চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। গতকাল শুক্রবার প্রকাশিত এই ফলাফলে পাশ করেছে ৮০ দশমিক ৩৯ শতাংশ শিক্ষার্থী। গত বছর এ হার ছিল ৮৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ। সে তুলনায় এ বছর পাশের হার কমেছে ৭ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ।
এছাড়া এবার জিপিএ ৫ পেয়েছে ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫৭৮ জন। গত বছর পেয়েছিল ২ লাখ ৬৯ হাজার ৬০২ জন। সে হিসাবে জিপিএ-৫ কমেছে ৮৬ হাজার ২৪। এসব বিবেচনায় এবারের ফলকে খারাপ ফল হিসেবে দেখছেন অভিভাবকরা।
গতকাল বেলা ১১টায় রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে সংবাদ সম্মেলন করে ফলাফলের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি। এবছর দেশের ১১ শিক্ষাবোর্ডে এসএসসি ও সমমানে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ২০ লাখ ৪১ হাজার ৪৫০ জন। এর মধ্যে ছাত্র ১০ লাখ ২৪ হাজার ৯৮০ জন। ছাত্রী ১০ লাখ ৫৩ হাজার ২৪০ জন। এদের মধ্যে পাশ করেছে ১৬ লাখ ৪১ হাজার ১৪০ জন।
শিক্ষাবোর্ড কর্মকর্তারা বলেছেন, পাশের হার স্বাভাবিক। গতবার শিক্ষার্থীদের বাড়তি বেশ কিছু সুবিধা ছিল। সংক্ষিপ্ত সিলেবাস ও কম বিষয়ে পরীক্ষা হয়েছিল। যেটা এ বছর ছিল না। এ কারণে গতবারের বিবেচনায় পাশের হার ও জিপিএ-৫ কমেছে। শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, এখনকার যে পাশের হার, সেটা করোনার পূর্ববর্তী সময়ে আমাদের যে পাশের হার ছিল, তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর তপন কুমার সরকার সাংবাদিকদের বলেন, করোনার পর এবারই পূর্ণ সিলেবাসে পরীক্ষা হয়েছে। এজন্য পাশের হার স্বাভাবিক সময়ের মতো হয়েছে। গত দুই বছর সংক্ষিপ্ত সিলেবাসসহ নানা ধরনের ছাড় দেওয়া হয়েছিল। এবার সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালে মাত্র তিন বিষয়ে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল। আর বাকি বিষয়গুলোতে সাবজেক্ট ম্যাপিংয়ে জেএসসি থেকে নম্বর দেওয়া হয়েছিল। ঐ বছর পাশের হার ছিল ৯৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ। যা অতীতের যে কোনো সময়ের বিবেচনায় রেকর্ড ফল।
২০২২ সালে এসে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল ৯ বিষয়ে। বিষয় বেড়ে যাওয়ায় তাই পাশের হার স্বাভাবিকভাবে কমেছিল। আর বাকি বিষয়গুলোতে সাবজেক্ট ম্যাপিং করা হয়েছিল নবম শ্রেণির বিষয়ের ওপর। রেকর্ডসংখ্যক ২ লাখ ৬৯ হাজার ৬০২ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিল।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৮ সালে গড় পাশের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ। ২০১৯ সালে ৮২ দশমিক ২০ শতাংশ। ২০২০ সালে ৮২ দশমিক ৮৭ শতাংশ। ২০২১ সালে ৯৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ, ২০২২ সালে ৮৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ। আর এবার ৮০ দশমিক ৩৯ শতাংশ। চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয়ে ২৮ মে শেষ হয়।
কোন বোর্ডে পাশের হার কত : ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে পাশের হার ৭৭ দশমিক ৫৫ শতাংশ, চট্টগ্রাম বোর্ডে ৭৮ দশমিক ২৯ শতাংশ, বরিশাল বোর্ডে ৯০ দশমিক ১৮ শতাংশ, যশোর বোর্ডে ৮৬ দশমিক ১৭ শতাংশ, ময়মনসিংহ বোর্ডে ৮৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ, রাজশাহী বোর্ডে ৮৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ, কুমিল্লা বোর্ডে ৭৮ দশমিক ৪২ শতাংশ, দিনাজপুর বোর্ডে ৭৬ দশমিক ৮৭ শতাংশ, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে পাশের হার ৮৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ ও মাদ্রাসা বোর্ডে ৭৪ দশমিক ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী পাশ করেছে।
পাশের হারে সেরা বরিশাল :এ বছরের এসএসসি পরীক্ষায় পাশের হারে শীর্ষে রয়েছে বরিশাল শিক্ষাবোর্ডের শিক্ষার্থীরা। এ বোর্ডে এবার ৯০ দশমিক ১৮ শতাংশ শিক্ষার্থী পাশ করেছে। আর সবচেয়ে কম পাশ করেছে সিলেট বোর্ডে, ৭৬ দশমিক ০৬ শতাংশ। এর আগে ২০২২ সালে যশোর বোর্ডে সবচেয়ে বেশি ৯৫ দশমিক ১৭ শতাংশ শিক্ষার্থী পাশ করেছিল। আর সবচেয়ে কম পাশের হার ছিল সিলেট বোর্ডে, ৭৮ দশমিক ৮২ শতাংশ। প্রতিবারের মতো এবারও জিপিএ-৫ এ সবার ওপরে রয়েছে ঢাকা বোর্ডের শিক্ষার্থীরা, এ শিক্ষা বোর্ডের ৪৬ হাজার ৩০৩ জন শিক্ষার্থী পূর্ণ জিপিএ পেয়েছে। সবচেয়ে কম জিপিএ-৫ পেয়েছে সিলেট বোর্ডে। এই বোর্ডের ৫ হাজার ৪৫২ জন শিক্ষার্থী এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে।
এবারও মেয়েরা এগিয়ে :পাশের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যার দিক দিয়ে এবছরও ছাত্রীরা এগিয়ে রয়েছে। চলতি বছর ৮১ দশমিক ৮৮ শতাংশ ছাত্রী মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষায় পাশ করেছে, যেখানে ছাত্রদের পাশের হার ৭৮ দশমিক ৮৭ শতাংশ। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রীরা এগিয়ে রয়েছে। জিপিএ-৫ পাওয়া ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫৭৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৮৪ হাজার ৯৬৪ জন ছাত্র; আর ৯৮ হাজার ৬১৪ জন ছাত্রী। সে হিসেবে জিপিএ-৫ বেশি পেয়েছে ১৩ হাজার ৬৫০ জন ছাত্রী ।
গত ছয় বছর ধরেই মাধ্যমিকে পাশের হারের দিক থেকে ছাত্রীরা এগিয়ে রয়েছে। ২০২২ সালে ৮৭ দশমিক ৭১ শতাংশ ছাত্রী মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষায় পাশ করে, যেখানে ছাত্রদের পাশের হার ছিল ৮৭ দশমিক ১৬ শতাংশ। গতবার জিপিএ-৫ পাওয়া ২ লাখ ৬৯ হাজার ৬০২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১ হাজার ২১ জন ১৫৬ জন ছিল ছাত্র; আর ১ লাখ ৪৮ হাজার ৪৪৬ জন ছিল ছাত্রী।
৪৮ প্রতিষ্ঠানের শতভাগ ফেল: মাধ্যমিক পরীক্ষায় এ বছর ৪৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাশ করতে পারেনি। এছাড়া সবাই পাশ করেছে এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২ হাজার ৩৫৪টি। গত বছর কোনো শিক্ষার্থী পাশ করেনি এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৫০টি। আর ২ হাজার ৯৭৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শতভাগ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছিল।