বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি

কর্মীদের চাঁদার পাঁচ কোটি টাকা গায়েব!

অনিয়ম-দুর্নীতির বেড়াজাল থেকে বের হতে পারছে না দেশের একমাত্র উত্পাদনরত বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি। খনি ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত কোম্পানিটিতে অনিয়ম এতটাই প্রচলিত যে, প্রায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে চাঁদাবাজি। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে উত্তোলনকৃত চাঁদার প্রায় ৫ কোটি টাকা গায়েব করে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানের কিছু কর্মকর্তা।  

খোদ বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানির (বিসিএমসিএল) তদন্তেই এ চাঁদাবাজির প্রমাণ মিলেছে। গত ১০ জুন পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের কাছে এ সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে তদন্ত কমিটি। একই সঙ্গে এ বিষয়ে আরো তদন্তের জন্য একটি উচ্চতর কমিটি গঠনের সুপারিশও করেছে। গত ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬ এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রফিট বোনাস বিতরণের সময় কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিকট হতে কী হারে চাঁদা আদায় করা হয়েছিল এবং কোন খাতে তা বিতরণ করা হয় তা তদন্ত করতে গত এপ্রিলে একটি কমিটি গঠিত হয়।

তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রফিট বোনাসের জন্য সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী ৯২ হাজার টাকা হারে প্রদান করেন। সে হিসাবে ২০১৪-২০১৫ সালে ১৪৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী মোট ১ কোটি ৩৫ লাখ ২৪ হাজার টাকা চাঁদা দেন। ২০১৫-১৬ সালে ১৪৫ জন মোট       ১ কোটি ৩৯ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং ২০১৬-১৭ সালে ১৪০ জন সুবিধাভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারী ১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা চাঁদা প্রদান করেন। অর্থাত্ তিন বছরে ৪ কোটি ৪২ লাখ ৪৪ হাজার টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। আর এ চাঁদা আদায়ের নেতৃত্বে ছিলেন বিসিএমসিএলের সাবেক সচিব ও ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য মো. আবুল কাসেম প্রধানীয়া। গত বছর খনির মজুদকৃত কয়লার হিসাবে গড়মিলের পর পেট্রোবাংলার অন্য একটি কোম্পানিতে বদলি করা হয় তাকে।

একইসাথে পেনশন প্রথা চালুর জন্য ৩০ হাজার টাকা হারে ৫০ লাখ টাকা আদায় করা হলেও সেই চাঁদা কী ভাবে ব্যয় করা হয়েছে তাও তদন্ত করেছে সাত সদস্যবিশিষ্ট কমিটি।

তদন্ত কমিটির এক সদস্য বলেন, কমিটি মাত্র তিন বছরের প্রফিট বোনাস থেকে চাঁদা আদায়ের বিষয়টি অনুসন্ধান করেছে। কমিটির সকল সদস্যই কোম্পানির কর্মকর্তা। তাই অনুসন্ধানে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। পেট্রোবাংলা বা মন্ত্রণালয় উচ্চতর তদন্ত করলে আরো আগের ও পরের অনেক দুর্নীতি-অনিয়মের তথ্য উঠে আসবে। এমনকি খনি উন্নয়নে টেকসই ব্যবস্থাপনায় গাফিলতির বিষয়টিও উঠে আসবে।

এ প্রসঙ্গে বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. ফজলুর রহমান বলেন, প্রফিট বোনাস বিতরণের সময় আদায়কৃত চাঁদা এবং পেনশন প্রথা চালুর জন্য আদায়কৃত চাঁদার টাকা খরচের বিষয়টি তদন্ত করে কমিটি রিপোর্ট দিয়েছে। কিছু অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। অধিকতর তদন্ত প্রয়োজন। সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পেট্রোবাংলাকে অনুরোধ করা হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, কমিটির কাছে সাক্ষাত্কারে বেশিরভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারী গত ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রফিট বোনাস গ্রহণকালে চাঁদা প্রদানের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। লিখিত বক্তব্য প্রদানকালে কিছু সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী বিসিএমসিএল’র তত্কালীন ট্রাস্টি বোর্ড মূলত: বোর্ডের সদস্য মো. আবুল কাসেম প্রধানীয়ার নির্দেশে চাঁদা দেন। ট্রাস্টি বোর্ডের আহবায়ক ও সদস্যরা মিলে অর্থ ও হিসাব বিভাগের কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফাইজ উদ্দিন মৃধা, মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা ও মোহাম্মদ নোমান প্রধানীয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নামে ইস্যুকৃত ট্রাস্টি বোর্ডের চেকে স্বাক্ষর নেন। অপরদিকে কোনো কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী জানান, সম্মিলিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এ চাঁদা গ্রহণ করা হয়। তবে পরবর্তীতে দৈবচয়নের ভিত্তিতে কয়েকজন কর্মচারীকে চাঁদা প্রদানের প্রমাণ উপস্থাপনের অনুরোধ জানালে তারা তা দাখিল করতে পারেননি। আর তিন জন কর্মকর্তা ট্রাস্টি বোর্ডে রক্ষিত চেক বইয়ের বেশকিছু পাতার অবশিষ্টাংশ প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেন। আদায়কৃত চাঁদার টাকা কোন কোন খাতে খরচ করা হয়েছে সে বিষয়ে তদন্ত কমিটি কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পায়নি। তবে কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী জানিয়েছেন, আদায়কৃত চাঁদার অর্থ থেকে কিছু টাকা খনি থেকে কয়লা উত্তোলনে নিয়োজিত চীনা ঠিকাদার এক্সএমসি-সিএমসি কনসোর্টিয়ামের বাংলাদেশি শ্রমিকদের দেওয়া হয়েছে। তবে এ দাবির সপক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

কোম্পানির এক কর্মকর্তা জানান, কর্মচারীরা মৌখিক অভিযোগ করলেও লিখিত প্রমাণ দাখিল করতে ভয় পান। কর্মকর্তারা সে ভয় অপেক্ষাকৃত কম পান বলে কেউ কেউ প্রমাণ দেখিয়েছেন।

বড়পুকুরিয়া কোল মাইন অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে পেনশন প্রথা চালুর বিষয়ে বিসিএমসিএল কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করে। পেনশন প্রথা চালুর জন্য মাথাপিছু ৩০ হাজার টাকা চাঁদা প্রদান করতে অ্যাসোসিয়েশনের তখনকার সভাপতি আবুল কাসেম প্রধানীয়া এবং কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক (হিসাব ও অর্থ) মো. আব্দুল মান্নান পাটওয়ারী কর্মকর্তাদের উদ্বুদ্ধ করেন এবং আদায় করেন। এরপর চার বছরের বেশি সময় কেটে গেলেও সেই পেনশন প্রথা চালু হয়নি। জনপ্রতি ৩০ হাজার টাকা করে আদায়কৃত প্রায় ৫০ লাখ টাকা কোথায় কোথায় খরচ করা হয়েছে সে বিষয়ে  কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী জানে না। পেনশন প্রথা চালু না হলে ওই অর্থ তারা ফেরত চান বলে তদন্ত কমিটির কাছে জানিয়েছেন।