১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তার পরিবারের ১৮জন সদস্যকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির জীবনে কলঙ্কের অধ্যায় শুরু হয়। এই বাস্তবতায় তরুণ প্রজন্মের কাছ থেকে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া এবং তরুণ প্রজন্মের প্রশ্ন কী হবে তার পর্যবেক্ষণ এবং বিশ্লেষণ বর্তমান সময়ের আলোকে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং তৈরিকৃত বিকৃত ইতিহাস তরুণ প্রজন্মকে সিদ্ধান্তহীনতায় নিয়ে যায়। সংগত কারণেই ইতিহাসের সঠিক তথ্য দিয়ে তরুণ প্রজন্মকে নিজে প্রশ্ন করার এবং উত্তর খুঁজে নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি করে দিতে হবে। প্রাসঙ্গিক আলোচনায় আমরা যদি ১৯৭৫-এর আগে পরে ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখা যায় ১৫ আগস্টের হত্যাকা্লের প্রেক্ষাপট তৈরিতে যে ষড়যন্ত্র ছিল তা এখন প্রমাণিত। তত্কালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর লক্ষ্য ছিল ওই মামলায় বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে সমগ্র বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের সংগ্রাম থামিয়ে দেওয়া। কিন্তু সেই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দেয় আপামর বাঙালি ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আপামর বাঙালিকে যে আদর্শে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন তা হলো বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়। এই আদর্শিক ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে অসাম্প্রদায়িক চেতনা, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক- সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠা, সর্বোপরি বাঙালি জাতীয়তাবাদের মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, বঙ্গবন্ধুর ৬ দফায় বাঙালির অর্থনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক, সাংস্কৃতিক এমনকি সামরিক ব্যবস্থায়ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় দাবিতেই তার আদর্শিক বিষয়গুলো পরিষ্কার করে উঠে এসেছিল। মহান স্বাধীনতা লাভের পর বঙ্গবন্ধু সেই আদর্শের আলোকেই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের পুনঃগঠনের কাজ শুরু করেন। অর্থনীতি, শিল্প, কৃষিসহ সকল উত্পাদনভিত্তিক খাতের উন্নয়নে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। সামাজিকক্ষেত্রে শিক্ষাখাতে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষায় নীতি নির্ধারণী ব্যবস্থা গ্রহণে ও নানা কর্মসূচি বাস্তবায়নে উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে মানবিকবোধসম্পন্ন, বিজ্ঞানমনস্ক প্রগতিশীল আধুনিক জাতিতে পরিণত করতে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে দীক্ষিত করার মধ্য দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছিলেন।
পূর্বেই উল্লেখ করেছি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকা্ল, অর্থাত্ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ষড়যন্ত্র এবং প্রেক্ষাপট তৈরি করা হয়েছিল অনেক আগে থেকেই। যার বেশকিছু বিষয় দেখা যায় স্বাধীনতা পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী ঘটনা প্রবাহের মাধ্যমে। যেমন স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ১৯৭৪ সালের কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের ফসল। তেমনিভাবে বঙ্গবন্ধুকে ও তার সরকারকে ব্যর্থ করতে নানা ষড়যন্ত্র ও মিথ্যা প্রচারণা চালানো হয়। মূলত এই ষড়যন্ত্রকে তিনটি ভাগে ভাগ করে বোঝানো যায়। যেমন প্রথমত, আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদের হীন ষড়যন্ত্র; খাদ্যবাহী গমের জাহাজ বঙ্গোপসাগর থেকে ফিরিয়ে নেওয়ায় ষড়যন্ত্রের প্রমাণ মেলে। আরো ঘটনা আছে। দ্বিতীয়ত, দেশের অভ্যন্তরে পাকিস্তানপন্থি বঙ্গবন্ধু সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্রকারী ব্যক্তিবর্গ। তৃতীয়ত, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানপন্থি ও স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দল ও নেতৃবর্গের হীন ষড়যন্ত্র। এই তিন ধরনের ষড়যন্ত্রকারীদের সমন্বিত তত্পরতায় বাংলাদেশের ইতিহাসের এই নৃশংস হত্যাকা্ল ঘটানো হয়। এদের লক্ষ্য ছিল বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারকে হত্যা করে তার যে আদর্শে বাঙালি মুক্তিযুদ্ধ করেছিল, তিনি যে দেশ ও দেশের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, সেই আদর্শকে হত্যা করে সমগ্র দেশকে পাকিস্তানপন্থি, প্রতিক্রিয়াশীল, মৌলবাদী আদর্শে ঘুরিয়ে দেওয়া। এক্ষেত্রে ষড়যন্ত্রকারীরা আংশিক সফলও হয়েছে। কেননা ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ের প্রজন্ম ইতিহাসের মিথ্যা তথ্যে বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার আদর্শের প্রশ্নে দ্বিধাবিভক্ত হয়েছে। প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী সেই সুযোগটাও নিয়েছে। ৭৫ পরবর্তী বছরগুলোতে দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা প্রশ্নে ভুল তথ্য প্রবাহিত করে ষড়যন্ত্রকারীরা। যার প্রভাব পড়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্মে।
সুতরাং তরুণ প্রজন্মকে আত্মবিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে যথাযথ তথ্য এবং সঠিক ইতিহাস উপস্থাপনের মাধ্যমে। এতে তরুণ প্রজন্ম বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা প্রসঙ্গে সঠিক পথে চলতে পারে। পরিষ্কার বুঝতে পারে প্রতিক্রিয়াশীল মতাদর্শ, মৌলবাদী ভাবাদর্শ আর ভোগবাদী গোষ্ঠীর নেতিবাচক প্রভাব। সেইসঙ্গে মহান মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ, লক্ষ লক্ষ নারীর সম্ভ্রম ত্যাগের মহিমা, রাজনৈতিক, পেশাজীবীদের নির্যাতন, অত্যাচারের তথ্য, সর্বোপরি আপামর জনগণের ত্যাগের মহিমা তরুণ প্রজন্মের আত্ম-উপলব্ধিতে গ্রথিত করবে। আর এই মহিমায় মহিমান্বিত হয়ে তরুণ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
n লেখক: উপাচার্য, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়