টঙ্গিতে তাবলীগের দুই গ্রুপে ব্যাপক সংঘর্ষ

বিশ্ব ইজতেমায় আধিপত্য নিয়ে তাবলীগ জামাতের দুই পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনায় একজন নিহত ও অন্তত দেড় শতাধিক আহত হয়েছেন। নিহতের নাম ইসমাইল হোসেন মণ্ডল (৬৫)। গতকাল শনিবার ভোর থেকে তাবলীগ জামাতের দুই পক্ষের মুখোমুখি অবস্থানের পরে সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত ইজতেমা ময়দানের গেট ও আশপাশের এলাকায় দফায় দফায় ধাওয়া, পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ কারণে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে সকল প্রকার যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি ৬ ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়। ফলে দূর পাল্লার যাত্রীরা পড়েন চরম ভোগান্তিতে।

বিকালে পুলিশ উভয় পক্ষকে মাঠ থেকে বের করে দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ময়দান ঘিরে বিপুল সংখ্যক আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সেখানে র্যাবের হেলিকপ্টার টহল অব্যাহত রয়েছে। সংঘর্ষের পর উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিকাল সাড়ে চারটার দিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বৈঠক ডাকা হয়েছে। ওই বৈঠকে পুলিশের মহাপরিদর্শক জাবেদ পাটোয়ারীসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং তাবলীগের দুই পক্ষের মুরব্বিরা উপস্থিত হন।

গুরুতর আহতদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নিহত ইসমাইল হোসেন মণ্ডলের বাড়ি মুন্সিগঞ্জ জেলা সদরের নিকলিয়াপাড়া এলাকায়। তার বাবার নাম খলিল মণ্ডল। তিনি তাবলীগ জামাতের মাওলানা সা’দ পন্থি গ্রুপের মুসল্লি।

দেওবন্দ কওমিপন্থি মাওলানা জুবায়ের ও তাবলীগ জামাতের কেন্দ্রীয় শূরার সদস্য দিল্লীর নিজামুদ্দিন মারকাজের জিম্মাদার মাওলানা মোহাম্মদ সা’দ কান্ধলভি পন্থিদের মধ্যে কয়েক বছর যাবত্ বিরোধ চলছে। এ বিরোধের কারণে ইতিপূর্বেও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ পরিস্থিতিতে দুই পক্ষকে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ইজতেমা করার জন্য সরকার সিদ্ধান্ত দিয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় দুই পক্ষকে জেলায় এবং ইজতেমা মাঠে ভিন্ন ভিন্ন তারিখে দুই ভাগে জামাত আয়োজনের সিদ্ধান্ত দেয় সরকার। দেশের সব জেলায় এমনকি কাকরাইল মসজিদেও দুইভাগে কার্যক্রম চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রতি বছরের মতো এবারও সাদ অনুসারীরা বিশ্ব ইজতেমা শুরুর নির্ধারিত সময়ের আগে টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে জোড় ইজতেমা অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেন। সে অনুযায়ী ৩০ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫ দিনব্যাপী জোড় ইজতেমা অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয়। এ কারণে তারা ইজতেমা মাঠে অবস্থান নেওয়া শুরু করে। তবে সা’দপন্থিদের ঘোষণার পর জুবায়েরপন্থি কওমি মাদ্রাসার বিপুলসংখ্যক ছাত্র গত কয়েকদিনে ইজতেমা মাঠে এসে অবস্থান নেয়। তারা সা’দপন্থিদের কৌশলে মাঠ থেকে সরানোর চেষ্টা করে এবং মাঠ থেকে সরে যেতে বাধ্য করে। এ নিয়ে গত দুই দিন ধরে ইজতেমা মাঠে উত্তেজনা বিরাজ করছিল।

মাওলানা সা’দ-এর অনুসারী তাবলিগ জামাতের মুসল্লিরা শনিবার ফজরের নামাজের পর থেকে পুনরায় ইজতেমা মাঠে প্রবেশের চেষ্টা করেন। এ সময় ভেতরে থাকা মাওলানা জুবায়ের-এর অনুসারী তাবলিগ জামাতের মুসল্লি ও মাদ্রাসার ছাত্ররা তাদের ভেতরে প্রবেশে বাধা দেয়। এতে সা’দ অনুসারীরা টঙ্গী-কামারপাড়া সড়কে অবস্থান নিয়ে তাসবিহ তাহলিম ও বয়ান করছিলেন। এ সময় পুলিশ সদস্যরা ভেতরে ঢুকে জুবায়ের অনুসারীদের সঙ্গে কথা বলতে থাকেন। বেলা ১১টার দিকে ইজতেমা মাঠের টয়লেটের ছাদ থেকে জুবায়ের অনুসারী ছাত্ররা বাইরে অবস্থান নেওয়া সা’দ অনুসারীদের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। এতে সা’দ অনুসারীরা তাদের ওপর নিক্ষেপ করা ইটপাটকেল দিয়ে পাল্টা জুবায়ের অনুসারীদের ওপর হামলা করে। একপর্যায়ে সা’দ অনুসারীরা ইজতেমা মাঠে প্রবেশ করলে দু’পক্ষের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষে মুসল্লি ও মাদ্রাসা ছাত্ররা আহত হয়।

