দেশে মাধ্যমিক হইতে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা স্তরে প্রতি বছর ঝরিয়া পড়িতেছে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী। এবং এই সংখ্যা দিনে দিনে ক্রমেই বাড়িয়া চলিতেছে। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ২ লক্ষ ৮৫ হাজার, যাহা মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ২২ শতাংশ, আর ২০২৩ সালে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে ৮ লক্ষ ৬১ হাজার, যাহা এইবারের মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৪১ শতাংশ। প্রতি বছর বাড়িতেছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা, ইহার সহিত টেক্কা দিয়া বাড়িতেছে ঝরিয়া পড়া শিক্ষার্থীর হারও। আর্থসামাজিক কারণেই মূলত প্রতিনিয়ত এই সকল শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাট চুকাইতেছে; কিন্তু এই বিপুলসংখ্যক মাধ্যমিক পাশ শিক্ষার্থীদের দায় নিবে কে? তাহাদের ঝরিয়া পড়া ঠেকাইতে কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হইবে না?
এইদিকে এই বছরও একাদশ শ্রেণিতে ৯ লক্ষ আসন ফাঁকা থাকিবে বলিয়া জানা যাইতেছে। এইবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়াছে প্রায় সাড়ে ১৬ লক্ষ শিক্ষার্থী। অথচ সমগ্র দেশে একাদশ শ্রেণিতে মোট আসন রহিয়াছে প্রায় ২৫ লক্ষ। এই লক্ষ লক্ষ আসন ফাঁকা থাকিবার বিষয়টি কী বার্তা দিতেছে? ইহাতে শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অস্তিত্বসংকটে পড়িবে। এখন প্রশ্ন হইল, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা লওয়া হইবে তো? গত বছর ২০৪টি উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোনো শিক্ষার্থী পায় নাই। তাহার মানে অতিরিক্ত আসনের ব্যাপারে কী করা যায় তাহা লইয়া এখন হইতেই চিন্তাভাবনা করিতে হইবে। এইবার যেই সকল মাধ্যমিক স্কুল-মাদ্রাসা হইতে এক জনও পাশ করে নাই, তাহাদের ব্যাপারেও পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
ইহা ছাড়া সাড়ে ৮ লক্ষাধিক শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ ব্যতিরেকেই পড়ালেখার ইতি টানিতে যাইতেছে, এই বিষয়টি ভাবিতে গেলেই আমাদের দুঃখ হয়। তাহার মধ্যে ৩ লক্ষ ৩৫ হাজার শিক্ষার্থী মাধ্যমিক পাশ করিয়া আর উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তিই হয় নাই। বাকিরা আবার নিবন্ধন করিয়াও পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করিবে না বলিয়া জানা যায়। উল্লেখ্য, বিগত বছরগুলিতে নারী শিক্ষার্থীদের ঝরিয়া পড়িবার হার অধিক হইয়া থাকিলেও এই বছর পুরুষ শিক্ষার্থীদের ঝরিয়া পড়িবার হারই অধিক। সকলকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করিতে হইবে, এমন কোনো কথা নাই। উন্নত বিশ্বের দেশে উচ্চশিক্ষার হার তুলনামূলক কম। অধিকাংশ শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক বা ডিপ্লোমা পাশ করিয়া কর্মক্ষেত্রে ঝাঁপাইয়া পড়ে; কিন্তু এই উচ্চমাধ্যমিকের পূর্বেই যদি অনেকে ঝরিয়া পড়ে, তাহা হইলে দেশে গুণগত জনসম্পদ গড়িয়া উঠিবে না। নারী শিক্ষার্থীদের ঝরিয়া পড়িবার পিছনে মূল কারণ বাল্যবিবাহ। বাল্যবিবাহের হার বিবেচনায় বাংলাদেশ এশিয়ায় প্রথম। আবার বিবাহ করিয়া পড়াশোনা চালাইয়া যাইবার চেষ্টা করে অনেকে; কিন্তু সেই ক্ষেত্রে অধিকতর সময়েই থাকে শ্বশুরবাড়ির নিষেধাজ্ঞা, সন্তানসম্ভবা হওয়া, সন্তানলাভ করা, নানাবিধ সাংসারিক চাপসহ আরও অনেক প্রতিবন্ধকতা। আবার পুরুষ শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে দেখা যাইতেছে যে, অধিকাংশ শিক্ষার্থীই পারিবারিক দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক চাপে মাধ্যমিকের পরে আর পড়াশোনা চালাইয়া যাইতে পারিতেছে না।
করোনার দুই বছরে বিপুলসংখ্যক লোক চাকরি ও জীবিকা নির্বাহের পথ হারাইয়াছে। এই ক্ষেত্রে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনার বিষয়ে আগ্রহী থাকিলেও পরিবারের হাল ধরিবার তাগিদে মাধ্যমিকের পরেই কর্মসংস্থানের জন্য লাগিয়া পড়িতে বাধ্য হয়। কেহ-বা আবার পারিবারিক সূত্রে কৃষিকাজ বা ব্যবসায়ের দেখাশোনায় যোগদান করে। অনেকেই আবার অসত্সঙ্গে জড়াইয়া পড়িয়া আসক্ত হইয়া যায় বিভিন্ন নেশায়, ফলে বিচ্যুতি ঘটে পড়াশোনার। তরুণ সমাজ দেশের ভবিষ্যৎ কাণ্ডারি। তাই আমরা চাই, তাহারা কেহই যেন উচ্চমাধ্যমিকের পূর্বে ঝরিয়া না পড়ে। এই ব্যাপারে শিক্ষার্থীবিষয়ক ট্রেসার গবেষণা চালুসহ তাহাদের পুনরায় শিক্ষাব্যবস্থায় ফিরাইয়া আনিবার পদক্ষেপ লইতে হইবে। এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বোর্ড, শিক্ষা কর্মকর্তা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির তদারকি ও তৎপরতা জরুরি।