বাংলাদেশের মতো দ্রুত বিকাশমান অর্থনৈতিক উন্নয়নকে টেকসই ও স্থিতিশীল করার ক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশের প্রাথমিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আগামী ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশ চূড়ান্তভাবে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উত্তীর্ণ হবে। উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে এত দিন যেসব বিশেষ সুবিধা পেয়ে আসছিল, তা হারাবে। সেই অবস্থায় বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে। ফলে নিজেদের টিকিয়ে রাখার জন্য আমাদের এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। আর এই প্রস্তুতির একটি অংশ হতে পারে উদ্যোক্তা উন্নয়ন। সঠিক ও কার্যকর উদ্যোক্তা শ্রেণি গড়ে তুলতে না পারলে আমরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারি। তাই আমাদের এখন থেকেই উদ্যোক্তা উন্নয়নের জন্য সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রশ্ন হলো, উদ্যোক্তা বলতে আমরা কাদের বুঝি? চেষ্টা করলেই কি সবাই সফল উদ্যোক্তা হতে পারেন? উদ্যোক্তা বলতে সাধারণভাবে আমরা এমন একজনকে বুঝি, যিনি উদ্ভাবনী শক্তি ব্যবহার করে নতুন কিছু সৃষ্টি করেন। একজন সফল উদ্যোক্তা যে কোনো পরিস্থিতিতে ঝুঁকি নিতে পারেন। ঝুঁকি বহনের সক্ষমতা যার মাঝে বিদ্যমান আছে। যিনি পুরোনোর মাঝে নতুনত্ব খুঁজে বের করার জন্য নিরন্তর সচেষ্ট থাকেন। ভালো কর্মী অনেকেই হতে পারেন, কিন্তু চাইলেই যে কেউ সফল উদ্যোক্তা হতে পারেন না। যাদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার মতো গুণাবলি বিদ্যমান, তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য ঝুঁকি গ্রহণের মানসিকতা ও সামর্থ্য থাকা একান্ত প্রয়োজন। একজন সত্যিকার উদ্যোক্তার আধুনিক প্রযুক্তিজ্ঞান থাকা একান্ত আবশ্যক। এছাড়া বিপণনব্যবস্থা সম্পর্কেও তার প্রাথমিক ধারণা থাকা দরকার। বিশ্বে সম্ভবত একটি দেশও খুঁজে পাওয়া যাবে না, যারা উদ্যোক্তা উন্নয়নের ইস্যুটিকে উপেক্ষা করে টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে সমর্থ হয়েছে। উদ্যোক্তা এমনিতেই সৃষ্টি হয় না। এর জন্য যথাযথ প্রশিক্ষণের দরকার রয়েছে। কানাডার মতো দেশে মোট জনসংখ্যা হচ্ছে ৩ কোটির কিছু বেশি। আর আমাদের দেশে প্রাথমিক স্তর থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা হচ্ছে ৪ কোটি। বাংলাদেশ বিশ্বের জনসংখ্যাবহুল একটি দেশ। আমরা যদি জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করতে চাই, তাহলে জনগণকে ব্যাপকভিত্তিক প্রশিক্ষণের আওতায় এনে তাদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি দিয়ে বেকার সমস্যা দূর করা যাবে না। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল দেশে উদ্যোক্তা উন্নয়ন ছাড়া কোনোভাবেই বেকার সমস্যা দূর করা যাবে না। ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিকস উদ্যোক্তা উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন কোর্স পরিচালনা করছে। আমাদের এখানে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে অনেকেই উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। অনেকেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় সফলতার সঙ্গে কাজ করছেন। অনেকেই উদ্যোক্তা হিসেবে আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেছেন। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোক্তা উন্নয়নের জন্য আমাদের দেশে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান কাজ করে চলেছে। কিন্তু সবার কাজের মান একই পর্যায়ের নয়।
উদ্যোক্তা উন্নয়নের জন্য অর্থের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু এ কাজে নিয়োজিত বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই অর্থসংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের যথাযথ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিতে পারছে না। সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠা এ ক্ষেত্রে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিলে উদ্যোক্তা উন্নয়নের বিষয়টি ত্বরান্বিত হতে পারে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চাইছেন, দেশের যুবসমাজ যেন বেকার না থাকে। সেই লক্ষ্যে জাতীয়ভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিকসের সিলেবাস পর্যালোচনা করলে দেখবেন, প্রতিটি সিলেবাসই অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও কার্যকর। আমাদের এই প্রতিষ্ঠান থেকে যারা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন, তারা কর্মজীবনে কখনোই বেকার থাকেন না। অর্থাৎ, আমাদের কোর্সগুলো এমনভাবে সাজানো, যা সম্পন্ন করলে একজন শিক্ষার্থী কর্মসংস্থানের পথ খুঁজে পান। আমরা শিক্ষার্থীদের নতুন নতুন বিষয় শেখানোর চেষ্টা করি। উদ্যোক্তা উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে বেশি জরুরি হচ্ছে একজন উদ্যোক্তাকে বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করিয়ে দেওয়া। স্থানীয়ভাবে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের বাইরের দেশে উচ্চতর প্রশিক্ষণে পাঠানো যেতে পারে। এটা করা হলে তারা আধুনিক উৎপাদন কৌশলের সঙ্গে পরিচিত হতে পারবেন।
