খতিয়ান শূন্য হওয়ার কোনো সুযোগ নেই

বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনার আওতাভুক্ত নামজারি সেবা প্রদানের ম্যানুয়াল পদ্ধতির কয়েকটি ধারা ও রীতির (Protocol) ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে এক সম্মানিত নাগরিক সম্প্রতি দৈনিক ইত্তেফাকে তার লেখা ‘খতিয়ান শূন্য’ শীর্ষক এক উপসম্পাদকীয়তে আলোকপাত করেন। এটা অনস্বীকার্য যে ভূমিসেবা ডিজিটাইজেশনকে আরো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। তবে দক্ষ, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব ভূমিসেবা ব্যবস্থাপনা (System) ইতিমধ্যে যতটুকু অগ্রগতি অর্জন করেছে, এর আওতায়ই লেখকের উত্থাপিত বেশ কিছু উদ্বেগের সমাধান পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে আরো অনেক পাঠক পেয়ে যাবেন নিজেদের না করা প্রশ্নের উত্তর।

তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, বর্তমান ভূমিসেবা ডিজিটাইজেশন কার্যক্রম প্রচলিত ম্যানুয়াল সেবা প্রদানের ধারা ও রীতিকে অপরিবর্তিত রেখে কেবল ইলেকট্রনিক ব্যবস্থায় রূপান্তর নয়। ভূমিসেবা ডিজিটাইজেশনের সময় প্রযোজ্য ক্ষেত্রে যুগপত্ সেবা প্রদানের ধারা ও রীতি পরিবর্তন করা হয় এবং সেবা চালু হওয়ার পর চলমান থাকে ক্রমাগত উন্নয়ন। এজন্য বিধিবিধান ও নীতিমালা সংস্কার করা হচ্ছে নিয়মিত; এমনকি আইন সংশোধন এবং ক্ষেত্রবিশেষে আইন প্রণয়নেরও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে কয়েক শ বছরের পুরোনো ও অপ্রতিসম ভূমিসেবা ব্যবস্থার টেকসই সংস্কারের ক্রমাগত এই প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপের পরিপূর্ণতা আনার কাজ ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ২০২৬ সালের মধ্যে শেষ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

প্রথমত, আমরা লেখকের সঙ্গে একমত যে বাংলাদেশে প্রচলিত ভূমি ব্যবস্থাপনায় দাগ নম্বরের স্বাতন্ত্র্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সবাইকে নিশ্চিত করতে চাই যে ভূমি মন্ত্রণালয় দাগ নম্বরের স্বাতন্ত্র্য নিশ্চিত করার জন্য ইতিমধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে গত ২৬ জুন ২০২৩ তারিখে জারি করা ‘আইবাস সিস্টেম ব্যবহার করে সরকারি আবাসন (Housing) প্রকল্পসহ অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পরিপূরক নির্দেশন’ শীর্ষক এক পরিপত্রে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।

প্রচলিত ম্যানুয়াল ব্যবস্থা থেকে কিছু ধারা সংস্কার করে বর্তমানে বিভিন্ন আবাসন প্রকল্প এলাকায় প্রচলিত দাগ ভেঙে প্লটে পরিণত করা হয়েছে। পরিপত্রের নির্দেশনা অনুযায়ী এখন বিভিন্ন আবাসন প্রকল্প এলাকায় প্রদত্ত প্লট নম্বরকে দাগ নম্বরের স্থলে দেখানো হয় এবং জরিপের সংশ্লিষ্ট (Corresponding) দাগকে আগত দাগ হিসেবে দেখানো হয়। তবে কোনো প্রকল্প এলাকায় সেকশন বা ব্লকভিত্তিক প্লট নম্বরের পুনরাবৃত্তি (Repetition) হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় ভবিষ্যত্ বিভ্রাট এড়াতে খতিয়ানের মন্তব্য কলামে সেকশন বা ব্লক নম্বর, রোড নম্বর ও ফ্ল্যাট নম্বর (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) লিপিবদ্ধ করা হয়।

