প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকজন পক্ষে থাকিলে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির নির্বাচনে আর কাহারো তেমন প্রয়োজন হয় না। তাহা না হইলে সামান্য স্থানীয় সরকারের নির্বাচনেও কেন ভিত্তিহীন ও ঠুনকো মামলায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর ঘনিষ্ঠ ও শীর্ষ নেতাকর্মীদের গ্রেফতার থাকিতে হয়? নির্বাচনকালে কেনই-বা তাহাদের জামিন দেওয়া হয় না? এই সকল দেশের যে কোনো নির্বাচনে অভিযোগ ও পালটা অভিযোগ থাকিবে, ইহাই স্বাভাবিক; কিন্তু এই সকল দেশে সাম্প্রতিককালে একটা প্রবণতা লক্ষণীয় যে, ইয়াবা, ফেনসিডিল ও অন্যান্য মাদক কারবারিরা এবং চাঁদাবাজ ও অবৈধ অর্থ উপার্জনকারীরা সেই অর্থের কিয়দংশ দিয়া ছলেবলে কৌশলে নির্বাচনের বৈতরণী পার হইতেছে ন্যক্কারজনকভাবে। তাহাদের অর্থ ও পেশিশক্তির দাপটে অনেকেই অসহায় ও নিরুপায় হইয়া পড়িতেছে। তাহারা নিজেরা দোষ করিয়া উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপাইয়া দিতেছে। দলীয় অফিস নিজেরা ভাঙচুর করিয়া জাতীয় নেতার ছবি ভাঙচুরের অজুহাতে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করিতেছে। অথচ নিজেদের ছবি সেইখানে ঠিকই শোভা পাইতেছে। উন্নয়নশীল বিশ্বে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জুডিশিয়ারির একশ্রেণির লোক তাহাদের অর্থ দ্বারা কেনা গোলামে পরিণত হইয়াছে। এই জন্য এই সকল দেশে আর যাহাই হউক একটি অবাধ, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আশা করা বাতুলতা মাত্র।
এই সকল দেশে এমন এক অবস্থা তৈরি হইয়াছে যে, নির্বাচন চলাকালে ভোটকেন্দ্রে ও ইহার আশপাশে কেবল ক্ষমতাসীনদের লোকই থাকিবে। ভয়ভীতির কারণে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর এজেন্টরা পর্যন্ত ভোটকেন্দ্রে থাকিতে পারেন না বা তাহাদের থাকিতে দেওয়া হয় না। এমন নির্বাচনের নমুনা আমরা বিশ্বের উদীয়মান কিছু প্রভাবশালী দেশেও দেখিতে পাই। কোনো কোনো দেশ তো এক কাঠি সরেস। তাহাদের নেতারা আজীবন কিংবা একটি নির্দিষ্ট সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকিবার বন্দোবস্ত করিয়া ফেলিয়াছেন। সেই সকল স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলিতেও দেখা যায়, তাহাদের ক্ষমতার প্রাণভোমরা হইতেছে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার বিভাগ। তাহারা যদি নিরপেক্ষ না হন, সামান্য চক্ষুলজ্জা না থাকে, তাহা হইলে কোনো বাপের বেটার পক্ষে সম্ভব নহে নির্বাচনে জয়লাভ করা। ইহা এখন সকলেই বুঝিয়া গিয়াছেন। এই কারণে এই সকল দেশে রাজনৈতিক কর্মীরা আজ ভাতে মরিতেছে। পক্ষান্তরে কদর বাড়িতেছে সরকারি লোক ও মাস্তানদের। ভোটার ও কর্মীদের আজ তেমন দরকার নাই। একটি জাতীয় ও স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে কত টাকা ব্যয় করা যাইবে তাহার একটি সীমারেখা রহিয়াছে; কিন্তু কে শোনে কাহার কথা? লক্ষ্যের জায়গায় কোটি কোটি অর্থ ব্যয় করা হইলেও সেই সকল দেশের নির্বাচন কমিশন উদাসীন। ইহা যদি কার্যকরই না হইবে, তাহা হইলে এমন অদ্ভুত নিয়ম করা হয় কেন? এই জন্য এই সকল দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বাতকে বাত বলা হয়, আসলে তাহা আকাশকুসুম কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নহে। ইহা ঘুণাক্ষরে বিশ্বাসযোগ্য না হইলেও নির্বাচনের পর ঠিকই বেহায়ার মতো পালন করা হয় বিজয় উৎসব।
উপর্যুক্ত কারণে তৃতীয় বিশ্বের কত লোক যে রাগে-দুঃখে, ক্ষোভ ও হতাশায় দেশ ছাড়া হয় তাহার ইয়ত্তা নাই। গভীর সমুদ্রে বোটে করিয়া জীবনের ঝুঁকি লইয়া তাহারা যেইভাবে দেশ ছাড়িতেছে তাহা অচিন্তনীয়। এই জন্য গ্রেট ব্রিটেনে এখন আইন করা হইয়াছে যাহাতে কেহ এইভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় তাহাদের দেশে আসিয়া আশ্রয়প্রার্থনা করিতে না পারে; কিন্তু কোন পরিস্থিতিতে এই সকল তরুণ-তরুণী, নারী-পুরুষ ও শিশুর দল দেশত্যাগে বাধ্য হইতেছে তাহা গভীরভাবে চিন্তার বিষয়। আরও দুঃখের বিষয়, এই সকল দেশে স্বাধীনতাবিরোধী ও সরকারি দলে অনুপ্রবেশকারীরা যখন ভেংচি কাটে এবং সরকারি দলকে ক্ষমতায় রাখিবার অতন্দ্র প্রহরীতে পরিণত হয়, তখন প্রশ্ন উঠে—তাহারা এত দুঃসাহস পায় কোথা হইতে? আমরা দিব্য চোখে দেখিতে পাইতেছি, এই সকল দেশে অনতিবিলম্বে শুরু হইবে রক্তারক্তি। এই সকল দেশের কোথাও কোথাও বিদেশিরা সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বলায় ইহাতে অনেকে পুলকিত বোধ করিতেছেন; কিন্তু গণতান্ত্রিক বিশ্বের নেতারা যাহাই বলুন না কেন, এই সকল দেশের প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার বিভাগ না চাহিলে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া আদৌ সম্ভব নহে।