এই জনপদকে বসবাসের উপযুক্ত করিতেই হইবে

যক্ষবেশী বক অনেকগুলি প্রশ্ন করিয়াছিল বনবাসী রাজা যুধিষ্ঠিরকে। তাহার মধ্যে একটি প্রশ্ন ছিল—‘আশ্চর্য কী?’ যুধিষ্ঠির উত্তরে বলিয়াছিলেন, ‘প্রতিদিন জীবগণ মরিতেছে, অথচ অবশিষ্ট সকলে অমরত্ব আকাঙ্ক্ষা করে—ইহা অপেক্ষা আর আশ্চর্য কী?’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলিয়াছেন, ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে,/ মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।’ কিন্তু জন্মিলে তো মরিতে হইবেই। মহান আল্লাহ্‌ (সুরা নিসা, আয়াত-৭৮) ঘোষণা করিয়াছেন—‘তোমরা যেইখানেই থাকো না কেন, মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাইবেই, যদিও তোমরা কোনো শক্ত ও সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান করো।’ মহানবী (স.) এরশাদ করিয়াছেন—‘আদম সন্তান বৃদ্ধ হইয়া যায় কিন্তু তাহার দুইটি বিষয় অবশিষ্ট থাকে—লোভ ও আশা।’ যাহার ফলে মৃত্যু না আসা পর্যন্ত মনে হয় মৃত্যু তুচ্ছ বিষয়। যদিও প্রতিদিন হাজারো অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর খবর তাহার কানে আসে; কিন্তু হাজারো অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর খবর শুনার পরই ভাবে তাহার মৃত্যুর সময় হয়তো এখনো হয় নাই। সে আসলে নানাভাবে মৃত্যুর কথা ভুলিয়া থাকে, মৃত্যু হইতে পালাইতে চাহে; কিন্তু আল্লাহতায়ালা বলিয়াছেন, ‘আমি তোমাদের মৃত্যুর সময় ঠিক করিয়া দিয়াছি।’ (সুরা ওয়াকিআহ :৬০)।

মুশকিল হইল, নির্বোধ ক্ষমতাবানরা ভুলিয়া যান ধর্মের কথা, জগতের পরম সত্যকথা। আমরা দেখিতে পাই চারিদিকে হানাহানি-মারামারি, খুনখারাবি, বিভিন্ন অস্ত্রের চোখরাঙানি, কথিত শক্তিশালীদের চমকানি ধমকানি শাসানি। যাহারা এত ধরনের অন্যায় অত্যাচার জুলুমবাজি এবং সাধারণ মানুষের ক্ষতিসাধন করিতেছে, তাহারা কেহই চিরকাল বাঁচিয়া থাকিতে পারিবেন না। অনেকেই ক্ষমতার স্বাদ পাইয়া মনে করেন, তাহারা যেন অমর! কিন্তু তাহারা যদি প্রতিক্ষণ স্মরণে রাখিতেন—রাতে ঘুমাইতে যাইতেছি, সেই ঘুমই শেষ ঘুম হইতে পারে; যেই খাবারটা খাইতেছি—উহাই শেষ খাবার হইতে পারে; তাহা হইলে অন্তত তাহাদের হৃদয়ে মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি ভয় জাগরূক থাকিত, তাহারা মানুষের ক্ষতিসাধন করিতেন না। পার্থিব জগতে কিছুই তো থাকিবে না। কে অমর রহিবে? আমরা দেখিয়াছি প্রাচীন যুগে অমরত্ব লাভের মানসে প্রাচীনকালে রাজা-মহারাজারা বিভিন্ন কেমিস্ট নিয়োগ করিতেন অমৃতসুধা আবিষ্কারের জন্য। খ্রিষ্টপূর্ব ২০০ বছর পূর্বেকার চীনের মহাপরাক্রমশালী সম্রাট কিন শি হুয়াং মৃত্যুর কথা চিন্তাই করিতে পারিতেন না। অমরত্বের সুধা বানাইবার ব্যর্থতার দায়ে তিনি প্রায় ৪৫০ বিজ্ঞানীকে জীবন্ত কবরও দিয়াছিলেন। তাহার পরও অমরত্ব সুধা হুয়াংকে অমরত্ব দান করিতে পারে নাই। তাহার মৃত্যুর পর মৃতদেহটিকে পচা মাছ দিয়া ঢাকিয়া দেওয়া হইয়াছিল, যাহাতে মৃতদেহের পচা গন্ধ চাপা পড়িয়া যায়। জীবিতাবস্থায় কিন শি বড় গলায় বলিতেন—তাহার বংশধরেরা সহস্র-অযুত বছর রাজ্য শাসন করিবে। অথচ বিধাতার নির্মম পরিহাস হইল—তাহার মৃত্যুর মাত্র তিন বছরের মধ্যেই তাহার বংশের আস্ফালন চিরতরে শেষ হইয়া যায়।

প্রকৃত অর্থে মহাকালের নিষ্ঠুর করাল গ্রাসে সকলকে ক্রমশ বিলীন হইয়া যাইতেই হয়। এই জন্য পৌরাণিক যুগে ঋষির নিকট বসিয়া শিষ্য যখন জিজ্ঞাসা করেন, ‘কী করিয়া অমর রহিব, গুরুদেব?’ ঋষি উত্তরে বলেন, ‘মানুষের জন্য ভালো কাজ করো বত্স, মানুষের মনে অমর রহিবে।’ অমর হওয়া যায় কেবল নিজেদের ভালো কাজের মাধ্যমে। আর খারাপ কাজের জন্য কোনো না কোনো সময় মহাকালের কাঠগড়ায় দাঁড়াইতেই হয়। অর্থাৎ মানুষ মূলত বাঁচিয়া থাকে তাহার সুকীর্তির মাধ্যমে। এই জন্য সুকীর্তি এত গুরুত্বপূর্ণ। কবি সুকান্ত যেমন বলিয়াছেন :‘জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপ-পিঠে।/ চলে যেতে হবে আমাদের।/ চলে যাব—তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ/ প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল...।’ সুতরাং এই জঞ্জাল দূর করিবার জন্য আমাদের প্রাণপাত করিতে হইবে। নচেৎ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা এই জনপদকে বসবাস উপযুক্ত করিয়া যাইতে পারিব না। যেইভাবেই হউক, এই জনপদকে বসবাসের উপযুক্ত করিতেই হইবে। ইহা প্রতিটি দায়িত্বশীল মানুষের ইমানি দায়িত্ব।