ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই উৎপাদন ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্পে সম্ভাবনাময় এক প্রকল্প। মূলত ময়লা-আবর্জনা, তরকারির অবশিষ্টাংশ, খাবারের উচ্ছিষ্ট, পচা ফলমূলের মতো ময়লার ভাগাড় 'ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই'য়ের জন্য উপযুক্ত আবাস। দেশে এ ধরনের পরিবেশ খুবই সহজলভ্য বিধায় 'ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই' পোল্ট্রিশিল্পে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশের পোল্ট্রি ও ফিস শিল্পে ব্যাপক সম্ভাবনা ও চাহিদার কথা বিবেচনা করে নেদারল্যান্ডস সরকারের অর্থায়নে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং ওয়াগেনিয়েন ইউনির্ভারসিটি অ্যান্ড রিসার্চের কারিগরি সহায়তায় একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। যার মূল বিষয়বস্তু- বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই এর লার্ভা উৎপাদন এবং প্রোটিনের উৎস হিসেবে মাছ-মুরগির খাবার হিসেবে লার্ভার ব্যবহার। এ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কাজ করছে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি)।
শনিবার (২২ জুলাই) শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্ল্যাক ফ্লাই উৎপাদনের প্রকল্প বাস্তবায়ন ও প্রসারণের লক্ষ্যে এক সেমিনারের আয়োজন করা হয়।বিশ্ববিদ্যালয়ের এএসভিএম অনুষদের সেমিনার গ্যালারিতে এই প্রকল্পের চাহিদা, সম্ভাবনা ও গুরুত্বের বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড.শহীদুর রশিদ ভুঁইয়া, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপ- উপাচার্য অধ্যাপক ড.অলোক কুমার পাল এবং কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. নজরুল ইসলাম।জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পেড্রো এবং ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ও ফিড মিলের বিভিন্ন উচ্চ পদস্থ ব্যক্তিবর্গ। অনুষ্ঠানের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এএসভিএম অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. কেবিএম সাইফুল ইসলাম।
তাছাড়া প্রকল্পটির 'কি পারসন: হিসেবে রয়েছেন প্রাণী পুষ্টিবিদ অধ্যাপক ড. মো. মোফাজ্জল হোসাইন, কন্ট্রাক্ট ম্যানেজার ও পাবলিক হেলথ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড.কে বি এম সাইফুল ইসলাম এবং কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. মো. শাখাওয়াত হোসাইন।
মূলত,ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই এর লার্ভা একটি প্রোটিন সমৃদ্ধ খাদ্য, যা মাছ-মুরগির খাদ্যে ব্যবহার করা যেতে পারে। এদেশে এখনো পর্যন্ত মাছির লার্ভা উৎপাদন করে তা দিয়ে মুরগির রেশন তৈরির জন্য বাণিজ্যিক পর্যায়ে কোন ফিড মিল চালু হয়নি। জৈব বর্জ্য ব্যবহার করে মাছ ও মুরগির খাদ্য তৈরির জন্য ব্ল্যাক ফ্লাই চাষ প্রকল্পটি সামনে নিয়ে আসা যেতে পারে। এর ফলে খাদ্য নিরাপত্তা শক্তিশালী হবে, বড় ব্যবস্থাপনা সহজতর হবে, মানুষের আয় বৃদ্ধি পাবে এবং মাছ-মুরগির খাদ্যের দাম নিয়ন্থনের মধ্যে থাকবে বলে সেমিনারে উপস্থিত বিশেষজ্ঞরা অভিমত ব্যক্ত করেন।
ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই একটি পতঙ্গ হওয়ার এর ব্যাবহারে উৎপাদিত পোল্ট্রি ও মাছ চাষে ধর্মীয় ও স্বাস্থ্যগত ভাবে ঝুঁকিমুক্ত ও যথাযথ হবে কিনা এমন প্রসঙ্গে শেকৃবির এএসভিএম অনুষদের ডিন এবং অনুষ্ঠানের সভাপতি অধ্যাপক কেবিএম সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা গৃহপালিত কিংবা বন্য মোরগ মুরগি খাবার সংগ্রহের জন্য বনে-জঙ্গলে, মাঠে-ঘাটে চড়ে বেড়ায়। এসব মোরগ মুরগির প্রধান খাবারই হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড়। এরা বিভিন্ন ধরনের পচা, নোংরা এবং দুর্গন্ধযুক্ত স্থানে বেড়ে ওঠা পোকামাকড় নির্দ্বিধায় খেয়ে বেড়ে ওঠে। অথচ এদের থেকে আজ পর্যন্ত কোন ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকির কথা জানা যায়নি। বরং প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা এসব মুরগীর মাংসের স্বাদ এবং ক্ষেত্রবিশেষে পুষ্টিগুণ তুলনামূলকভাবে ভালো। পাশাপাশি অর্গানিক পোল্ট্রি হিসেবে এইভাবে পালিত মুরগি চাহিদা এবং মূল্য বেশি। অধিকন্তু, এই পোকার লার্ভার মাধ্যমে মানুষ, মুরগি ও মাছে কোন রোগ ছড়ায়না তা সারা বিশ্বে প্রমাণিত। এছাড়া উপকার বৈ কোন ক্ষতিরও রেকর্ড নেই শান্ত স্বভাবের এই পোকার। সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই উৎপাদন করতে পারলে পোল্ট্রি ও মৎস্য শিল্পকে ব্যাপক লাভজনক খাতে পরিণত করবে।
দেশীয় কাঁচাবাজারে প্রতিদিন যে বর্জ্য তৈরি হয় তার প্রায় ৭০ ভাগই খাদ্য সম্পর্কিত ও কৃষিপণ্যজাত বর্জ্য। তাছাড়া শহর এলাকায় বাসা-বাড়ি ও হোটেল থেকেও জৈব বর্জ্য তৈরি হয়। এ সকল বর্জ্যের একটি অংশ রাস্তার উপর বা রাস্তার পাশে অননুমোদিতভাবে গড়ে উঠা ডাস্টবিনে পড়ে থাকে। শুধু ঢাকা শহরেই প্রায় প্রতিদিন ৬-৭ হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে। আবার বিভিন্ন তথ্য মতে তা প্রায় ১১ হাজার টন পর্যন্ত হয়ে থাকে। এ সকল বর্জ্যে প্রায় ৭০ ভাগের অধিকই হচ্ছে জৈব বর্জ্য। ধারণা করা হয় ঢাকার এ সকল বর্জ্যের প্রায় অর্ধেকই ফেলা হচ্ছে ল্যান্ডফিলে আর অর্ধেক থাকছে ব্যবস্থাপনার বাইরে। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর সিটিতে কোন ল্যান্ডফিল না থাকায় এ সকল বর্জ্য যাচ্ছে সড়কের দুপাশে, নদী ও খালে।এগুলো মূলত ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই এর খাদ্য হিসেবে ব্যাবহার করা যাবে বলে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক শহীদুর রশিদ ভুঁইয়া বলেন, 'ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই উৎপাদন প্রকল্প বাংলাদেশের পোল্ট্রি ও ফিস শিল্পে ব্যাপক সম্ভাবনাময়। এধরণের প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় যুক্ত রয়েছে যা আনন্দময়। মূলত দেশের মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদা পূরণে গবেষণা ও বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় কাজ করছে, এ ধারা অব্যাহত থাকবে।'