দীর্ঘ ১৩ দিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে না ফেরার দেশে চলে গেলেন কলেজ ছাত্রী ফুলন রানী বর্মন (১৮)। বুধবার সকাল ৬টায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন ফুলন। মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন নরসিংদী জেলা গোয়েন্দা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) আবদুল গাফফার (পিপিএম, বার)।
জানা যায়, ফুলন রানী বর্মণ নরসিংদী পৌর এলাকার বীরপুর মহল্লার যোগেন্দ্র চন্দ্র বর্মণের মেয়ে। তিনি গত বছর নরসিংদী শহরের উদয়ন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন।
নিহতের পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ১৩ জুন রাত সাড়ে ৮টায় শহরের বীরপুর বর্মণ পাড়াস্থ নিজ বাড়ির পাশেই একটি মুদির দোকান থেকে কেক কিনতে যান। সেখান থেকে বাড়িতে ফেরার পথে পূর্ব থেকে ওৎপেতে থাকা দুই দুর্বৃত্ত ফুলন রানীকে ধরে পার্শ্বের নির্জন স্থানে নিয়ে শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ ঘটনায় ফুলনকে প্রথমে নরসিংদী সদর হাসপাতালে ও পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসকরা জানায়, ফুলন বর্মণের শরীরের ২০ শতাংশ পুড়ে গেছে। এ ঘটনার পরদিন তার বাবা যোগেন্দ্র চন্দ্র বর্মন বাদী হয়ে নরসিংদী সদর মডেল থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্তভার দেওয়া হয় জেলা গোয়েন্দা পুলিশের এসআই আবদুল গাফফারকে। তিনি ফুলনদের জমি নিয়ে বিরোধ, প্রেমঘটিত ব্যাপারসহ নানা দিক নিয়ে তদন্ত করেন।
এ ঘটনায় এসআই আবদুল গাফফার গত ২০ জুন রাতে প্রথমে বীরপুর মহল্লার মৃত কেশব চন্দ্র সূত্রধরের ছেলে রাজু চন্দ্র সূত্রধরকে (২২) গ্রেফতার করেন। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই এলাকার ফনিন্দ্র বর্মণের ছেলে আনন্দ বর্মণ (২১) ও কিশোরগঞ্জের ডাংরি এলাকার নারায়ণ বর্মণের ছেলে ফুলনের ফুফাতো ভাই ভবতোষ বর্মণকে গ্রেফতার করে।
গত ২১ জুন রাজু বর্মন ও ২২ জুন ভবতোষ বর্মণ ফুলনের শরীরে আগুন দেওয়ার ঘটনার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে। জবানবন্দিতে তারা জানায়, ফুলনের ফুফাতো ভাই ভবতোষের প্ররোচনায় পূর্ব পরিকল্পিতভাবে তারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে। ভবতোষ তার মামা যোগেন্দ্র বর্মণের জমি নিয়ে বিরোধের প্রতিপক্ষ পার্শ্ববর্তী শুকলাল ও হীরা লালকে ফাঁসাতে এ অগ্নিকাণ্ডের পরিকল্পনা করেন। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজু ফুলনের মুখ চেপে ধরে এবং আনন্দ শরীরে কেরোসিন ঢালে। ভবতোষ দিয়াশলাইয়ের কাঠি দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।
আরও পড়ুন: টস জিতে ব্যাটে নিউজিল্যান্ড
ফুলনের বাবা যোগেন্দ্র বর্মণ বলেন, 'আমার মেয়েকে যারা হত্যা করেছে আমি তাদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানাচ্ছি। আমি বুঝতে পারিনি দুধ কলা দিয়ে কাল সাপ পুষেছি। ভবতোষ যে এ ঘটনা ঘটাবে আমরা চিন্তাও করতে পারিনি।'
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই আবদুল গাফফার বলেন, 'বুধবার সকাল ৬টায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ফুলন বর্মণ মারা গেছে। বিষয়টি খুবই বেদনাদায়ক। তবে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আমরা ফুলনের জবানবন্দি রেকর্ড করেছি। পরবর্তীতে তার দেওয়া তথ্য ও প্রযুক্তির সহায়তায় আমরা প্রকৃত মূল অপরাধী ফুলনের ফুফাতো ভাই ভবতোষসহ তার দুই সহযোগীদের গ্রেফতার করেছি। আশা করছি খুব অল্পসময়ের মধ্যেই অভিযোগপত্র দাখিল করতে পারব।'
তিনি আরও বলেন, 'মূলত ফুলন বর্মণকে হত্যা করে যোগেন্দ্র বর্মণের জমি নিয়ে বিরোধের প্রতিপক্ষকে ফাঁসিয়ে ভবতোষ বাড়িসহ জমি ভোগ দখলের চিন্তা থেকেই এ ঘটনা ঘটিয়েছে। মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন থেকে হত্যা মামলায় স্থানান্তরিত করা হবে।'
ইত্তেফাক/জেডএইচডি