মানবসভ্যতার ইতিহাসে পৃথিবী নামক গ্রহটিতে এখন জনসংখ্যা বৃদ্ধি এক ভয়াবহ সমস্যা। এই সমস্যার কারণে বিশ্ব মোড়লেরা দারুণভাবে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। বিশ্বব্যাপী জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বের যে কোনো দেশের জাতীয় আয়ের মৌলিক উপাদান হচ্ছে প্রকৃতি ও জনসংখ্যা। মাটি, পানি, বায়ু, আলো, খনিজ সম্পদ—এসব কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূলে কাম্য জনসংখ্যা ও দক্ষ জনশক্তি। সর্বোচ্চ আয়স্তরের জনসংখ্যাকে কাম্য জনসংখ্যা বোঝায়। দেশের জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে আয়তনের চেয়ে জনসংখ্যা বেশি হলে বা অকর্মণ্য হলে সেই জনসংখ্যা সম্পদ নয়, এমন জনসংখ্যাকে আপদ বলে ধরে নেওয়া হয়। স্বাভাবিকভাবে জন্ম থেকে মৃত্যু কম হলে জনসংখ্যা বাড়ে। রোগব্যাধি, অপুষ্টি, মহামারিসহ কোনো কারণে ব্যাপক হারে মৃত্যু হলে মানবসম্পদের ক্ষতি হয়। মানবসভ্যতার সব মহৎ বিজ্ঞানী-চিন্তাবিদেরাই পৃথিবীর জনসংখ্যার বিষয়ে পাণ্ডিত্যপূর্ণ ধারণা পেশ করেছেন। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে ইউরোপে জন্মনিয়ন্ত্রণ আন্দোলনের সূচনা হয়।
১৭৯৮ সালে সুপণ্ডিত ধর্মযাজক ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ ম্যালথাস বলেছিলেন, ‘আবাদযোগ্য জমি ও অর্থনৈতিক উপায়-উপকরণ সীমিত এবং বংশবৃদ্ধির সম্ভাবনা পৃথিবীতে সীমাহীন। সুতরাং মানবজাতির স্বাচ্ছন্দ্য, কল্যাণ ও শান্তির জন্য বংশবৃদ্ধির সঙ্গে আয়ের সংগতি রক্ষা করে চলতে হবে। কখনো যেন জনসংখ্যা অর্থনৈতিক উপাদানের ওপরে যেতে না পারে। ১৮৩৩ সালে আমেরিকার বিখ্যাত চিকিৎসক চার্লস জেনটন এই প্রস্তাব সমর্থনসূচক ইঙ্গিত করে জন্মনিয়ন্ত্রণের উপকারিতার প্রতি গুরুত্ব দেন এবং সেই ধারণা থেকে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সূত্রপাত।
প্রতি বছর ১১ জুলাই সারা বিশ্বে জনসংখ্যা দিবস পালিত হয়। ১৯৮৭ সালে প্রথম দিবসটি পালন করা হয়। তখন বিশ্বের জনসংখ্যা ছিল ৫০০ কোটি, বর্তমানে ৮০০ কোটি। ১৯৮৮ সালে দিবসটি পালনের সিদ্ধান্তের পর জাতিসংঘসহ ৯০টি দেশ দিবসটি পালন করে ১৯৯০ সালে। বিশ্বের জনসংখ্যার পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৯ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা ছিল ৭৭০ কোটি, ২০৩০ সালে হবে ৮৫০ কোটি এবং ২০৫০ সালে দাঁড়াবে ৯৭০ কোটি। এভাবে জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে পৃথিবীতে খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, পানিসহ মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক উপাদানের তীব্র সংকট দেখা দেবে।
দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষুদ্রায়তনের জনবহুল একটি দেশ বাংলাদেশ। এই ভূখণ্ডে একসময় জন্ম-মৃত্যুর হার ছিল অনেক বেশি। গড়ে প্রতি দম্পতি ১০টি করে সন্তান জন্মদান করতেন। নানা রোগ-ব্যাধিতে মৃত্যুও ছিল বেশি। স্বাধীনতার আগে থেকে এই ভূখণ্ডে জন্মনিয়ন্ত্রণের প্রচার শহর পর্যায়ে শুরু হলে গ্রামে কেউ নামও শোনেনি। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর সরকার জনসংখ্যাকে জাতীয় পর্যায়ে এক নম্বর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে। ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে এক বেতার ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘একটা কথা ভুলে গেলে চলবে না, প্রতি বৎসর আমাদের ৩০ লাখ লোক বাড়ে এবং আমার জায়গা হলো ৫৫ হাজার বর্গমাইল, তাহলে ২৫-৩০ বছরে বাংলার কোনো জমি থাকবে না হালচাষের জন্য। বাংলার মানুষ বাংলার মানুষের মাংস খাবে। সেজন্য আমাদের পপুলেশন কন্ট্রোল ফ্যামিলি প্ল্যানিং করতে হবে।’ তার এই ভাষণের পর দেশে হইচই শুরু হয়ে যায়। তখন থেকে থানা পর্যায়ে এক জন কর্মকর্তা ও এক জন কেরানিকে চেয়ার-টেবিল দিয়ে জন্মনিয়ন্ত্রণের প্রচারণার কাজ শুরু করা হয়। ১৯৭৬ সালে প্রতিটি ইউনিয়নের তিনটি ওয়ার্ডে দুই জন করে ছয় জন নারী কর্মী এবং ইউনিয়নে এক জন পুরুষ কর্মী নিয়োগের আহ্বান করা হয়। তখন জন্মনিয়ন্ত্রণ শব্দটি ছিল গ্রামের মানুষের কাছে এক আতঙ্কের নাম। ফলে এই বিভাগে চাকরিতে মানুষ আগ্রহ দেখায়নি। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনার কারণে আওয়ামী লীগের নেতারা তাদের পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণি পাশ মেয়েদের উত্সাহিত করে চাকরিতে যোগদান করান। কর্মী নিয়োগের পর প্রায় ১৫ বছর পর্যন্ত গ্রাম-শহরের কর্মচারীরা জন্মনিয়ন্ত্রণের নামই উচ্চারণ করতে পারেননি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে থানা পর্যায়ে অফিস ভাঙচুর, নারী কর্মীদের লাঞ্ছনা, গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার মতো অনেক ঘটনা ঘটে। কর্মচারীরা মারা যাওয়ার পর অনেক স্থানে জানাজাও পড়া হয়নি। নিয়োগপ্রাপ্তরা স্থানীয় হওয়ায় অনেক অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করে চাকরি করেছিলেন। কর্মাচারীদের কৌশলী ভূমিকার কারণে নব্বইয়ের দশকের দিকে সারা দেশে ব্যাপক হারে স্থায়ী পদ্ধতি গ্রহণকারীর হার বাড়তে থাকে। জনপ্রতিনিধি ও মসজিদের ইমামদের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের প্রশিক্ষণ দেওয়ায় ধীরে ধীরে বাধা-আপত্তিও কমতে থাকে।
১৮৬০ সালে পূর্ব বাংলার জনসংখ্যা ছিল মাত্র ২ কোটি। ১৯৭১ সালে ছিল ৭ কোটি, ২০২০ সালে ১৬ কোটি ৮২ লাখ এবং ২০২৩ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ছিল ১৬ কোটি ৯৮ লাখ। ২০৫০ সালে এই সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ২২ কোটি। ১৯৭৫ সালে নারীদের গড় সন্তান জন্মদান বা মোট প্রজনন হার (টিএফআর) ছিল ৬ দশমিক ৩, ১৯৯১ সালে ৪ দশমিক ৩, ১৯৯৭ সালে ৩ দশমিক ৩, ২০০২ সালে ৩ দশমিক ৩, ২০০৭ সালে ২ দশমিক ৭, ২০১০ সালে ২ দশমিক ৫ এবং ২০১১ সালে ১ দশমিক ৩ এবং ২০২২ সালে ১ দশমিক ২২ শতাংশ। বাল্যবিবাহ বন্ধ, বিরতির পর সন্তান জন্মদানে বাংলাদেশের প্রশংসা এখন বিশ্ব জুড়ে। বাঙালি নোভেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন বাংলাদেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে অভূতপূর্ব সাফল্য দেখে বিশ্বের বিভিন্ন ফোরামে তুলে ধরেছেন। পাকিস্তানের ‘ডন’ পত্রিকা অনেক আগেই বলেছে, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নতি সাধন করেছে বাংলাদেশ। তার পরও জনসংখ্যা বৃদ্ধি থেমে নেই। জনসংখ্যা বৃদ্ধির দুটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে—(১) বাংলাদেশে সফলভাবে টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়িত হওয়ায় প্রসূতি ও শিশুমৃত্যু অনেক কমেছে, (২) বস্তি এলাকায় কম শিক্ষিত দম্পতিরা আয়রোজগারের আশায় অধিক সংখ্যায় সন্তান জন্মদান করছেন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে দম্পতিরা জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি চেয়েও খুঁজে পাচ্ছেন না। আশার আলো যে, বর্তমান সময়ে অধিকাংশ শিক্ষিত মেয়ে দুটি সন্তানের অধিক সন্তান জন্মদান করছেন না।
