বর্ষায় হাওড় জলে

বাংলাদেশ ষড়ঋতুর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি। একেকটি ঋতুতে এদেশের প্রকৃতি সাজে ভিন্নরূপে যা ভ্রমণ পিপাসুদের অতৃপ্ত মনকে তৃপ্তি দিয়ে থাকে। সব ঋতুতেই প্রকৃতির বহুরূপী সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। তবুও নির্দিষ্ট ঋতুতে কিছু স্থান যেন তার যৌবন ফিরে পায়। অর্থাত্ সেই নির্দিষ্ট সময়ে আপনি সেই স্থানের রূপ-সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন অন্য সময়ের চেয়ে একটু বেশিই। 

বর্ষাকাল বলতেই আমরা ধরে নিই কাদা, পানি, স্যাঁতসেঁতে অবস্থা। এর মধ্যে আবার বেড়ানো যায়? বড়জোর ছাদে গিয়ে বৃষ্টিতে ভেজা—এ পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু দূরে কোথাও ভ্রমণের কথা কখনোই আমাদের মাথায় আসে না। অথচ আপনি জানেন কি, বাংলাদেশে এমন কিছু জায়গা রয়েছে যেখানে প্রকৃতি তার রূপ খোলে বর্ষাতেই? গ্রীষ্ম বা শীতে শুকিয়ে কাঠ, কিন্তু বর্ষা এলেই প্রাণ ফিরে পায় জায়গাগুলো। গত সপ্তাহে পরিকল্পনা করেছিলাম যাব নতুন কোনো গন্তব্যে। কিন্তু বিধি বাম; বের হতে পারিনি তাই ত্রিচক্র যানের কান্ডারিকে আগে থেকেই বলে রেখেছিলাম।

বর্ষা

অবশেষে প্রত্যাশিত সেই দিন এলো। সকাল হতেই হাতের কাজ শেষ করার তাগাদা দেওয়া শুরু করলাম ভ্রমণ সঙ্গীদের। সময় বেঁধে দিলাম দুপুর একটার মধ্যে তৈরি হয়ে নিতে হবে। আমাদের এবারের গন্তব্য সিলেট শহর থেকে খানিক দূরে বাইশ টিলা নামক স্থানে। যেহেতু আগে যাওয়া হয় নাই ভ্রমণ গন্তব্যে তাই একটু আগেই বের হওয়া। নির্ধারিত সময়ের কিছু পরেই বের হতে হলো আমাদের কুটির থেকে। জিন্দাবাজার, চৌহাট্টা পার হয়ে  চলছি আমরা। ওহ, বলাই হলো না—আমাদের আজকের ভ্রমণসঙ্গী হিসেবে আছে অর্পিতা, সুকান্ত আর সর্বকনিষ্ঠ ভ্রমণসঙ্গী সপ্তক। আকাশের মন এই ভালো তো একটু পরেই খারাপ। কখনো ঝরছে অঝোর ধারায়,  করছে কান্নাকাটি। এর মাঝেই চলছি এগিয়ে। আম্বরখানা পার হয়ে যেই লাক্কাতুরা চা বাগানের দিকে পা রাখলাম, নতুন চা পাতার অসাধারণ রূপ চোখে পড়ল। বর্ষায় চা গাছগুলো নতুন যৌবন পেয়েছে দেখে মনে হলো। আমরা সবুজের সমারোহের ভেতর দিয়ে চলছি গন্তব্য পানে। এবার কোন দিকে যাওয়া— জানতে চাইলেন আমাদের ত্রিচক্র যানের কান্ডারি সত্য দা। আমি বললাম, আরো কিছু দূর গিয়ে কারো কাছে জেনে নিলেই হবে।

একজন প্রবীণ ব্যক্তির কাছে জানতে চাওয়া হলো বাইশ টিলার পথটি কোন দিকে। তিনি  বললেন, সোজা পথ ধরে যেতে হবে আরো পনেরো মিনিট। তাহলেই পাবেন আপনাদের সেই গন্তব্য। আমি ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম আসলেই কি পনেরো মিনিটের মধ্যে আমরা পৌঁছাতে পারব গন্তব্যে? এ বিষয়ে আমার আবার অভিজ্ঞতা খারাপ। এর আগে রেমা কালেঙ্গা বনে ঘুরতে যাওয়ার সময় পথে জানতে চেয়েছিলাম গন্তব্য পৌঁছাতে কতক্ষণ লাগবে। তখন বলা হয়েছিল আধা ঘণ্টা লাগবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গন্তব্য পথের প্রবেশদ্বারে পৌঁছাতেই এক ঘণ্টা লেগে গিয়েছিল। যাই হোক ঘড়ির কাঁটা চলছে এগিয়ে। ঘড়ির কাঁটায় এখনো দুই মিনিট বাকি। দেখা পেলাম একটি দোকানের সাইনবোর্ডে লেখা বাইশ টিলা, সিলেট। বুঝতে আর বাকি রইল না— আমরা  উপস্থিত হয়েছি বাইশ টিলায়। এদিকে বৃষ্টিও কমে এসেছে। 

