সহিংসতা শত্রুতা বাড়ায়

পত্রপত্রিকায় প্রতিনিয়তই কোনো না কোনো সহিংসতার খবর ছাপা হয়। টেলিভিশনেও প্রায় প্রতিদিনই হত্যা কিংবা কোথাও কোথাও সহিংসতার খবর ফলাও করে প্রচার করে। হত্যা শব্দটির মধ্যে ভয়ভীতি, আতঙ্ক, হতাশা, নিষ্ঠুরতা, হূদয়হীনতা, উন্মাদনা, পৈশাচিকতা, বর্বরতা, ক্ষোভ, প্রতিশোধের স্পৃহা, ঘৃণা, দুঃখ, বেদনা, আফসোস, অন্যায় লাভ ইত্যাদি সবই জড়িয়ে আছে। হত্যা ঘৃণিত, নিন্দনীয় এবং মোটেও কাম্য নয়। বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ৩০০ ধারানুসারে যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে, অন্য কোনো ব্যক্তির দেহে আঘাত বা জখম করে মৃত্যু ঘটায় তখন তাকে হত্যা বা খুন বলা হয়। অর্থাত্ হত্যা বলতে বোঝায়, যদি কোনো ব্যক্তি অপর কোনো ব্যক্তিকে ইচ্ছাকৃতভাবে, ব্যক্তিগত আক্রোশবশত কিংবা কোনো হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য পূর্বপরিকল্পিতভাবে আঘাত বা জখম করে মৃত্যু ঘটায়। বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩০২ ধারানুযায়ী হত্যাকারী বিচার সাপেক্ষে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন। হত্যায় অভিযুক্ত যে কোনো ব্যক্তিকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার করা যাবে। এবং এটি অজামিনযোগ্য অপরাধ।

বাংলাদেশে হত্যার প্রধান কারণসমূহ নিম্নরূপ : ১. জমিজমাসংক্রান্ত, ২. গ্রাম্য দলাদলি, ৩. মেয়েঘটিত বিরোধ, ৪. পূর্বের শত্রুতাবশত, ৫. পারিবারিক গন্ডগোল, ৬. ডাকাতির সময় বাধা পেলে, ৭. অন্যায় লাভের জন্য, ৮. উসকানিমূলকভাবে বা হঠাত্ উত্তেজনাবশত,  ৯. নানাবিধ কারণ (ক) রাজনৈতিক অস্থিরতা, (খ) নির্বাচনসংক্রান্ত, (গ) সাম্প্রদায়িকতা, (ঘ) প্রভাব, অধিপত্য বিস্তার বা ক্ষমতার জন্য।

কথায় আছে হত্যা হত্যাকে ডেকে আনে। সিনেকার মতে, ‘একটি ছুরি কখনো কাউকে হত্যা করে না, সে কেবল ঘাতকের দ্বারা ইচ্ছেমতো ব্যবহূত হয়।’ শেক্সপিয়ার এর মতে, ‘রক্তবাহিত পথের কোনো সত্য ভিত্তি নেই। অন্যের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে কেউ জীবন পেতে পারে না।’ মার্টিন কিং লুথার বলেছেন, ‘মানুষকে কীভাবে মানুষ হত্যা করে তা আমার কাছে বোধগম্য নয়।’

পুলিশ ও র্যাব এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে চাকরি করাকালীন শত শত হত্যা মামলার ঘটনা সম্পর্কে জানা, মামলার তদন্ত, তদন্ত তদারকি এবং হত্যার কারণ অবগত হওয়ার সুযোগ হয়েছে, যা মনকে ব্যথাতুর, বেদনাদায়ক করে তোলে এবং পীড়া দেয়। কখনো-বা দুচোখ অশ্রুতে ভরে যায়। হত্যাকাণ্ডের ঘটনা শুনে সব সময় শিহরিত হয়েছি। ভেবেছি মানুষ কীভাবে মানুষকে হত্যা করতে পারে। এমন অনেক হত্যার তদন্ত করেছি, যেখানে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হত্যার কারণে পরিবারটি নিঃস্ব হয়ে পথে বসেছে। কিংবা গরিব কৃষকের ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। বাবা-মা খেয়ে না খেয়ে ছেলেকে পড়িয়েছে। পাস করে ছেলে একটি ভালো চাকরি পেলে তাদের অভাব-অনটন দূর হবে। কিন্তু  ছেলের নির্মম হত্যা তাদের স্বপ্নকে বিলীন করে দিয়েছে। আবার ছেলে কর্তৃক পিতা-মাতাকে কিংবা পিতা-মাতা কর্তৃক ছেলেকে হত্যার অনেক ঘটনা প্রতিনিয়তই বাংলাদেশে ঘটে যাচ্ছে যা শুধু বিবেককেই নাড়া দেয় না। মানবতাকেও কাঁদায়। প্রতিটি হত্যাই দুঃখ বয়ে আনে, যা পূরণ হবার নয়।

মাঝে মাঝে পত্রপত্রিকায় পাকিস্তানের ‘অনারকিলিং’-এর খবর প্রকাশ করা হয়। সেখানে বাবা-মায়ের অমতে কোনো ছেলেমেয়ে বিবাহবন্ধনে কিংবা একে অপরের সঙ্গে ভালোবাসায় আবদ্ধ হলে, তাদেরকে অনার কিলিংয়ের নামে হত্যা করা হয়, যেটা নির্মম এবং বর্বরতার বহিঃপ্রকাশ। আইন এটা কোনোমতেই সমর্থন করে না। বাংলাদেশের পার্বত্য জেলা বান্দরবানের রুমা থানায় চাকরিকালীন এ ধরনের দুটি ঘটনা ঘটতে দেখেছি, যেখানে পরিবারের অমতে বিয়ে করায় দুটো পৃথক ঘটনায় দুজোড়া ছেলেয়েকে পরিবারের লোকেরা গাছের সঙ্গে বেঁধে গুলি করে হত্যা করে। দুটি মামলাই আমি তদন্ত করেছিলাম। পরিবারের মর্যাদা বজায় রাখার জন্য তাঁরা এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল।

হত্যা হত্যাই। হত্যা কোনো সমাধান নয় বরং শত্রুতা বাড়ায়। অনেক সময় হত্যা হত্যাকে ডেকে আনে। হত্যা আইনত দণ্ডনীয়। কোনো ধর্মেই হত্যা সমর্থনযোগ্য নয়। ইসলাম ধর্মে হত্যাকে নিষেধ করা হয়েছে। হত্যা দুঃখ এবং ঘৃণা বয়ে আনে। দীর্ঘসূত্রতা ও বিচারহীনতা হত্যাকে উত্সাহিত করে। আইনের মাধ্যমে হত্যাকারীর হত্যা সবারই কাম্য। দ্রুততম সময়ের হত্যার বিচার ক্ষতিগ্রস্তদের বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ন্যায়বিচারের পথকে অবশ্যই প্রশস্ত করে। হত্যাকারী শাস্তি পেলে হত্যা অবশ্যই কমবে, নচেত্ নয়।

n লেখক : সাবেক পুলিশ-র্যাব কর্মকর্তা