কোনো মৌজার নতুন রেকর্ড বই প্রকাশিত হলে এবং তা পাওয়া গেলে আবশ্যিকভাবে নতুন রেকর্ডের ভিত্তিতে ২ নম্বর রেজিস্টার খুলে তাতে রেকর্ড অনুসারে নতুন হোল্ডিং লিপিবদ্ধ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভূমি উন্নয়ন করের দাবি নির্ধারণ করার জন্য সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনারগণকে (ভূমি) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই ব্যবস্থায় আমরা মনে করি, জমিতে নির্মিত ভবনে বসবাসরত ফ্ল্যাট মালিকদের দাগ নম্বর, তথা নিজ মালিকানার স্বাতন্ত্র্য বজায় থাকবে।

ভূমিসেবা ডিজিটাইজেশনের অন্যতম অনুষঙ্গ ভূমিসেবা প্রদানকারী সব কর্মকর্তাকে দক্ষ করে তোলা। সকল পর্যায়ের ভূমি কর্মকর্তাদের নিয়ে উত্তম নাগরিক সেবা প্রদানে দক্ষতা ও প্রেষণা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৌশল গ্রহণ করা হচ্ছে। সব ভূমি কর্মকর্তার বছরে বেশ কয়েক বার নিবিড় প্রশিক্ষণ ও কর্মশালায় অংশগ্রহণ করতে হয়। তবে এটাও বাস্তবতা যে, ভূমি ব্যবস্থাপনার এই ক্রমবর্ধমান পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং নতুন বিষয়ে শেখার অগ্রগতির ধারা সবার এক রকম নয়। লেখক দাগ নম্বরসংশ্লিষ্ট যে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন, তার কারণ ধারণা করা যায় কোনো তথ্যের ফাঁকের কারণে কিংবা কারো অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে করণিক ভুল, যা সহজেই সমাধানযোগ্য।

দ্বিতীয়ত, লেখক কর্তৃক উল্লেখিত খতিয়ান নম্বর ‘০’ বিষয়ে বলা যায় যে, নামজারি সিস্টেম উন্নয়নের শুরুর দিকে অনেক ভূমিসেবা প্রদানকারী স্বপ্রণোদিতভাবে সরকারি আবাসন প্রকল্প এলাকায় ইনামজারির মাধ্যমে প্রস্তুতকৃত চূড়ান্ত খতিয়ানে নম্বর একসময় শূন্য (০) বসাতেন। এর একটি অন্যতম কারণ ছিল, রাজউকের আওতাভুক্ত আবাসন প্রকল্প এলাকায় সংস্থাটির নিজস্ব ব্যবস্থা প্রণয়ন, যা ভূমিসেবা সিস্টেমের সঙ্গে ইতিপূর্বে ইন্টিগ্রেটেড ছিল না। বর্তমানে এই সমস্যা আর নেই। এখন সরকারি আবাসন প্রকল্প এলাকায় ইনামজারির মাধ্যমে প্রস্তুতকৃত চূড়ান্ত খতিয়ানে সংশ্লিষ্ট মৌজার খতিয়ানের ধারাবাহিক নম্বর প্রদান করা হয়। কোনোভাবেই খতিয়ান নম্বর শূন্য (০) বা অন্য অক্ষর বা শব্দ দেওয়া হয় না। সাধারণ খতিয়ান ও সরকারি আবাসন প্রকল্পের খতিয়ান নম্বরের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়।

ইনামজারি সিস্টেমে প্রস্তাবপত্র পাঠানোর সময় ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা খসড়া খতিয়ানে সরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠান ও তার প্রকল্পের নাম ড্রপডাউন বাটন দিয়ে নির্বাচন করেন, যা চূড়ান্ত খতিয়ানে উল্লেখ করা থাকে। কোনো সরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠান ও তার প্রকল্পের নাম ইনামজারি সিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত না থাকলে সরকারি আবাসন প্রকল্পের নাম অন্তর্ভুক্তিতে ভূমি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করার জন্য তার ওপর নির্দেশ আছে।