বাতাস বইছে, বর্ষার জন্য ধান ক্ষেতও নবীনা জলে টইটম্বুর। দেখতে পেলাম নৌকার মাঝিরা অপেক্ষায় আছে যাত্রীর জন্য। আমরা ত্রিচক্র যান  থেকে নেমে পড়লাম। পদব্রজে ঘুরে দেখতে লাগলাম চারপাশ। আমাদের মাঝে উপস্থিত আমাদের সবচেয়ে ছোট্ট ভ্রমণসঙ্গী তো খুবই খুশি। দেখতে পেলাম সদ্য মাছ ধরে আনা হয়েছে হাওর থেকে। মাছগুলো নিজেদের মধ্যে দাপাদাপি করছে। মাছগুলো ঘিরে ধরেছে মানুষজন। এরমধ্যে দরদাম করাও শুরু হয়ে গেছে। বিক্রেতার তুলনায় ক্রেতার সংখ্যাই বেশি। আমি মনে মনে ভাবলাম, এখন চাইলেও মাছ কেনা যাবে না; এত ক্রেতা দেখে বিক্রেতা দাম নিশ্চয়ই ছাড়তে চাইবে না। তার চেয়ে আমরা নৌ-ভ্রমণ করে আসি, এরমধ্যে নিশ্চয়ই আরো বিক্রেতা উপস্থিত হবেন তাদের কাছ থেকে মাছ কেনা যাবে।

বর্ষা

এবার ঠিক করলাম নৌকা। আমাদের নৌকা দুলে দুলে চলছে এগিয়ে। সূর্যদেবের প্রখরতা নেই বললেই চলে, আর সাথে মৃদুমন্দ বাতাস ভালোই লাগছিল। আমাদের মতো অনেকেই নৌকা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। দেখা পেলাম জেলে মাছ ধরছেন। হঠাত্ মাথার ওপর দিয়ে উড়োজাহাজ উড়ে গেল। কাছেই এয়ারপোর্ট, তাই উড়োজাহাজের নিত্য যাওয়া আসা। প্রায় আধা ঘণ্টা হাওরের জলে ভেসে বেড়ালাম আমরা। ঘড়ির কাঁটা চলছে ছুটে,  এবার ঘাটে ফেরা প্রয়োজন! নৌকা থেকে নেমে দেখলাম বেশ কয়েকজন মাছ বিক্রেতা উপস্থিত সদ্য ধরে আনা মাছ বিক্রির জন্য। শুরু করে দিলাম দরদাম। এক খাঁচার মাছ বেশ পছন্দ হলো; এতে বিভিন্ন ধরনের মাছ আছে। ছোট মাছ থেকে শুরু করে বোয়াল, সরপুঁটি, চাপিলা— সবগুলোর নাম জানিও না। মনের ভেতর আবার শঙ্কাও ছিল খারাপ মাছ নিলে মায়ের বকুনি খেতে হবে। 

আমার মায়ের ধারণা আমরা বাজার করতে পারি না। যদিও করি তা বেশি দাম দিয়ে বুঝি কিনি, তাই তিনি আমাদের বাজারই করতে দেন না। যাই হোক ঐ খাঁচার মাছের দাম বিক্রেতা চাইলেন ১২০০ টাকা। ছোটবেলায় বাবা বাজারে নিয়ে গেলে বলতেন, মাছের বাজারে দাম করতে হলে বিক্রেতা যে দাম বলবে তার অর্ধেক দাম বলে দামাদামি শুরু করতে হবে তাহলেই লাভবান হওয়া যায়। আমি সেই বুদ্ধি কাজে লাগানোর চেষ্টা করলাম। আমি বললাম ৬০০ টাকা। বিক্রেতা রাজি হলেন না।  পরে আরো ১০০ টাকা দাম বাড়াতেই রাজি হয়ে গেলেন মাছ বিক্রির জন্য। আমাদের ত্রিচক্র যানের সত্য দা’র কাছে জানতে চাইলাম মাছগুলোর দাম ৭০০ টাকা নিয়েছে বেশি নেয়নি তো? সত্য দা বললেন, না না, বেশি কেন হবে? এই মাছ শহর থেকে কিনতে গেলে দুই হাজার টাকার কম নেবে না। আর এত টাটকা মাছও পাবেন না। যাই হোক মনে মনে খুশিই হলাম।

যেভাবে যাবেন 
ঢাকার সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল, রাজারবাগ ও মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে গ্রিনলাইন, শ্যামলী, এনা, হানিফ বা বিআরটিসি বাসে অথবা ট্রেনে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে সকালে আন্তঃনগর পারাবাত, দুপুরে জয়ন্তিকা ও কালনী এবং রাতে উপবন সিলেটের পথে ছুটে। ভাড়া ৩২০ থেকে ১২০০ টাকার মধ্যে। সিলেট শহরের বন্দর বাজার থেকে সিএনজি নিয়ে চলে যান সিলেট এয়ারপোর্টের পেছনে বাইশ টিলায়। রিজার্ভ যাওয়া আসা পড়বে ৫০০ টাকা। আর নৌকা ভ্রমণ করতে পারবেন প্রতি ঘণ্টা ২০০ টাকায়।