ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা নীলক্ষেত মোড়ে গতকাল প্রায় পৌনে দুই ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করিয়াছেন। দুপুর ১২টার দিকে শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করিয়া সাত দফা দাবি জানান। জানা গিয়াছে, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবিগুলির মধ্যে রহিয়াছে—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার ভবনে সাত কলেজ শিক্ষার্থীদের হয়রানির কারণ ব্যাখ্যা করা এবং শিক্ষার্থীদের হয়রানি বন্ধ করা। যেই সকল শিক্ষার্থী পরবর্তী বর্ষের ক্লাস, ইনকোর্স পরীক্ষা ও টেস্ট পরীক্ষা পর্যন্ত অংশগ্রহণ করিবার পর জানিতে পারিয়াছেন যে তাহারা উত্তীর্ণ হন নাই, তাহাদের সর্বোচ্চ তিনটি বিষয় পর্যন্ত মানোন্নয়ন পরীক্ষার মাধ্যমে পরবর্তী বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষার সুযোগ প্রদান করা। সকল বিষয়ে উত্তীর্ণ হইবার পরও একজন শিক্ষার্থী সিজিপিএ পদ্ধতির জন্য অনুত্তীর্ণ হইতেছেন বলিয়া তাহারা সিজিপিএ শর্ত শিথিল করিবার দাবি জানান। বিলম্বে ফল প্রকাশের কারণ ও এই সমস্যা সমাধানে কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হইয়াছে—তাহার ব্যাখ্যা দেওয়ার পাশাপাশি সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে ফল প্রকাশ করা, সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অভিভাবক কে বা কাহারা এবং কোথায় তাহারা সমস্যা উপস্থাপন করিবেন—এই বিষয়টি সুনির্দিষ্ট করা এবং একাডেমিক ক্যালেন্ডার প্রণয়ন ও তাহার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিতকরণসহ শিক্ষকসংকট, শ্রেণিকক্ষসংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করিবার দাবি জানান তাহারা।
যদিও শিক্ষার্থীদের সাত দাবির ব্যাপারে ইডেন মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ একটি সংবাদমাধ্যমকে বলিয়াছেন যে, শিক্ষার্থীদের সাত দফা লইয়া ১৪ তারিখে তাহারা মিটিং করিয়াছিলেন, তখন হইতেই শিক্ষার্থীদের সাত দফার মধ্যে পাঁচ দফার ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হইয়াছে। তিনি জানাইয়াছেন, ২ ও ৩ নম্বর দফা লইয়া উভয় পক্ষের আরো আলোচনা করিতে হইবে। এমনকি গতকাল তাহাদের পূর্ব হইতে নির্ধারিত মিটিং ছিল, যাহা সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীরা জানেন। তাহার পরও শিক্ষার্থীদের এই বিক্ষোভ কর্তৃপক্ষের নিকট বোধগম্য হয় নাই। ইহার পূর্বে গত ৪ জুন সাত দফা দাবিতে ইডেন মহিলা কলেজের ফটক আটকে বিক্ষোভ দেখাইয়াছিলেন শিক্ষার্থীরা। আর অবরোধ-বিক্ষোভ মানেই যানজট, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে বিক্ষোভ-অবরোধ করিলে সৃষ্টি হয় তীব্র যানজটের। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, ‘যানজট’ শব্দটি রাজধানীতে এক আতঙ্কের নাম। রাজধানী ঢাকায় যানজটের কারণে প্রতিদিন ৩২ লক্ষ কর্মঘণ্টার অপচয় ঘটে। আর বত্সরে যেই আর্থিক ক্ষতি হয়, তাহার পরিমাণ প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এমন তথ্য ইতিপূর্বে জানাইয়াছে বিশ্বব্যাংক। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেই ঢাকার যানজট একটি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা; কিন্তু কোথাও কোনো সড়ক অবরোধ বা বিক্ষোভ কিংবা সভা-সমাবেশ থাকিলে সেই দিন ঢাকা দীর্ঘ সময়ের জন্য অচল হইয়া পড়ে। তবে ইহাও মানিতে হইবে যে, গণতান্ত্রিক দেশে নাগরিকদের যৌক্তিক দাবি ও অন্যায়ের প্রতিবাদ হিসাবে বিক্ষোভ প্রদর্শন তাহাদের গণতান্ত্রিক অধিকার।
শিক্ষার্থীরা যেই সকল দাবিতে বিক্ষোভ ও অবরোধ করিতেছেন, তাহা যৌক্তিক হইলে তাহাদের সমস্যার কেন সমাধান হইতেছে না এবং কেন তাহাদের বারংবার এই ধরনের আন্দোলন বিক্ষোভের মধ্যে যাইতে হইতেছে—ইহা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে গভীরভাবে ভাবিয়া দেখিতে হইবে। অন্যদিকে যৌক্তিক অধিকারের সহিত কোনো অযৌক্তিক শর্ত শিক্ষার্থীরা কখনো দিবেন না, এই আশা নিশ্চয়ই বাতুলতা নহে। শিক্ষার্থীরা আমাদের ভবিষ্যত্। সুতরাং তাহাদের দুর্ভোগ নিরসনের জন্য যাহারা দায়িত্বপ্রাপ্ত, তাহাদের আরো আন্তরিক ও সদিচ্ছাপূর্ণ মনোভাবাপন্ন হইতে হইবে। ইহার সহিত শিক্ষার্থীদের নিকটও আমরা যৌক্তিক ও দায়িত্বশীল আচরণ কামনা করি। জনজীবনকে স্থবির বা জিম্মি করিয়া আন্দোলন বা অবরোধ করিবার পথ হইতে বাহির হইয়া বিকল্প পথ খুঁজিতে হইবে। আর আলোচনা ব্যতীত কখনো সহজে কোনো সমস্যার সমাধান হয় না। সুতরাং সমস্যা সমাধানে সর্বাগ্রে আলোচনাকে জোর দিতে হইবে। এই ব্যাপারে আন্তরিক ও দায়িত্বশীল হইতে হইবে উভয় পক্ষকেই।