আবৃত্তিকার আহকাম উল্লাহর অস্ত্রোপচার, দোয়া চাইলেন স্ত্রী

দেশের অগ্রগণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ও বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. আহকাম উল্লাহর অস্ত্রোপচার সোমবার (১৯ জুন) যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি ল্যাংগন হসপিটালে করা হবে। ঘাড়ের সামনের ও পেছনের অংশে জটিল অস্ত্রোপচার করা হবে বলে জানানো হয়েছে তার পরিবারের পক্ষ থেকে।  

এদিকে গতকাল শনিবার (১৭ জুন) রাতে স্বামী আহকাম উল্লাহর দেশের প্রতি ত্যাগ ও তার ওপর হওয়া নির্যাতনে কথা উল্লেখ করে দ্রুত সুস্থতার জন্য দেশের মানুষের কাছে দোয়া চেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ট্যাটাস দিয়েছেন স্ত্রী বিলকিস রহমান দোলা। নিচে স্ট্যাটাসটি তুলে ধরা হলো-

৩০ ডিসেম্বর, ২০০২ সালে, স্বরকল্পন এর ছায়ানট ভবন নির্মাণের ফান্ড রেইজিং এর আবৃত্তির অনুষ্ঠান স্থান রাশিয়ান কালচারাল সেন্টার থেকে সন্ধ্যা ৮ টার দিকে বেশ কয়েকজন সাদা পোশাকে আহকামকে নিয়ে যায়। সে সময় দেশের অনেক বিশিষ্টজন, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা জেলখানায় আটক। আহকাম সেই সন্ধ্যায় যে কবিতাগুলো আবৃত্তি করেছিলো তা উৎসর্গ করেছিলো শাহরিয়ার কবির, অধ্যাপক মুনতাসির মামুন ও সাবের হোসেন চৌধুরীকে। 

আবৃত্তির মঞ্চ থেকে আহকামকে নিয়ে যাওয়ায় রাত ৯টার দিকে হাসান আরিফ ফোন করে জানালেন খবরটা। সারারাত কোন খোঁজ পাইনি আহকাম বেঁচে আছে না আহকামকে মেরে ফেলেছে! ৩১ তারিখও সারাদিন আহকাম এর কোন খবর জানতে পারছিলাম না! সন্ধ্যায় জানতে পারি, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আহকামকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়েছে। আহকাম এর বিরুদ্ধে কোন্ অভিযোগে আটক করেছে তাও জানা নাই। আবৃত্তি শিল্পী শিমুল মুস্তাফার মাধ্যমে জানতে পারি আহকামকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেশিয়াম এ অপারেশন ক্লিনহার্ট নামে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের ক্যাম্প এ রাখা হয়েছে। তৎকালীন বিরোধীদল আওয়ামী লীগকে ঘায়েল করার জন্য চালানো হয় এই নৃশংস অভিযান অপারেশন ক্লিন হার্ট! এই সময় অনেককে হত্যা ও নির্যাতন করা হয়, বিএনপি জামাত পরবর্তীতে যাতে কোন বিচার করা না যায় এজন্য ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারী করে। এখানে আরও উল্লেখ্য যে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার যাতে কোন বিচার করা না যায় তাই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারী করে যা বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম ইনডেমনিটি। আর  অপারেশন ক্লিনহার্ট এর ইনডেমনিটি টি দ্বিতীয়। 

