একটি রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় নেতাকে গত শনিবার নৃশংসভাবে হত্যা করা হইয়াছে। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ হইতে জানা যায়, শনিবার মধ্যরাতে লাল রঙের একটি প্রাইভেট কার হইতে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের সামনে তাহার লাশ এক তরুণ ও এক তরুণী ফেলিয়া যায়। পরে পথচারীরা উদ্ধার করিয়া হাসপাতালে লইয়া গেলে ততক্ষণে তাহার শরীর হইতে প্রাণ বাহির হইয়া যায়। এই হত্যাকাণ্ডে যেই বিষয়টি আমাদের হতবিহ্বল করিয়া দেয়, তাহা হইল হত্যার ধরন। পিরোজপুরের ইন্দুরকানির এই নেতাকে ঢাকায় হত্যা করা হইয়াছে অত্যন্ত নৃশংস ও নির্মমভাবে। তাহার হাত ও হাতের কবজি ভাঙিয়া ফেলা হইয়াছে এবং পায়ে ড্রিল মেশিন দিয়া ছিদ্র করিয়া অত্যাচারের মাধ্যমে হত্যা করা হইয়াছে।
মানুষ তো সৃষ্টির সেরা জীব—আশরাফুল মাকলুকাত। মানবসমাজে যাহারা অশান্তি, নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, যাহারা হানাহানি, উগ্রতা, সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে বর্বরতা প্রদর্শন করে, তাহাদের যেন বিবেক বলিয়া কিছু নাই! তাহারা যেন মানুষই নহে! কারণ সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে মানবজাতির জীবনমরণ, মানসম্মান—সকল কিছুই মহান আল্লাহর পবিত্র আমানত। কোনো ব্যক্তি যদি এই আমানতের ব্যত্যয় ঘটাইয়া কোনো নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে, তাহা হইলে ইহার জন্য তাহাকে আল্লাহর বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াইতে হইবে। অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যাকে সবচাইতে বড় গুনাহ বলিয়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করিয়া নরহত্যার ভয়ানক পরিণাম সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে, ‘নরহত্যা বা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি ছাড়া কেহ কাহাকে হত্যা করিলে সে যেন দুনিয়ার সমগ্র মানবগোষ্ঠীকে হত্যা করিল; আর কেহ কাহারো প্রাণ রক্ষা করিলে সে যেন পৃথিবীর সমগ্র মানবগোষ্ঠীকে প্রাণে রক্ষা করিল।’ (সুরা আল-মায়িদা, আয়াত : ৩২)। এইভাবে মহান আল্লাহ কোনো মানবসন্তানকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা কঠোর ভাষায় নিষিদ্ধ করিয়াছে। এই জন্য কিয়ামতের দিন নরহত্যার বিচার করা হইবে সকলের পূর্বে, তাহার পর অন্যান্য অপরাধের শাস্তি হইবে। স্মর্তব্য যে, যখনই কেহ অবৈধ হত্যায় লিপ্ত হয় তাহার উপর হইতে আল্লাহর ‘রহমত’ উঠিয়া যায়। এই ব্যাপারে রসুলুল্লাহ (স.) বলিয়াছেন, ‘একজন প্রকৃত মুমিন তাহার দ্বীনের ব্যাপারে পূর্ণ প্রশান্ত থাকে, যে পর্যন্ত সে অবৈধ হত্যায় লিপ্ত না হয়’ (বুখারি)। যে কোনো বিবেকবান, সচেতন, বুদ্ধিমান ও ধর্মপ্রাণ মানুষমাত্রই জানেন—জীবনের মালিক যেমন আল্লাহ, তেমনি মৃত্যুর মালিকও তিনি। এমনকি আত্মহত্যা করিবার অধিকারও কাহারো নাই। সুতরাং নিরপরাধ কাহারো মৃত্যু ঘটাইবার বা হত্যা করিবার কোনো এক্তিয়ার আল্লাহ কাউকে দেন নাই। মনে রাখিতে হইবে, জীবন ক্ষণস্থায়ী বা দীর্ঘস্থায়ী—যাহাই হউক না কেন, আল্লাহর দৃষ্টিতে তাহা অত্যন্ত মূল্যবান। এই জন্য মহান আল্লাহ বলিয়াছেন, কেহ কাহাকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করিলে ‘তাহার শাস্তি জাহান্নাম, যেইখানে সে চিরকাল থাকিবে। (সুরা নিসা : ৯৩)। মহান ইশা মসিহ (আ.) নবীকে যখন অকথ্য ও নৃশংস অত্যাচারের পর ক্রুশবিদ্ধ করিয়া হত্যা করা হইয়াছিল, তখন সেই রক্তাক্ত মুহূর্তে মৃত্যুযন্ত্রণাকে তুচ্ছ করিয়া তিনি শত্রুকে ক্ষমা করিবার মানসে মহান সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশে বলিয়াছিলেন—‘তুমি ইহাদের ক্ষমা করিয়ো, ইহারা জানে না ইহারা কী করিতেছে।’
তবে কথায় আছে—চোরা নাহি শোনে ধর্মের কাহিনী। যাহাদের বিবেক তালাবদ্ধ, যাহারা সামান্য স্বার্থের যূপকাষ্ঠে মানবতাকে বলি দিয়া নরহত্যার মতো অপরাধ করিতেও পিছপা হয় না, তাহারা নিঃসন্দেহে নির্বোধ। তাহারা একপর্যায়ে নিজেদের ইহকাল নষ্ট করে, পরকালও নষ্ট করে। কারণ মহান আল্লাহতালা সকল গুনাহ ক্ষমা করিলেও হত্যাকারীকে কখনো ক্ষমা করিবেন না। হত্যাকৃত ব্যক্তি ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, যুবক-বৃদ্ধ—যেই রকমই হউক না কেন, হত্যাকারীকে ইহার শাস্তি পাইতেই হইবে। অন্যদিকে, এই সমাজকে স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ করিতে ইহকালেও এই অপরাধীদের বিচার হওয়া জরুরি। তাহা রাষ্ট্রের কাজ। রাষ্ট্র নিশ্চয়ই অশান্তি ও অস্থিতিশীলতার পক্ষে নহে।