পদ্মা সেতু দেখিবার উদ্দেশ্যে নৌবিহারে যাওয়া ৪৬ যাত্রীসহ একটি ট্রলার গত শনিবার মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলায় পদ্মার এক শাখানদীতে বাল্কহেডের সহিত ধাক্কা লাগিয়া ডুবিয়া যায়। দুর্ঘটনায় নিহত হইয়াছে পাঁচ শিশুসহ মোট আট জন। এখনো নিখোঁজ রহিয়াছে দুই শিশুসহ মোট পাঁচ জন। দেশে দিনদিন নৌ-দুর্ঘটনার হার বাড়িয়া চলিতেছে। প্রাণ যাইতেছে শত শত মানুষের। উল্লেখ্য, ‘নোঙ্গর ট্রাস্ট’ নামক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যান মতে, বিগত বায়ান্ন বছরে দেশে শুধু নৌ-দুর্ঘটনায় মৃত্যু হইয়াছে ২০ সহস্রাধিক মানুষের। নৌ-দুর্ঘটনার ৪৩ শতাংশই ঘটে অন্য কোনো নৌযানের সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে, ২৫ শতাংশ ঘটিয়া থাকে ধারণক্ষমতার অধিক যাত্রী বোঝাইয়ের ফলে। ২০১০ হইতে ২০২০ অবধি ১৭১টি লঞ্চ দুর্ঘটনায় ৬২৩ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। ইহা ছাড়াও, এই ধরনের দুর্ঘটনায় ১২২ জনের মৃতদেহ খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই। বিশেষজ্ঞদের মতে, যাত্রীদের অসচেতনতা-অসাবধানতা, নৌপথে ত্রুটিপূর্ণ, ফিটনেস বিহীন ও অনিবন্ধিত নৌযান চলাচল, অদক্ষ এবং অনভিজ্ঞ নৌচালকদের নিয়োগ ও সর্বোপরি নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার অভাবেই অধিকাংশ নৌ-দুর্ঘটনা ঘটিয়া থাকে।
সর্বশেষ ট্রলারডুবির ঘটনাস্থল লৌহজংয়ে গত বছর হইতেই বাল্কহেড চলাচলের উপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। বালুবাহী বাল্কহেডের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল রোধে বসানো হইয়াছিল আড়াআড়ি বাঁশ। ইহার পরও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করিয়া উল্লিখিত বাল্কহেড চালক এই পথে চলাচলের সময় নিয়ন্ত্রণ হারাইলে উক্ত ট্রলারের বাল্কহেডের সহিত সংঘর্ষ হয়। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও কী করিয়া এই ধরনের বাল্কহেড বহাল তবিয়তে চলিতে পারে? শুধু ঐ পথেই নহে, যাত্রীবাহী নৌযানগুলোর যাত্রার নিরাপত্তার স্বার্থে দেশ জুড়িয়া যাত্রীবাহী নৌপথগুলিতে রহিয়াছে বাল্কহেডের রাত্রিকালীন চলাচলের উপর বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নিষেধাজ্ঞা। তাহার পরও কর্তৃপক্ষের এহেন বাধানিষেধকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করিয়া কোথাও কোথাও নৌ-পুলিশ বা কোস্ট গার্ডের সহিত আর্থিক সমঝোতা করিয়া কিছু বাল্কহেডের চালক ও মালিকগণ অবৈধভাবে রাত্রীকালীন চলাচল করে বলিয়া অভিযোগ রহিয়াছে। সরকারি হিসাবে দেশে মোট ৪ হাজার ৭০০টি নিবন্ধিত বাল্কহেড চলাচলের কথা। নৌপরিবহনের নীতিমালা অনুযায়ী, ১৬ হর্স পাওয়ার ইঞ্জিনের অধিক বা নৌযানের যাত্রী ধারণক্ষমতা ১২ জনের অধিক হইলেই তাহার নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। অথচ সমগ্র দেশের নৌপথে চলিতেছে ১১ সহস্রাধিক বাল্কহেড। আর নিবন্ধন না থাকিলে স্বাভাবিকভাবেই তাহার দায়দায়িত্ব নেয় না বিআইডাব্লিউটিএ। আবার নৌপরিবহন অধিদপ্তর তাহাদের নিকট নিবন্ধনের জন্য না গেলে তাহারা নিজ উদ্যোগে নিবন্ধনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে না। উপরন্তু এই সকল বাল্কহেড চালাইবার জন্য সঠিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ মাস্টারের পরিবর্তে স্বল্প বেতনে অদক্ষ সুকানি বা সারেং নিয়োগ দেওয়া হইতেছে। অনেক ক্ষেত্রে অদক্ষ বা প্রশিক্ষণবিহীন নৌচালকেরা টাকার বিনিময়ে কিনিয়া লইতেছেন নৌ চালনার লাইসেন্স। ফলে নৌপথে বাড়িয়া চলিতেছে মৃত্যুর মিছিল। ঘটিতেছে অনেক তাজা প্রাণের সলিল সমাধি। নৌপরিবহন অধিদপ্তরের চিফ ইঞ্জিনিয়ার ও চিফ সার্ভেয়ার জানাইয়াছেন যে, অনেক মালিক-চালকই তাহাদের নিকট অনেকেই নিবন্ধন লইতে আসেন না, কারণ নিবন্ধনের যেই সকল শর্ত রহিয়াছে তাহা তাহারা পূরণ করিতে পারেন না। সেই কারণে নিবন্ধনের প্রতি তাহাদের এইরূপ অনীহা। আবার অনিবন্ধিত বাল্কহেড দুর্ঘটনায় পড়িলেও তাহার চালক-মালিককে খুঁজিয়া বাহির করা মুশকিল হইয়া পড়ে।
বাল্কহেড নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নৌ-পুলিশের। রাত্রিকালীন নৌযাত্রার ওপর নৌ-পুলিশ কর্তৃক নজরদারি না বাড়াইলে নৌপথে সাধারণ মানুষের প্রাণহানির ঘটনা চলিতেই থাকিবে। নৌ ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে আঞ্চলিক নৌপথগুলিতে নাই যথাযথ সিগন্যালিং ব্যবস্থা। এই ক্ষেত্রে নৌ-পুলিশ ও নৌপরিবহন অধিদপ্তরের সক্রিয়তা বাড়াইতে হইবে। নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ ও নৌপরিবহন অধিদপ্তরের উচিত নিবন্ধন ও ফিটনেস চেকের ক্ষেত্রে তৎপরতা বৃদ্ধি করা। ইহা ছাড়াও, অনিবন্ধিত বাল্কহেড চালক-মালিকদের শনাক্ত করিয়া তাহাদের আইনের আওতায় আনা দরকার। প্রশিক্ষণবিহীন চালক ও ফিটনেসবিহীন নৌযান যাহাতে কোনোভাবেই চলাচল করিতে না পারে তাহার উপর কঠোর নজরদারি জরুরি।