অনিদ্রায় অফুরন্ত প্রহর!

ঘুমাতে পারার অক্ষমতা বা একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকতে না পারার অবস্থাকেই ইনসমনিয়া (Insomnia) বা নিদ্রাহীনতা বলা হয়, এটি Sleep disorder নামেও পরিচিত। রাতে ঘুম না আসা বা এলেও বারবার ভেঙে যাওয়াকে  ইনসমনিয়া বা নিদ্রাহীনতা বলে।

ঘুমের প্রধান দুটি সমস্যা হলো ইনসমনিয়া, অর্থাৎ নিদ্রাহীনতা এবং হাইপারসমনিয়া, অর্থাৎ অতিরিক্ত ঘুম। অনিদ্রা স্বল্পমেয়াদি হতে পারে আবার দীর্ঘমেয়াদিও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের মস্তিষ্ক ও ঘুমবিষয়ক চিকিৎসক নেইট ফাভিনির মতে, ‘প্রত্যেকেরই কখনো না কখনো ঘুমের সমস্যা দেখা দেয়। ঘুমের সমস্যা যখন জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রভাব রাখতে শুরু করে, তখন তা অনিদ্রার সমস্যায় পরিণত হয়।’ বয়সভেদে বিশ্বের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষই নিদ্রাহীনতা বা ইনসমনিয়া ভুগছে। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি এবং অন্তঃসত্ত্বা নারী বা নতুন মায়েদের ৫০ শতাংশ পর্যাপ্ত ঘুম থেকে বঞ্চিত। শিশু থেকে বৃদ্ধ সবারই ইনসমনিয়া হতে পারে। বয়স অনুযায়ী শরীরে ঘুমের চাহিদা ভিন্ন হয়। একজন মানুষের সুস্থ থাকার অন্যতম নিয়ামক হলো ঘুম। স্বাভাবিক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন কমপক্ষে ছয় থেকে সাত ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন, শিশুদের ৯ থেকে ১৩ ঘণ্টা, নবজাতকদের ১২-১৭ ঘণ্টা ঘুমরে প্রয়োজন। এই ঘুমিয়ে পড়া স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার একটি অংশ। পরদিন কাজের জন্য উদ্যম পায় ঘুমের মাধ্যমে। কোনো কোনো ব্যক্তির এমন হয় যে, সারা দিন পরিশ্রম করেন অথচ দিন শেষে ঘুমাতে পারেন না। যার ফলে দিনের বেলা ঘুমোনো, কাজে মনোযোগ না দিতে পারা, সারা দিন মেজাজ খিটখিটে ও বিষণ্ন হয়ে থাকে। ঘুমের মাধ্যমে শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ে, টক্সিন নামক পদার্থ শরীর থেকে বের করে দিয়ে কর্মক্ষমতাও বাড়ে।

অনিদ্রার কারণ: আরামদায়ক ঘুমের অবস্থান না থাকা এবং ঘুমাতে অসুবিধা, রাতে জেগে থাকা, দৈনন্দিন কাজে মনোযোগ দিতে না পারা, মনে রাখতে অসুবিধা ঘুমের মধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া, যেমন স্লিপ অ্যাপনিয়া বা ঊর্ধ্ব শ্বসনতন্ত্রে বাতাসের চলাচলে সমস্যা বা অত্যধিক অ্যালকোহল গ্রহণ। এছাড়া সাইকোঅ্যাক্টিভ ড্রাগের ব্যবহার, অ্যালকোহল এবং অন্যান্য সেডেটিভের ব্যবহার বা প্রত্যাহার, যেমন—বিষণ্নতাবিরোধী ওষুধ এবং বেনজোডিয়াজেপাইনসের মতো ঘুমের ওষুধ, আর্থিক অশান্তি, অন্ত্রের সমস্যা যেমন—অম্বল বা কোষ্টকাঠিন্য ইত্যাদি অনিদ্রার কারণ।

 বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তির কারণে ইনসমনিয়ার ভুক্তভোগী।

অধ্যাপক ওয়াকার ‘হোয়াই উই স্লিপ’ বইয়ে লিখেছেন, ‘বিশ্বের একটা বিশাল অংশ অন্ধকারে জেগে থাকে। যে ঘুম তাদের নষ্ট হচ্ছে, সেটা যে পূরণ করা দরকার, সেটা তারা ভাবে না। তারা মনে করে, ‘যা গেছে তা গেছে।’

