রাশিয়ায় ভাড়াটে সেনাদল ওয়াগনার গ্রুপের বিদ্রোহ অবসানের একদিন পর দেশটির সরকারি টিভিতে প্রথমবারের মতো দেখা গেল প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগুকে। ক্রেমলিন গতকাল সোমবার পুতিনের একটি ভিডিও বক্তৃতা অনলাইনে পোস্ট করে। এদিকে বিদ্রোহের পর পুতিনের অবস্থান নড়বড়ে হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। এর মধ্যেই পুতিনের পেছনে রাশিয়াকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী মিখাইল মিশুস্টিন। বিদ্রোহ বন্ধের বিনিময়ে ওয়াগনার প্রধান ইয়েভগেনি প্রিগোশিনের বিরুদ্ধে মামলা তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল রুশ কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এখনো তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে বলে রুশ গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে। যদিও শনিবারের বিদ্রোহের পর এখনো জনসমক্ষে দেখা যায়নি প্রিগোশিনকে। তার বেলারুশে নির্বাসনে যাওয়ার কথা। খবর বিবিসি ও সিএনএনের।
প্রথমবার প্রকাশ্যে পুতিন : ওয়াগনার গ্রুপের বিদ্রোহ অবসান এবং এই গ্রুপের নেতা প্রিগোশিনের রাশিয়া ত্যাগের পর সোমবার প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট পুতিনকে কোনো ভিডিওতে দেখা গেল। এতে একটি যুব শিল্প ফোরামে অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশ্যে পুতিনকে ভাষণ দিতে দেখা যায়। বাহ্যিক বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও রুশ শিল্পের কার্যক্রম স্থিতিশীল রাখার জন্য তিনি কোম্পানিগুলোর প্রশংসা করেন। তবে ভাষণে তিনি ওয়াগনারের বিদ্রোহ নিয়ে কিছু বলেননি। ভাষণটি কখন রেকর্ড করা হয়েছে, সেটা স্পষ্ট নয়।
অন্যদিকে গতকাল প্রথমবারের মতো টিভিতে দেখা গেছে রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী শোইগুকেও। তাকে ইউক্রেনে যুদ্ধরত রুশ সেনাদের পরিদর্শন করতে দেখা যায়, তবে কখন এবং কোথায় এসব ভিডিও ধারণ করা হয়েছে তার কোনো আভাস দেওয়া হয়নি। ওয়াগনার প্রধান প্রিগোশিন বিদ্রোহের সময় শোইগুকে ‘অশুভ’ বলে আখ্যায়িত করে তাকে তার পদ থেকে অপসারণের দাবি জানিয়েছিলেন। শোইগুর এ সফর যখনই হয়ে থাকুক, রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে যে তিনি স্বপদে বহাল আছেন।
‘পুতিনের পাশে থাকায় আহ্বান রুশ প্রধানমন্ত্রীর :ওয়াগনার বিদ্রোহের ২৪ ঘণ্টায় পুতিনকে যে বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে এমনটা তার ক্ষমতা গ্রহণের দুই দশকের মধ্যে কখনো হয়নি। এই বিদ্রোহ পুতিনের অবস্থান নড়বড়ে করে দিয়েছে বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক। এর মধ্যেই রুশ প্রধানমন্ত্রী মিখাইল মিশুস্টিন বলেছেন, রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন এবং দেশকে অবশ্যই প্রেসিডেন্ট পুতিনের পেছনে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। রাশিয়ার ন্যাশনাল অ্যান্টি-টেরোরিজম কমিটি জানিয়েছে দেশের পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে।
প্রিগোশিনের বিরুদ্ধে মামলা চলছে : ‘ওয়াগনারের বিদ্রোহ বন্ধের বিনিময়ে এর প্রধান ইয়েভগেনি প্রিগোশিনের বিরুদ্ধে মামলা তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল রাশিয়া। কিন্তু এখন রুশ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তার বিরুদ্ধে তদন্ত করছে। রাশিয়ার বার্তা সংস্থা ও একটি সংবাদপত্রের খবরে বলা হয়েছে, দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা এফএসবি এখনো একটি মামলায় প্রিগোশিনের বিরুদ্ধে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার সিদ্ধান্ত এখনো বহাল রয়েছে।
গত শনিবার বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কোর মধ্যস্থতায় বিদ্রোহ অবসানে রাজি হন প্রিগোশিন। এরপর ক্রেমলিন জানায়, বিদ্রোহ করার কারণে প্রিগোশিনের বিরুদ্ধে করা একটি মামলা খারিজ করা হবে। আর প্রিগোশিন বেলারুশে নির্বাসনে যাবেন। তবে বর্তমানে তিনি কোথায় আছেন, তা জানা যায়নি। শনিবার সর্বশেষ তাকে এসইউভি’তে করে রাশিয়ার দক্ষিণের শহর রোস্টভ-অন-ডন ছাড়তে দেখা গিয়েছিল।
ব্রিটিশ টেলিগ্রাফ পত্রিকার এক খবরে বলা হয়েছে, বিদ্রোহ বন্ধে সমঝোতায় আসার জন্য রুশ গোয়েন্দারা ওয়াগনার গ্রুপকে হুমকি দিয়েছিল। ওয়াগানারের নেতাদের পরিবারের ক্ষতি হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
‘এটি রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয়’ : ওয়াগনারের বিদ্রোহের ব্যাপারে চীন এ কয়েক দিন নীরব থাকলেও রবিবার রাতে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত বিবৃতি দিয়েছে। এতে বলা হয়, যা ঘটেছে তা রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয়। রাশিয়ার বন্ধুসুলভ প্রতিবেশী এবং অংশীদার হিসেবে চীন রাশিয়াকে তার জাতীয় স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির প্রয়াসে সমর্থন দেয়। এদিকে প্রেসিডেন্ট পুতিন গতকাল ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। ক্রেমলিনের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরানি প্রেসিডেন্ট রুশ নেতৃত্বের প্রতি তার পূর্ণ সমর্থন প্রকাশ করেছেন। এছাড়া পুতিন কাতারের আমিরের সঙ্গেও টেলিফোনে আলাপ করেন।
‘পুতিনের নেতৃত্বে ফাটল’ : যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই বলেছে যে, এই বিদ্রোহ ছিল রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের প্রতি এক সরাসরি চ্যালেঞ্জ এবং এতে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে তার নেতৃত্বে ফাটল ধরেছে। বিদ্রোহ নিয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। রবিবারের এই ফোনালাপ ইতিবাচক ও অনুপ্রেরণামূলক ছিল বলে জানান জেলেনস্কি। এদিকে ন্যাটো জোটের মহাসচিব ইয়েন্স স্টোলটেনবার্গ বলেছেন, ওয়াগনার গ্রুপের ব্যর্থ অভ্যুত্থান আরো একবার দেখিয়ে দিয়েছে যে পুতিন ইউক্রেনে অভিযান চালিয়ে একটি বড় ভুল করেছেন।
সামান্য ঘুরে দাঁড়াল রুবল : বিদ্রোহের ঘটনাবলীর পর রুশ মুদ্রা রুবলের মূল্যমান গত ১৫ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে যায়। তবে গতকাল সোমবার রুবলে দর ডলারের বিপরীতে ৮৭.২৩০০ থেকে ২ শতাংশ বাড়ে।