বিদেশের মাটিতে নিষ্ঠা আর দায়িত্বশীলতার অনন্য নজির স্থাপন করল বাংলাদেশ নৌবাহিনী। আর এর স্বীকৃতি হিসেবে গতকাল বুধবার বিশেষভাবে সম্মান জানানো হলো বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদস্যদের। হাজার মাইল দূরে দক্ষিণ সুদানের রাজধানী যুবায় উড়লো লাল সবুজের পতাকা, বিউগলে বেজে উঠলো প্রাণের জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।’ এরপরই বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মেরিন ইউনিটের ১৯৯ জনকে পরিয়ে দেওয়া হলো জাতিসংঘের সম্মানসূচক শান্তিপদক। পদক প্রদান অনুষ্ঠানকে ঘিরে গতকাল যুবার মিশন এলাকায় ছিল জমকালো আয়োজন এবং বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদস্যদের মনোমুগ্ধকর প্যারেড। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদস্যদের সম্মান ও শুভেচ্ছা জানাতে প্যারেডে হাজির হয়েছিলেন দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে দায়িত্বরত আমেরিকা, অস্ট্রোলিয়া, হল্যান্ড, ভারত, নেপাল, রুয়ান্ড, ইথিওপিয়ার কন্টিনজেন্ট প্রধানরা।
জাতিসংঘের আওতায় ২০১৫ সাল থেকে পূর্ব মধ্য আফ্রিকার রাষ্ট্র দক্ষিণ সুদানে চার বছর ধরে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কয়েকশ নাবিক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশটিকে সহায়তা করে আসছে। পদক পাওয়া নৌবাহিনীর ১৯৯ জন সদস্যের মধ্যে ১১০ জন দক্ষিণ সুদানের মালাকালে কর্মরত। আর ৮৯ জন দেশটির রাজধানী যুবাতে কর্মরত। দক্ষিণ সুদানের লাইফ লাইন হিসেবে পরিচিত নীলনদে বয়ে নিয়ে যাওয়া জাতিসংঘের জরুরি পণ্যবাহী বার্জ এর নিরাপত্তায় কাজ করেছেন তারা। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর লজিস্টিক সাপোর্ট যে কোনো দেশের তুলনায় কম হলেও তাদের কর্মদক্ষতা আর মানুষের প্রতি আন্তরিকতায় জয় করতে পারছে দক্ষিণ সুদানের দুই বিরোধী পক্ষকে। যে দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘের অন্য কন্টিনজেন্টগুলোকে ভিন্ন চোখে দেখা হয়, সেখানে বাংলাদেশের নৌবাহিনীর সদস্যদের দেখা হয় সমীহের চোখে।
সদ্য স্বাধীন হওয়া এই রাষ্ট্রে এখনও গড়ে ওঠেনি ভালো কোনো যোগাযোগ ব্যবস্থা। এক প্রদেশ থেকে আরেক প্রদেশ যেতে পোহাতে হয় নানা ঝক্কি-ঝামেলা। তবে দক্ষিণ সুদানের বুক জুড়ে রয়েছে হাজার মাইল দীর্ঘ নীলনদ। এই নদীই দেশটির উত্তর থেকে দক্ষিণের যোগাযোগের একমাত্র পথ। তবে দেশটিতে চলমান দুই পক্ষের মতবিরোধ আর সংঘর্ষ এই নদীপথকে করে তুলেছে ভয়ানক। আর এই ভয়ানক নদীপথটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিল আমাদের নৌবাহিনী। তার প্রশংসা করতে পিছু হননি দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল জুক এবং সেনাপ্রধান জেনারেল গ্যাব্রিয়েল।
বাংলাদেশ নৌবাহিনীর রিয়ার অ্যাডমিরাল খালেদ ইকবাল এর নেতৃত্বে বাংলাদেশের নৌ সদর দপ্তরের উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল গত মঙ্গলবার সাক্ষাত্ করেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী জুক এর সঙ্গে। জুক বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং নৌবাহিনীর যে সদস্যরা তার দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছেন তারা যে কোনো দেশের সৈন্যদের তুলনায় অধিক আন্তরিক। তারা নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখাচ্ছে আমাদের। তাদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ।
এর আগে মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে রিয়ার অ্যাডমিরাল খালেদ ইকবালের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল সাক্ষাত্ করেন দেশটির সেনাপ্রধান জেনারেল গ্যাব্রিয়েলের সঙ্গে। এ সময় জেনারেল গ্যাব্রিয়েল বাংলাদেশের কন্টিনজেন্টগুলো নিয়ে ভুয়সী প্রশংসা করে বলেন, বাংলাদেশের কন্টিনজেন্টগুলোর দায়িত্বশীলতা, তাদের আচার-ব্যবহার এবং দক্ষিণ সুদানের মানুষদের প্রতি যে ভালোবাসা, তা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। ৩৮টি দেশ থেকে কন্টিনজেন্ট এসেছে, তাদের মধ্যে সেরা বাংলাদেশের কন্টিনজেন্টগুলো।
জেনারেল গ্যাব্রিয়েল আরো বলেন, নীলনদ দিয়ে পণ্য বহন করার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী, তা আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে। এরই ধারাবাহিকতা দক্ষিণ সুদান সরকার সমপ্রতি সুদান থেকে মালাকাল হয়ে নীলনদ দিয়ে প্রথমবারের মতো পণ্য এনেছে রাজধানী যুবাতে।
বাংলাদেশ নৌবাহিনীর রিয়ার অ্যাডমিরাল খালেদ ইকবাল দক্ষিণ সুদানের সেনাপ্রধানের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মেরিন ইউনিটের সদস্য অত্যন্ত সাহসিকতা ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছে। তারা এক হাজার কিলোমিটারের নদীতে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে জাতিসংঘের ম্যানডেট বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জাতিসংঘের নিত্যপ্রয়োজনীয় জ্বালানি খাদ্যসামগ্রী ওষুধপত্র ও মানবিক সাহায্য বহনকারী বার্জসমূহের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করছে। পাশাপাশি নৌপথের জলদস্যুতা পর্যবেক্ষণ ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে ফোর্স সদর দপ্তরকে অবহিত করছে। তিনি আরো বলেন, নৌবাহিনীর কন্টিনজেন্টটি নীলনদের দীর্ঘ এক হাজার কিলোমিটারের মধ্যে ৩৩টি অপারেশন লাইফ লাইন অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনী সাউথ সুদানের সরকার এবং জনগণের উন্নয়নে আরো নিবিড়ভাবে কাজ করতে চায়।