বাংলাদেশ বর্তমানে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার মধ্য দিয়ে সময় পার করছে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড হচ্ছে অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি বিশেষ পর্যায়। একটি দেশের মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ বা তারও বেশি যখন ১৫ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে, অর্থাৎ কর্মক্ষম থাকে, সেই অবস্থাকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বলা হয়। একটি জাতির জীবনে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থা একবারই আসে। কারো মতে, হাজার বছরে একবার এই অবস্থার সৃষ্টি হয়। যেসব দেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার সুফল কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছে, তারাই অর্থনৈতিক উন্নয়নের শিখরে উপনীত হতে পেরেছে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার সুফল পেতে হলে জনশক্তিকে জনসম্পদে পরিণত করতে হবে। বাংলাদেশ জনসংখ্যাধিক্য একটি দেশ। জনসংখ্যা এমনই এক উৎপাদন উপকরণ, যা প্রশিক্ষিত ও দক্ষ করে গড়ে তোলা গেলে একটি জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদে পরিণত হতে পারে। আবার জনসংখ্যা যদি অদক্ষ এবং অপ্রশিক্ষিত থাকে, তাহলে তা একটি জাতির জন্য ‘দায়’ হিসেবে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশ যদি ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার সুফল পূর্ণ মাত্রায় কাজে লাগাতে চায়, তাহলে কর্মক্ষম প্রতিটি মানুষকে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। অতীতে একসময় অপরিকল্পিত জনসংখ্যাকে দেশের ‘এক নম্বর জাতীয় সমস্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। জনসংখ্যা যদি প্রশিক্ষিত এবং দক্ষ হয়, তাহলে তারা অভ্যন্তরীণভাবে অথবা দেশের বাইরে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে। অতীতে আমাদের দেশে উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং জনসংখ্যাকে প্রশিক্ষিত করার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা লক্ষ করা গেছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকেই নানাভাবে জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। উদ্যোক্তা দুই রকম হতে পারে। অনেকেই আছেন, যারা শুরুতেই বড় ধরনের উদ্যোগ গড়ে তোলেন। আবার কেউ কেউ ক্ষুদ্র পর্যায়ে উদ্যোগ গ্রহণ করে পর্যায়ক্রমে তা বৃহত্ পরিসরে নিয়ে যান। আমাদের দেশে ক্ষুদ্র উদ্যোগ বিকাশের জন্য পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তা প্রদানের জন্য এসএমই (স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ) ফাউন্ডেশন গড়ে তোলা হয়েছে। আগে কটেজ অ্যান্ড মাইক্রো এন্টারপ্রাইজকে এসএমই সেক্টরের মধ্যে গণ্য করা হতো না। ফলে কটেজ ও মাইক্রো ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যারা যুক্ত, তারা প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়ন সুবিধা পেতেন না। কয়েক বছর আগে কটেজ অ্যান্ড মাইক্রো শিল্পকে অন্তর্ভুক্ত করে এসএমই খাতের নতুন নামকরণ করা হয়েছে সিএমএসএমই (কটেজ, মাইক্রো, স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ)। ফলে কটেজ ও মাইক্রোশিল্পগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ও অর্থায়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে আইনি প্রতিবন্ধকতা দূর হয়েছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো উদারভাবে সিএমএসএমই খাতে অর্থায়নে এগিয়ে আসতে হবে।
আগেই বলা হয়েছে, কর্মী অনেকেই হতে পারেন, কিন্তু ভালো উদ্যোক্তা সবাই হতে পারেন না। দক্ষ ও সফল উদ্যোক্তা হতে হলে অবশ্যই তাকে উদ্যোক্তা হওয়ার মতো দৃঢ় মনোভাবের অধিকারী হতে হবে। বিশ্বব্যবস্থা সম্পর্কে তার মোটামুটি ধারণা থাকতে হবে। কঠোর পরিশ্রমী হতে হবে। তার ঝুঁকি গ্রহণের মতো মনোবল থাকতে হবে। একজন উদ্যোক্তা দূরদৃষ্টি থাকতে হবে। যে কোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার মতো সক্ষমতা থাকতে হবে। একজন প্রকৃত উদ্যোক্তার মাঝে উদ্ভাবনী শক্তি ও সৃজনশীল মনোভাব থাকতে হবে। কোনো সময় লোকসানের মুখোমুখি হলে বা ব্যর্থ হওয়ার মতো পরিস্থিতি দেখে ঘাবড়ে গেলে চলবে না। বর্তমান সরকার উদ্যোক্তা উন্নয়নের জন্য যেসব আইনি সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে, তাকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কী করণীয়, সে সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখেন। তিনি যে নির্দেশনা দিচ্ছেন, তা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন আরো দ্রুততর হতো। কিন্তু তৃণমূল পর্যায়ে যারা নির্দেশনা বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত, তাদের আরো আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সরকার সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পেরেছে বলেই বিশ্বব্যাপী নানা সংকটের মধ্যেও আমাদের দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা অব্যাহত রয়েছে।
উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হবে। কারণ সেই সময় শুল্কমুক্ত পণ্য রপ্তানিসুবিধাসহ অনেক ধরনের সুবিধা হারাতে হবে। সেই অবস্থায় আমাদের আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে উদ্যোক্তা উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মী গড়ে তোলা এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নের মাধ্যমে আমাদের শিল্পভিত্তিকে মজবুত করে গড়ে তুলতে হবে। আমাদের আমদানি বিকল্প স্থানীয় কাঁচামালনির্ভর শিল্প গড়ে তোলার প্রতি জোর দিতে হবে।
লেখক: সাবেক উপাচার্য, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিকসে উদ্যোক্তা উন্নয়নের সমন্বয়ক
অনুলিখন: এম এ খালেক