ইহা বিশ্বের জন্য একটি খারাপ বার্তা

কয়েক শত বছর পূর্বে যখন বিশ্বে যোগাযোগব্যবস্থা ও বাণিজ্যের লেনদেন এই সময়ের মতো এত ব্যাপক পসার লাভ করে নাই, তখন যে কোনো জনপদ মনে করিতে পারিত, অন্য কোনো জনপদের সহিত লেনদেন না করিয়াও তাহারা নিজেদের মতো করিয়া টিকিয়া থাকিতে পারিবে। নিঃসঙ্গ দ্বীপের মতো ‘যেমন আছি তেমনই রব’—পরিস্থিতি তাহাদের নিকট খুব ব্যতিক্রম বা অসহায়ত্বপূর্ণ ছিল না; কিন্তু বাণিজ্য যেইভাবে বিস্তার ঘটাইয়াছে, তাহার পাশাপাশি উন্নতি হইয়াছে যোগাযোগব্যবস্থার, ইহার ফলে এক একটি জনপদ ‘বিনিসুতার মালা’র মতো অন্য জনপদের সহিত লেনদেননির্ভর হইয়া পড়িয়াছে। অবস্থাটা হইতে থাকে কামিনী রায়ের কবিতার মতো—‘সকলের তরে সকলে আমরা/ প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।’ অর্থাৎ প্রয়োজনের স্বার্থে সমগ্র বিশ্বকে ‘সকলের তরে’ হইতেই হয়। বিশ্ব ক্রমশ হইয়া উঠে ‘বিশ্বগ্রাম’; কিন্তু যুদ্ধ-হাঙ্গামা, অশান্তির বাতাবরণ সকল হিসাব উলটাইয়া দেয়। ইহার দৃষ্টান্ত অতীতে অনেক বার দেখা গিয়াছে। গত বছর রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর কৃষ্ণসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ হইয়া গিয়াছিল। ফলে বিশ্বের অন্যতম বৃহত গম রপ্তানিকারী দেশ ইউক্রেনের শস্যগুদামগুলিতে আটকা পড়িয়াছিল লক্ষ লক্ষ টন গম, ভুট্টা ও সূর্যমুখীর বীজ। ইউক্রেন হইতে নিরাপদে শস্য রপ্তানি চালু রাখিতে গত বছরের জুলাইতে আগাইয়া আসিয়াছিল জাতিসংঘ ও তুরস্ক। তাহাদের মধ্যস্থতায় রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে শস্যচুক্তি হয়। তিন দফা বৃদ্ধির পর সম্প্রতি গত ১৭ জুলাই শেষ হয় চুক্তির মেয়াদ। গত এক বছরে শস্যচুক্তির অধীনে ৩ কোটি ২০ লক্ষ মেট্রিক টন ভুট্টা, গম ও অন্যান্য শস্য ইউক্রেন রপ্তানি করিয়াছে; কিন্তু শেষ জাহাজটি রবিবার ইউক্রেন ছাড়িয়াছে। এখন নূতন করিয়া চুক্তির নবায়ন না করিবার ফলে বিশ্ববাজারে বাড়িয়া যাইতেছে গমের মূল্য।

সমগ্র বিশ্ব আশঙ্কা করিতেছে শস্যচুক্তি হইতে রাশিয়া সরিয়া যাইবার ফলে খাদ্যসংকট আরও তীব্র হইবে। হোয়াইট হাউজের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের মুখপাত্র অ্যাডাম হজ এক বিবৃতিতে বলিয়াছেন, ‘আমরা রাশিয়া সরকারকে অবিলম্বে তাহার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করিবার জন্য অনুরোধ করিতেছি।’ এই ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করিয়াছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও। শস্যচুক্তি বাতিলের বিষয়ে জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলত্স বলিয়াছেন, ‘শস্যচুক্তির মেয়াদ না বাড়াইবার রুশ সিদ্ধান্ত বিশ্বের জন্য একটি খারাপ বার্তা।’ বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, ইউরোপীয় স্টক এক্সচেঞ্জে বুধবার গমের মূল্য পূর্বের দিনের তুলনায় ৮ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি পাইয়াছে। যুক্তরাষ্ট্রেও গমের মূল্য এক লাফে বাড়িয়াছে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। এই দিকে বাংলাদেশেরও পাইকারি বাজারে গমের মূল্যে অস্থিরতার কথা জানা গিয়াছে। উল্লেখ্য যে, শস্যচুক্তির পর বাংলাদেশের মতো ৩০টি দেশ ইউক্রেন হইতে গম আমদানি করিত। আমদানিতে স্পেন ও তুরস্কের পরই ছিল বাংলাদেশের অবস্থান। ২০২২-২৩ অর্থবত্সরে বাংলাদেশে ইউক্রেন হইতে ১৩ লাখ, কানাডা হইতে ১২ দশমিক ৮, রাশিয়া হইতে ১২ দশমিক ৫৫ এবং ভারত হইতে ৫ দশমিক ৬২ লাখ টন গম আমদানি করিয়াছে; কিন্তু গত বছরের মার্চেই ভারত গম রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ শুরু করে। ইহার পরও নভেম্বর মাস পর্যন্ত ভারত হইতে গম আমদানি হইয়াছিল।

ভারত হইতে গম আমদানি বন্ধ হইয়া যাইবার পূর্বেই গত বছরের জুলাই মাসে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় রাশিয়া ও ইউক্রেনের সহিত শস্যচুক্তি হয়। ফলে গমের সরবরাহ লইয়া বাংলাদেশের শঙ্কা দূর হইয়াছে তখন; কিন্তু এখন ভারতের পাশাপাশি আরেক অন্যতম উৎস ইউক্রেন হইতে গম আমদানি বন্ধ হইয়া যাওয়ার ফলে বাংলাদেশের দুশ্চিন্তা বাড়িল। সমস্যাটি যদিও বাংলাদেশের একার নহে, বৈশ্বিক। ইহার সমাধানও বিশ্বনেতাদের করিতে হইবে। খাদ্যশস্যকে জিম্মি করিয়া যুদ্ধ করিবার মতো হীন কৌশল এই আধুনিক সভ্যজগতের জন্য শোভা পায় না। এই বিশ্ব কি সভ্যতার বিপরীত পথে হাঁটিতেছে? এই ধরনের সমস্যার তাৎপর্যপূর্ণ সমাধান প্রয়োজন। ইহার পাশাপাশি গমের ব্যবহার যথাসম্ভব কমাইয়া ব্যয় সংকোচন নীতির প্রতিও আমাদের গুরুত্বারোপ করিতে হইবে।