বিবিসি বাংলার ২০২২ সালের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৩০ বছরে বাংলাদেশে ধারাবাহিকভাবে জন্মহার কমেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৯১ সালে জন্মহার ছিল ২ দশমিক ১৭, ২০০১ সালে ১ দশমিক ৫৮, ২০১১ সালে ১ দশমিক ২২। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ময়নুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে দেওয়া তাঁর মতামতে বলেছেন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ আদর্শ অবস্থানে আছে। ১৫-৬৫ বছর বয়সের ৬৫ দশমিক ৫১ শতাংশ লোক এখন কর্মক্ষম। ২০১১ সালে প্রবীণের সংখ্যা ছিল ১১ দশমিক ৩ মিলিয়ন। বর্তমানে প্রতি বছর ৪ দশমিক ৪১ শতাংশ হারে এই সংখ্যা বাড়ছে।
১৯৯৮ ও ২০১৫ সালে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর দুটি নিয়োগবিধি প্রণয়ন করলেও রহস্যজনক কারণে এই বিভাগের মূল ফাউন্ডেশন FWA, FPI, FWV, SACMO অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ফলে তাদের প্রমোশন গ্রেড পরিবর্তন হচ্ছে না। একই পদ থেকেই অবসর গ্রহণ করছেন। অথচ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, স্বাস্থ্য, কৃষি বিভাগসহ অন্যান্য বিভাগের কর্মচারীরা অনেক ওপরে অবস্থান করছেন। FWA-এ গণ তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হয়ে চাকরি গ্রহণ করলেও তাদের ১৭তম গ্রেড দিয়ে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী করে রাখা হয়েছে। বিস্ময়কর বিষয় হচ্ছে, কেরানিদের নিয়োগবিধি থাকায় তাদের প্রমোশন দিয়ে এই বিভাগের বিসিএস ক্যাডারের মর্যাদা পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে। অথচ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে তাদের ন্যুনতম ভূমিকা নেই। এসব কারণে তৃণমূল কর্মচারীদের মধ্যে চরম হতাশা, ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাঠ পর্যায়ের অনেক কর্মচারী অভিযোগ করে বলেছেন, কেরানিরা আমাদের নিয়োগবিধি আটকে রেখে বড় অঙ্কের টাকা দিয়ে প্রমোশন নিচ্ছেন। আমাদের নিয়োগবিধির একটি খসড়া ফাইল নিয়ে অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে দড়ি টানাটানি করা হচ্ছে। কবে নিয়োগবিধি বাস্তবায়ন হবে, তা কেউ জানে না। প্রায় ৬০ হাজার কর্মচারীর মধ্যে ৩০ হাজার প্রমোশন না পেয়ে দুঃখ-বেদনা নিয়ে বিদায় হয়েছেন। নিয়োগবিধি বাস্তবায়ন, গ্রেড পরিবর্তন, প্রমোশন ও অন্যান্য বিভাগের সঙ্গে বেতনবৈষম্য দূরীকরণ পেনশনের ২০ শতাংশ টাকা কর্তন বাতিল করে যথাযথ মূল্যায়নের জন্য দাবি করেছেন কর্মচারীরা।
বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতির কারণে এই বিভাগের কর্মচারীদের কপালে কুড়ালের আঘাত পড়েছে। কর্মচারীদের সফল কাজের কারণে জনসংখ্যা আপদ নয়, এখন সম্পদ। কর্মচারীদের কাজের মূল্যায়ন করার জন্য অভিজ্ঞ মহল প্রধানমন্ত্রীর সুনজর কামনা করেছেন।
লেখক : কলামিস্ট ও সমাজ বিশ্লেষক