এছাড়া, ইতিমধ্যে যেসব নামজারি খতিয়ানের নম্বর ভিন্নভাবে {যেমন :খতিয়ান নম্বর শূন্য (০) বা অন্য অক্ষর বা শব্দ} প্রদান করা হয়েছে, সহকারী কমিশনাররা (ভূমি) নিজ উদ্যোগে সেই সব খতিয়ান সংশোধন করে মৌজাভিত্তিক ধারাবাহিকভাবে খতিয়ান নম্বর প্রদান করবেন, এই মর্মে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে বর্ণিত পরিপত্রের মাধ্যমে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভূমি মালিকের খতিয়ানের কপি সংশ্লিষ্ট দাগের/প্লটের মালিকগণকে প্রদান করে ২ নম্বর রেজিস্টার সংশোধন করার জন্য বলা হয়েছে। অর্থাত্, এটা পরিষ্কার যে বর্ণিত লেখক তার ‘খতিয়ান শূন্য’ সংশ্লিষ্ট লেখায় যে বিষয়টির অবতারণা করেছেন, তা বেশ আগেই সমাধান হয়ে গেছে, যার ব্যাপারে তিনি হয়তো ওয়াকিবহাল নন। তিনি ভূমি মন্ত্রণালয়ের ‘স্মার্ট কানেক্ট’ সেবা গ্রহণ করে সহজেই বিষয়টি জানতে পারতেন!

ভূমিসেবা ডিজিটাইজেশনের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ ‘স্মার্ট কানেক্ট, যা মূলত ৩৬০ ডিগ্রি মাল্টি চ্যানেলভিত্তিক নাগরিক সেবা (কাস্টমার সার্ভিস)। বর্তমানে নাগরিক সেবা কেন্দ্র, ১৬১২২ ভূমিসেবা হটলাইন, ভূমিসেবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই সেবা নেওয়া যাচ্ছে। পরবর্তী সময়ে ভূমিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও দক্ষ ভূমি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত প্যানেল বিশেষজ্ঞ সরাসরি ভূমি বিষয়ে সাধারণ পরামর্শসেবা প্রদান করবেন। ভূমি মন্ত্রণালয়ের স্মার্ট কানেক্টে যোগাযোগ করলেই যেকোনো বিভ্রান্তি দূর করা যাবে কিংবা মিলবে প্রশ্নের সমাধান, পাওয়া যাবে ভূমিসেবা বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য।

বাংলাদেশে ভূমি ব্যবস্থাপনার ডিজিটাইজেশন একটি জটিল ও বহুমুখী প্রচেষ্টা। যেমনটা ভূমিসচিব কিছুদিন আগেই বলেছেন যে, ভূমি মন্ত্রণালয় বৈচিত্র্যময় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই ভূমিসেবা ডিজিটাইজেশনের কাজ করছে। ভূমি মন্ত্রণালয় এই যাত্রায় নাগরিক ও অংশীজনদের পরামর্শ ও সম্পৃক্ততাকে মূল্য দেয়। কারণ তা আমাদের চলমান কার্যক্রম পরিমার্জন এবং জনসাধারণকে উত্তম ভূমিসেবা প্রদানে সহায়তা করে। 

ভূমি মন্ত্রণালয় মনে করে, এই অন্তর্ভুক্তিমূলক ভূমিসেবা ডিজিটাইজেশন কার্যক্রম স্মার্ট ও টেকসই করতে ভূমি ব্যবস্থাপনার এই রূপান্তরের সঙ্গে দ্রুত নাগরিকের সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। এর জন্য জনসচেতনতা ও শিক্ষামূলক প্রচারণা অপরিহার্য। কৌশলগত যোগাযোগ ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে গড়ে তোলা সম্ভব নিজ নাগরিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন এবং ডিজিটাল জ্ঞানসম্পন্ন জনগোষ্ঠী, যারা ডিজিটাল ভূমিসেবাসমূহ কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারবেন। ভূমি মন্ত্রণালয় এ বিষয়েও পদক্ষেপ নিয়েছে।

সামগ্রিক ভূমি ব্যবস্থাপনায় সম্পূর্ণ গুণমান ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশের নাগরিকদের কাঙ্ক্ষিত ভূমিসেবা প্রদানে ভূমি মন্ত্রণালয় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত স্মার্ট বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে স্মার্ট ভূমিসেবা—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। ভূমিসেবা গ্রহণকারী নাগরিক, ভূমিসেবা প্রদানকারী কর্মকর্তা এবং সব অংশীজন একসঙ্গে কাজ করলে এই প্রত্যাশা সহজেই পূরণ করা সম্ভব হবে।

লেখক: জনসংযোগ কর্মকর্তা, ভূমি মন্ত্রণালয়