বেলা সাড়ে ১২টার দিকে মাওলানা সা’দপন্থি মুসল্লিরা জোরপূর্বক ইজতেমা ময়দানে প্রবেশ করতে চাইলে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। একপর্যায়ে দুই গ্রুপের মধ্যে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বেলা ১টার দিকে ইজতেমা মাঠে সংঘর্ষ শুরু হলে বিক্ষিপ্তভাবে তা টঙ্গীর চেরাগ আলী মার্কেট, উত্তরা আব্দুল্লাহপুর, টঙ্গী বাজার, মিলগেইট, কামারপাড়া এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এতে উভয় পক্ষের দেড় শতাধিক মুসল্লি আহত হয়েছে। আহতদের টঙ্গীর শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতাল, টঙ্গী বেসরকারি হাসপাতাল ও উত্তরার বাংলাদেশ মেডিকেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আবার অনেকেই প্রাথমিক চিকিত্সা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়ে চলে গেছেন।

গাজীপুরের সিভিল সার্জন ডা: সৈয়দ মো: মঞ্জুরুল হক জানান, দুপুর ২টা পর্যন্ত টঙ্গীর শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে ১৩৮ জন মুসল্লিকে চিকিত্সা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২২ জনকে ঢাকায় বিভিন্ন হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যারা চিকিত্সাধীন রয়েছেন, তাদের মধ্যে আব্দুর রাজ্জাক (৩০), আবু তালেব (৩৫), নূর হোসেন (১৫), মাওলানা মাসুদুর রহমান (৩৫), ইমরান (৩৫), সফিকুল ইসলাম (৩০), মো. শামীম মাতব্বর (৪৯), মো. শেখ আব্দুর রব (৮৪), রাসেদ (৩০), মো. জালাল খান (৫০), রুস্তম আলী (৪০), সোলায়মান আকন্দ (৫৫) গুরুতর বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে দুপুরে তাবলিগ জামাতের দুই গ্রুপের হামলার ঘটনার পর বিকাল তিনটার দিকে গাজীপুর জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ যৌথভাবে তাবলিগ জামাতের উভয় গ্রুপের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে ইজতেমা ময়দানে এক বিশেষ জরুরি সভা করে। বৈঠকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে উভয় গ্রুপকে ইজতেমা ময়দান থেকে সরে যেতে অনুরোধ জানানো হয়। পরে উভয় পক্ষ সেই সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে বিকালের মধ্যেই ইজতেমা ময়দান থেকে তাদের অনুসারীদের সরিয়ে নেন।

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মোহাম্মদ হুমায়ূন কবীর জানান, ইজতেমা ময়দানের বিবদমান দুই গ্রুপের নেতাদের নিয়ে প্রথমে ইজতেমা ময়দান সংলগ্ন মিল গেইট মসজিদে পরে ইজতেমা মাঠে বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে মাওলানা সা’দপন্থিদের পক্ষ থেকে মাওলানা আশরাফ হোসেন এবং মাওলানা হাফেজ জুবায়েরপন্থিদের পক্ষ থেকে মাওলানা নূরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের জানানো হয়, জাতীয় নির্বাচনের আগে ইজতেমা আয়োজন করা যাবে না এবং নির্বাচনের পর আলোচনা করে ইজতেমা অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ ছাড়া শনিবার বিকাল চারটার মধ্যে দুই গ্রুপের সকল মুসল্লির মাঠ ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত মেনে নেন তাবলিগ জামাতের দুই অনুসারী গ্রুপ।

নিহত ইসমাইলের ছেলে জাহিদ হাসান জানান, তার বাবা মুন্সীগঞ্জে আলুর ব্যবসা করতেন। তিনি সা’দপন্থি। সা’দ বিরোধীরা মাঠে অবস্থান করে রাখার মধ্যেই তিনি মাঠে ঢোকার চেষ্টা করছিলেন। ধাক্কাধাক্কির সময় তার বাবা সামনে ছিলেন। পরে সা’দ বিরোধীরা ধারালো কিছু দিয়ে তার বাবার মাথায় আঘাত করে।