারণত অন্যান্য দেশে হইয়া থাকে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এমনকি পার্শ্ববর্তী ভারতেও নির্বাচনের বছরে অর্থনৈতিক সফলতা-বিফলতা আলোচনার কেন্দ্রে আসিয়া উপস্থিত হয়। কিন্তু বাংলাদেশে হইচইয়ের বিষয় হইয়া দাঁড়াইয়াছে কী লইয়া? সকলেই বলিতেছেন, ‘একটি সুষ্ঠু নির্বাচন চাই।’ খুবই ভালো কথা। গণতান্ত্রিক দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন চাইবারই কথা। ইহা লইয়া তো কোনো দ্বিমত থাকিবার কথা নহে। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ সকলেই বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বলিতেছে। কোনো দেশই বলে নাই যে, বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচন আমরা দেখিতে চাহি না। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দলের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বারবার সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা উল্লেখ করিতেছেন। তিনি মে মাসে কাতার সফরকালে বলিয়াছেন, ‘আগামী সাধারণ নির্বাচন গণতন্ত্র ও জনগণের ভোটাধিকার সমুন্নত রেখে অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হবে। জনগণই ঠিক করবে কে দেশ চালাবে।’ তিনি সম্প্রতি সংসদেও নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করিবার ব্যাপারে সরকার বদ্ধপরিকর বলিয়া জানাইয়াছেন। ইহা ছাড়াও তিনি বর্তমানে প্রায় প্রত্যেকটি বক্তব্যেই সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের জন্য দলীয় নেতাকর্মী ও দেশবাসীকে প্রস্তুত হইতে বলিতেছেন। সুতরাং প্রধানমন্ত্রীর কথা ও সুরের সঙ্গে কোনোই অসংগতি নাই যুক্তরাষ্ট্রের মন্তব্যের। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরও জানাইয়াছে, ‘বাংলাদেশের নির্বাচন অভ্যন্তরীণ ও ঘরোয়া বিষয়। যুক্তরাষ্ট্র চায় নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হোক এবং বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটুক।’
তাহা হইলে এত হইচই কীসের? যুক্তরাষ্ট্র যে ভিসা-নীতি করিয়াছে, তাহা একান্তই যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়। বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে উহার কোনো নেতিবাচক দিক আছে বলিয়া আমরা মনে করি না। এমন তো নহে যে, যুক্তরাষ্ট্রের এই ভিসা-নীতি বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো প্রত্যক্ষ বৈরিতার কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। অথচ ইহা লইয়া এবং নির্বাচন লইয়া নানা পক্ষ হইতে নানা রকম মন্তব্য আসিতেছে। কোনো কোনো দেশ পক্ষ-বিপক্ষের প্রশ্নটিও সামনে তুলিয়া আনিতেছে। নির্বাচন বাংলাদেশে, কিন্তু তাহা লইয়া বিভিন্ন দেশকে সম্পৃক্ত করিবার চেষ্টা বা আলোচনা মোটেই কাঙ্ক্ষিত নহে। কেহ বলিতেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সেন্টমার্টিন দ্বীপ চাহে, কেহ বলিতেছেন কোনো দেশ হয়তো গোটা দেশই লইয়া যাইবে। এই সকল আলোচনা অবান্তর এবং নির্বাচন বিষয়কেই কেবল জটিল করিতে পারে। কিন্তু প্রত্যেক গণতন্ত্রমনা ব্যক্তিরই সুষ্ঠু নির্বাচনের দিকেই মনোনিবেশ করা প্রয়োজন। আমরা জানি, গণতন্ত্রে নির্বাচনের কোনো বিকল্প নাই। শুধু সমাজতান্ত্রিক দেশগুলি ছাড়া পৃথিবীর সমস্ত দেশই নির্বাচনকেই প্রাধান্য দিয়া থাকে। বাংলাদেশও তাহার ব্যতিক্রম নহে। এই নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত যাহারা করিতে চাহে, যাহারা নির্বাচন দেখিলে ভয় পায়, জটিলতা সৃষ্টির প্রয়াস পায়, তাহারা গণতন্ত্রের শত্রু, জনগণের শত্রু, সরকারের শত্রু এবং বিশ্বের সকল গণতন্ত্রমনা দেশ ও মানুষের শত্রু। এই শত্রুদের প্রতিহত করাও প্রতিটি গণতান্ত্রিক মানুষের কর্তব্য।