৩১ ডিসেম্বর ২০০২ সালে, যখন সবাই নিউইয়ার সিলেব্রেশনে ব্যস্ত, সেই মধ্যরাতে জানতে পারি আহকাম কে মতিঝিল থানায় আনা হচ্ছে। সন্দেহ ভাজন হিসেবে আহকামকে জিজ্ঞাসা বাদের জন্য গ্রেফতার করা হয়েছে। ততক্ষণে জানুয়ারির এক তারিখ ২০০৩ শুরু হয়ে গিয়েছে। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্টজনদের অনেকেই সেই মধ্যরাতে মতিঝিল থানায় চলে এসেছিলেন! রামেন্দু মজুমদার, নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, মামুনুর রশিদ, আফরোজা বানু, হাসান আরিফসহ আরও অনেকে। ঐ দিন ই সন্ধ্যায় আসাদুজ্জামান নূর এর নেতৃত্বে মহিলা পরিষদের সামনে আহকাম এর মুক্ক্তির  দাবিতে প্রথম মিছিল হয়। আমি যখন আহকামকে থানায় দেখলাম, আমি ওর হাত ধরলাম। আহকাম কাতরে উঠলো! আমি হাতের দিকে তাকিয়ে দেখি দুই হাতই পোড়া! আমি বুঝতে পারিনি কেন পোড়া! আমাকে শুধু বললো দ্যুতির খেয়াল রেখো। দ্যুতি তখন ১৫ মাসের ছোট্ট শিশু! 

পরের দিন থানা থেকে কোর্টে পাঠালো। ৫৪ ধারায় আহকামকে গ্রেফতার দেখানো হলো এবং পুলিশ ৭ দিনের রিমান্ড চাইলো কোর্টে। কোর্ট ১ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করলো। কোর্টে আহকাম এর সাথে দেখা হলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম হাতে কি হয়েছে? ওরা তোমাকে মেরেছে? আহকাম এর চোখ ছলছল করে উঠলো। আমাকে কিছু বলেনি। পরে সাদেকুর রহমান পরাগ কে বলতে শুনলাম, প্রতিটা আঙুলে তিন চারটা করে রিং পরিয়ে, কানে, মাথায় রিং পরিয়ে ইলেক্ট্রিক শকড দিয়েছে! জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এতোবার ইলেকট্রিক শকড দিয়েছে যে আহকাম এর হাতার কানের কপালের চামড়া পুড়ে গিয়েছে। 
ভাবছিলাম, ঐটুকুই বোধহয়! 

আহকাম আমাকে জেলখানার জন্য গরম কিছু কাপড় আর বেশ কিছু মেডিসিন কিনে পাঠাতে বললো। সব ব্যাথার ওষুধ আর ব্যাথ্যা কমানোর জন্য অনেকগুলো বেনগে কিনে দিতে বললো। বললাম, এতো বেনগে দিয়ে কি করবে?  তখনো চুপ করে ছিলো। পরবর্তীতে বেবি মওদুদ এর লেখা “কারা বন্দীদের দুঃসহ নির্যাতন” বই এ আহকাম এর ইন্টারভিউ আছে। ওখান থেকে জানতে পারি, আহকামকে ঐ রাতে শার্ট প্যান্ট খুলে, পা বেধে উল্টো করে ঝুলিয়ে পিটিয়েছে! এতো পিটিয়েছে যে আহকামের কোমড় থেকে পায়ের গোড়ালী পর্যন্ত কালো হয়ে গিয়েছে। রক্ত জমাট বেধেছে। ভীষণ ব্যাথ্যা! সেই রাতে শৈত্য প্রবাহ ছিলো। জিজ্ঞাসাবাদের নামে  পেটাতে পেটাতে যখন আহকাম জ্ঞান হারিয়ে ফেলে তখন ওকে ফ্লোরে ফেলে রাখে। যখনই সেন্স ফিরে তখন আবার টর্চার করতে থাকে। 

শেষ কোন ইচ্ছা আছে কি না জানতে চেয়েছিলো তারা! আহকাম বলেছিলো, “আমার মানি ব্যাগে আমার মেয়ের একটা ছবি আছে। ওটা দেখতে চাই।”