কারো চোখে হাজারো চেষ্টায় আসে না সেই ঘুম, আবার কেউ ইচ্ছে করে নিজেকে দূরে রাখছে এই ঘুম থেকে আর সময় দিচ্ছে অন্য কাজে। যার হয়তো অনেকগুলোই অহেতুক। এর ফলে আমাদের তৈরি হচ্ছে শারীরিক, মানসিক ও স্নায়বিক বিভিন্ন রোগ। বর্তমানে মানুষের নানামুখী ব্যস্ত জীবনের নানা চাপে নিদ্রাহীনতা ঘরে ঘরে একটি বিরাট সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারা দিন অক্লান্ত পরিশ্রমের পর শরীর যেন আর চলতে চায় না। মনে হয়, কোথাও একটু হেলান দিতে পারলেই ঘুমিয়ে পড়তে পারব। কিন্তু সেই মনে হওয়াটা মিথ্যা প্রমাণি হয়, যখন রাতে বিছানায় শুয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার করে দিলেও ঘুম আসে না। এ পর্যন্ত ১৫৩টি গবেষণা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদেরাগ ও ওজন বৃদ্ধি, উদ্বিগ্নতা, অবসাদ, বাইপোলার ডিসঅর্ডারসহ নানা রকম রোগের জন্ম হয়। জার্নাল সায়েন্সের সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদন বলছে, অনিদ্রার সঙ্গে  অন্যান্য অসুখ যেমন ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশতা এবং ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতার সঙ্গে ইনসমনিয়ার যোগসূত্র রয়েছে। নিদ্রাজনিত বিভিন্ন ধরনের মানসিক রোগ হতে পারে। যেমন: প্যারাসমনিয়া বা ঘুমের মধ্যে হেঁটে বেড়ানো। খিঁচুনি রোগের জন্য অনেক সময় সমস্যা হয়।

এক গবেষণা বলছে, কেউ টানা ১৭ থেকে ১৯ ঘণ্টা জেগে থাকলে মস্তিষ্কে যে ধরনের প্রভাব পড়ে, অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণেও একই ধরনের প্রভাব পড়ে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতি বৃদ্ধি পেতে থাকে। গবেষণা বলছে, কোনো ব্যক্তি যদি টানা ১১ দিন না ঘুমিয়ে থাকে, এতে স্বাভাবিক আচরণ ও দৈনন্দিন কাজেকর্মে মারাত্মক প্রভাব পড়ে, যা তাকে শর্ট টাইম মেমোরি লস থেকে শুরু করে হেলোসিনেশন, এমনকি মস্তিষ্ক বিকৃতির দিকেও নিয়ে যেতে পারে। অপর্যাপ্ত ঘুমে সড়ক দুর্ঘটনা, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা এবং জটিল রোগের ঝুঁকিগুলোও দেখা যায়। সকালে তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠা ব্যক্তিদের চেয়ে রাতজাগা মানুষের অকালমৃত্যুর আশঙ্কা অনেক বেশি। এই ঘুমের সমস্যার সঙ্গে যোগসূত্র আছে আত্মহত্যার। অপর্যাপ্ত ঘুমের প্রভাবে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায় এবং দ্রুত মুড পরিবর্তন হয়। ঘুমের সমস্যা বর্তমানে এক মহামারির মতো সবার কাঁধে ঝেঁকে বসেছে। হার্ভার্ড মেডিক্যালের গবেষণায় দেখা গেছে, যারা পাঁচ ঘণ্টা ঘুমান, তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি শতকরা ১৫ শতাংশ বাড়ে। তবে ছয় থেকে সাত ঘণ্টার পরিবর্তে আরো বেশি ঘণ্টা ঘুমালেই যে তা ভালো ঘুম তা কিন্তু নয়, বরং ছয় থেকে সাত ঘণ্টা ঘুম হতে হবে ভালোভাবে।

বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিনের ভাষায় ‘তাড়াতাড়ি ঘুমানো এবং ঘুম থেকে তাড়াতাড়ি ওঠা একজন মানুষকে স্বাস্থ্যবান, জ্ঞানী ও সম্পদশালী বানায়’।

লেখক: প্রাবন্ধিক