এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা!

সকল আয়োজনই ‘বজ্র আঁটুনি ফসকাগেরো’ বলিয়া প্রতীয়মান হইতেছে। সম্প্রতি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কয়েকটি এলাকায় পৌর মেয়র নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইল; কিন্তু আমরা এই নির্বাচনে কী দেখিলাম? পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে আমরা জানিতে পারি, একটি নির্বাচনি এলাকায় ৯টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে পাঁচটি ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরার তার ভোটের পূর্বেই কাটিয়া ফেলিয়াছে দুর্বৃত্তরা, যাহারা কোনো ক্রমেই সত্যিকারের জনমত গ্রহণ না করিবার প্রচেষ্টা চালাইয়াছে দীর্ঘদিন ধরিয়া। এক পর্যায়ে তিনটি সচল করা গেলেও দুইটি সিসি ক্যামেরা অচলই ছিল। আমরা জানি, এই সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে নির্বাচন প্রত্যক্ষ করাই এখন সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা। সেই ব্যবস্থায় যদি এই ধরনের ত্রুটি থাকে তাহা হইলে নির্বাচনের ফলাফল গ্রহণযোগ্যতা পাইবার কোনো সুযোগ থাকে কি? শুধু ভোটকেন্দ্রের সিসি ক্যামেরা বিচ্ছিন্নকরণই নহে, স্থানীয় প্রশাসনের উপর প্রভাব বিস্তার করিয়া ভোটকেন্দ্রে অবস্থান এবং কর্তব্যরত সাংবাদিককে ঝুলাইয়া পিটাইবার মতো হুমকি প্রদান করা হইয়াছে। এই সকল ঘটনার সত্যতা খোদ নির্বাচন কমিশনারও স্বীকার করিয়াছেন। নির্বাচন কমিশনার মো. আহসান হাবিব খান বলিয়াছেন, নির্বাচনে পাঁচটি কেন্দ্রের সিসি ক্যামেরার তার কোন পক্ষের নির্দেশনায় কাটা হইয়াছে তাহা খুঁজিয়া বাহির করা হইবে। ইহা সম্পর্কে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও গোয়েন্দা  সংস্থাগুলিকে নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে বলিয়াও তিনি জানাইয়াছেন; কিন্তু এই ঘটনা হইতেছে সুতা ছাড়িয়া দিয়া ঘুড়ির পিছনে দৌড়াইবার শামিল ছাড়া আর কী? প্রশাসনের, যথাযথ কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও খুঁজিয়া দেখিবার বিষয়ে আমরা দীর্ঘকাল ধরিয়া দেখিয়া আসিতেছি। কোনোকালেও ইহাতে কোনো ফল পাওয়া গিয়াছে বলিয়া আমাদের জানা নাই। এই ঘটনায় ‘জিতিয়াছে’ ষড়যন্ত্র, ‘হারিয়াছে’ প্রকৃত জনমত!

প্রশ্ন আরো থাকিয়া যায়। এই নির্বাচনে একদল ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত ছিলেন। নির্বাচন সুষ্ঠু করিবার দায়িত্বে ছিলেন নির্বাচন কমিশনসহ জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা। নির্বাচন অনুষ্ঠানের পূর্বেই ভোটকেন্দ্র তদারকির কাজ নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের হাতে চলিয়া যায়। তাই একটি প্রশ্নই আমাদের সকলের পূর্বে জানিতে ইচ্ছা হয়, তাহারা কী করিয়াছেন? তাহাদের কর্তব্যে অবহেলা, গাফিলতি অথবা কোনো একটি পক্ষের সহিত যোগসাজশ বিষয়ে কিছু জানিতে চাওয়া হইয়াছে কি? অবশ্য তাহারা কী করিয়াছেন সেই প্রকৃত চিত্র সম্পর্কেও আমরা যে একেবারে ওয়াকিবহাল নহি তাহা নহে। প্রশাসনের মধ্যে যেই দুর্বল ছিদ্রগুলি রহিয়াছে, তাহা দিয়াই যে দুর্বৃত্তরা প্রবেশ করিয়া সমস্ত প্রক্রিয়াকে কলুষিত করিয়া থাকে, ইহাতে কোনো সন্দেহ নাই; কিন্তু সেই ছিদ্র বন্ধ করিবার কোনো প্রচেষ্টা আমরা কেন দেখিতে পাই না?

একটি নির্বাচনের পূর্বে ছবি ভাঙিয়া ফেলিবার মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক অভিযোগে একটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের লক-আপে আটকাইয়া রাখিয়া নির্বাচন অনুষ্ঠান করা প্রকারান্তরে শুধু নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করাই নহে, ইহা মধ্যযুগীয় চিরচেনা পন্থা বলিয়াই যে কোনো সচেতন মানুষই বিবেচনা করিবেন। কী আশ্চর্য! তাহাই ঘটিয়াছে একটি উপজেলা নির্বাচনে। আফ্রিকার কোনো কোনো অন্ধকারাচ্ছন্ন দেশে এখনো এই পদ্ধতিতে জনপ্রিয় দল ও নেতাকে আটকাইয়া রাখিবার চিরচেনা কৌশল আমরা দেখিতে পাই। একটি বিষয় নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই মনে রাখিতে হইবে, এই অপশক্তি বরাবরই দুধের মাছি। ইহারা সুযোগমতো ভোল পালটাইয়া আঘাত করিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করিবে না। অতীতেও ইহাদের পূর্বপুরুষরা ছদ্মবেশ ধারণ করিয়া, রং পালটাইয়া একই ভূমিকায় অবতীর্ণ হইয়াছে। যতই আধুনিক পদ্ধতিতে নির্বাচন হউক, যতই ডিজিটাইলেজেশন ও লজিস্টিক সাপোর্ট থাকুক না কেন, প্রশাসনকে স্বচ্ছ না করিতে পারিলে, এই সকল দুষ্কর্মের সহিত জড়িতদের বিচারের আওতায় না আনিলে বারবার জনগণের ইচ্ছার অপমৃত্যু হইবে। মনে রাখা ভালো, মানুষ এই ধরনের অন্যায়ের, অসংলগ্ন সিদ্ধান্তের এবং অপকৌশল ব্যবহারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ দেখিতে চায়।