তারপরও যখন আহকামকে দিয়ে ওদের দেয়া লিখিত একটা কাগজে স্বাক্ষর করাতে পারেনি তখন, টর্চার আরও ভয়ঙ্কর হলো।খালি শরীরে, শৈত্য প্রবাহের মধ্যে, ফ্লোরে কয়েকজন চেপে ধরে, আহকাম এর মুখের উপর গামছা দিয়ে ঢেকে মুখের মধ্যে পানি ঢালছিলো। আহকাম নিঃশ্বাস নিতে পারছিলো না। বারবার সমস্ত শক্তি দিয়ে ঝাঁকি দিয়ে ওঠার চেষ্টা করেছিলো। যতক্ষণ আহকাম এর সেন্স ছিলো ততোক্ষণ চলছিলো নির্মম, নৃশংস এই অত্যাচার! আমি শুধু কাঁদলাম! অসহায় আমি জানিনা আমার আহকাম এর অপরাধ কি? কেন এমন নির্মমতা! সেই প্রশ্ন আজও আমার মন থেকে যায়নি। তবে আহকাম বেঁচে আছে এটাই আল্লাহর কাছে কোটি কোটি শুকরিয়া। 

২৬ শে ডিসেম্বর ২০০২ তারিখ পল্টন ময়দানে আওয়ামীলীগের সম্মেলন হয়। ২৯ ডিসেম্বর ২০০২ পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন হয়। ঐ বছর প্রথম আওয়ামীলীগের গঠনতন্ত্র সংশোধন করে নতুন পদ “সহ- সম্পাদক” সংযোজিত হয়। যার নাম: সহ- সম্পাদক, কেন্দ্রীয় উপকমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ।সেই সময়ের বিরোধী দলীয় নেত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনার আশীর্বাদে আহকাম ঐ কমিটেতে সহ- সম্পাদক হয়। তার পরের দিনই আহকামকে আটক করে নিয়ে যায়। এমন কি টর্চারের সময় আহকামকে বলেছিলো, আপনি যে এতো বড় নেতা সেটা জানতাম না! প্রথম আলোর মতো পত্রিকার শেষ পাতায় এতো বড় নিউজ, “তরুণ আওয়ামীলীগ নেতা গ্রেফতার।” সব কটা জাতীয় পত্রিকায় গ্রেফতারের খবর ছাপা হয়েছে। আপনাকেতো মেরে ফেলা যাবে না! কি লেখা ছিলো ঐ কাগজে? আহকাম স্বাক্ষর করলে কি হতে পারতো? 
তখন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতির সচিব ছিলেন সাবের হোসেন চৌধুরী। আহকামের এলাকা মতিঝিল। ওখানে রাজনৈতিক ভাবে সক্রিয় ছিলো আহকাম। সেই সূত্রে সাবের হোসেন চৌধুরীর সাথে ঘনিষ্ঠতা। রাজনৈতিক সহকর্মী। সাবের হোসেন চৌধুরী তখন এরেস্ট। ওরা হয়তো ভেবেছিলো আহকামকে দিয়ে সাবের হোসেন চৌধুরীকে জড়িয়ে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র সফল করবে।  এ ছাড়া অন্য কি কি কারণ থাকতে পারে তা আজও আমার বোধগম্য হয়নি। 

আমি দিনরাত এই কোর্ট থেকে ঐ কোর্ট, আওয়ামীলীগের পার্টি অফিস, জননেত্রী শেখ হাসিনার তৎকালীন বাসভবন সুধাসদন, জেলখানা! আপা আমাকে পাঠালেন এ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম (পরবর্তীতে এটর্নী জেনারেল) এর কাছে। অক্লান্ত পরিশ্রম করে হাইকোর্ট থেকে একটার পর একটা কেসের জাবিন করাচ্ছিলেন এ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম। এর মধ্যে আহকাম এর নামে ডিটেনশন জারী করলো। আমরা আর আহকাম কে দেখতে জেলখানায়ও যেতে পারিনা! এদিকে দ্যুতি বাবাকে দেখতে চায়, বাবা বাবা ডাকতে থাকে! কেন বাবা তার কাছে আসেনা! 

আমি হাইকোর্ট থেকে অনুমতি নিলাম, তাপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতি নিয়ে আহকাম এর সাথে ৩০ মিনিটের জন্য দেখা করতে গেলাম। আমি, মা, দ্যুতি আর মঞ্জু ভাই। কিন্তু আহকামকে গ্রিল, নেট, তার ঐ পাড়ে আহকাম আর আমরা এই পাড়ে! দ্যুতি কাঁদছে আর বলছে, বাবা কোলে নাও, আমাকে কোলে নাও বাবা। দ্যুতি কাঁদছে চিৎকার করে। আহকাম কতো অনুনয় বিনয় করে অনুরোধ করলো, একটা বার শুধু আমার মেয়েটাকে একটু কোলে নিতে দেন। আমরা সবাই কাঁদছিলাম। হঠাৎ দ্যুতি নেটের ভেতর ফুটো দিয়ে একটা আঙুল ঢুকিয়ে বাবাকে ধরার চেষ্টা করছিলো। আর বলতে থাকলো, বাবা কোলে নাও, কোলে নাও! এই প্রথম আমি আহকাম কে ভেঙে পরতে দেখলাম! 

তারপর এ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম হাই কোর্টে রিট করেন এবং আহকাম এর জামিন হয়। আহকামকে জেলখানা থেকে সরাসরি হসপিটালে ভর্তি করলাম। তখন এম আর আই করে জানলাম আহকাম এর ঘাড়ের ডিস্ক ভেঙ্গে সার্ভকাইকাল ভেইনে ঢুকে আছে টর্চারের কারণে। বহু অর্থপেডিক সার্জন, নিউরো স্পেশালিষ্ট দেখালাম। একমাত্র এ্যাপেলো হসপিটালের নিউরো সার্জন ম্যাথু চান্ডি ছাড়া সকলেই বললেন এখনই সার্জারি করতে হবে। শুধু ম্যাথু চান্ডি বললেন, মাত্র ৩২ বছর বয়স তোমার। অপারেশনের পর অনেক মেইনটেন করতে হবে। একটু ঝাঁকিতেও ডিস্ক সরে যেতে পারে। তুমি যদি আমার কথামতো চলতে পারো চাহলে ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত ভালো ভাবে চলতে পারবে। তোমার এম আর আই রিপোর্ট দেখলে যেকেউ বলবে এখনি অপারেশন করতে হবে। আরও বললেন, আমিতো তোমার অপারেশন করবো। তোমার এম আর আই এর না। তুমি অনেক স্ট্রং আছো। তুমি আমার কথা মতো কলার বোন পরে, শক্ত বিছানায় শুবে, এবং যতোটা সম্ভব ঝাঁকি এড়িয়ে চলবে। ফিজিও থ্যারাপি ও গ্যাবাপেন, ন্যাপ্রোসিন, আরো কিছু মেডিসিন দিলেন। যা গত বিশ বছর ধরে চলছে । প্রায়ই হাত নাড়াতে পারেনা। ঘাড় নাড়াতে পারে না। প্রচণ্ড ব্যাথা হয়। প্রায়ই ফিজিও থ্যারাপি করিয়ে চলতে হয়েছে আহকাম কে। 

গত বছর ২০২২ এ, নভেম্বর এর ৪ তারিখ ঘুম থেকে আর উঠতে পারছে না।বা হাত বা পা কোনটাই নাড়াতেও পারছিলো না। ফিজিও থ্যারাপিষ্ট চয়ন ভাই ৪৬ দিন প্রতিদিন বাসায় এসে থ্যারাপি দিতে থাকেন। একটু ভালো হওয়ার পর গত এপ্রিলে ২০২৩ এ নিউইয়র্কে আসলো, NYU Langone এর স্পাইন সার্জন প্রটোসপসালটিস নতুন করে আরও অনেক টেস্ট করালেন, ক্যাট্সক্যান রিপোর্ট মনিটরে থ্রিডি ডায়মেনশনে দেখালেন। বললেন, তোমার তো শুধু ডিস্ক ভাঙা না, পেছনের হাড় ও ভাঙা! মনিটরে বড় করে দেখালেন আর বললেন, কিভাবে তুমি এতো ব্যাথ্যা সহ্য করেছো বিশ বছর? 

কিছু বলার আর ভাষা নাই আমার! ১৯ জুন ২০২৩ আহকাম এর সার্জারি। দোয়া করার অনূর্ধ্ব রইলো।