সামাজিক মাধ্যমেই যত অসামাজিকতা

‘ভিন্ন মত’কে স্বীকৃতি জানিয়ে মাওসেতুং বলেছিলেন, ‘শত ফুল ফুটতে দাও।’ কিন্তু বর্তমানে স্যোশাল মিডিয়ার অবয়ব জুড়ে শত ফুলের বদলে শত ‘হুল’ ফুটছে। রুচিশীল তর্ক সেখানে বিরল। মতভিন্নতা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পর্যবসিত হয় গালমন্দে। ভিউ বাণিজ্যের গর্তে পড়ে মানুষ হারাচ্ছে বিবেক আর সময়। জন্ম নিচ্ছে বিচ্ছিন্নতা ও অসহিষ্ণুতা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছে টিকটক। 

গান কিংবা রম্য সংলাপের সঙ্গে নিজের ব্যাঙ্গাত্মক মুখভঙ্গি আর ঠোঁট মিলিয়ে ১৫ থেকে ৬০ সেকেন্ডের ভিডিও বানানোর নাম টিকটক। বেড রুম থেকে বাড়ির ছাদ, স্কুল আঙ্গিনা থেকে সদর ঘাট! কোনো স্থানই বাদ নেই টিকটকারদের হাত থেকে। টিকটকের এই খেলায় মেতে আছে শিক্ষার্থী, শিল্পী, তারকা, চিকিৎসক থেকে শুরু করে গৃহকর্মী, ড্রাইভারসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

44

ব্যাঙ্গাত্মক রম্য সংলাপের আড়ালে আসলে কী হচ্ছে টিকটকে? অ্যাপসটি নিয়ে ঘাটাঘাটি করলে দেখা যায়, অশ্লীলতার এপিঠ আর ওপিঠ হলো এই মাধ্যমটি। শরীরের বিশেষ অংশ প্রদর্শন, অদ্ভুত ও অযৌক্তিক সংলাপ, গুজব বা উদ্ভট চুলের প্রদর্শনসহ নানারকম পাগলামির মাধ্যমে কে কত ভিউ আর ফলোয়ার বাড়াতে পারে তার এক অঘোষিত প্রতিযোগিতা। স্যোশাল মিডিয়া ব্যবহারে যে কিছু নির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে, রয়েছে কিছু শিষ্টাচার সে সম্পর্কে এই উদ্ভট টিকটকারদের নূনতম কোনো জ্ঞান নেই। এ যেন যাচ্ছে তাই করার উন্মোক্ত প্ল্যাটফর্ম।

গুলশানে বসবাস করা এক রাজনীতিবিদ ও তার কর্মজীবী স্ত্রী দুজনকেই কর্মব্যস্ততা কারণে বাসার বাহিরে থাকতে হয়। শিশু সন্তান ও বাড়ির দেখাশোনার দায়িত্বে থাকেন কেয়ারটেকার, নিরাপত্তা কর্মী, ড্রাইভার ও গৃহকর্মীরা। মালিকের অনুপস্থিতে এই গৃহপরিচারিকারা মেতে উঠেন টিকটিকে ভিডিও বানানোর প্রতিযোগিতায়। মালিকের ব্যক্তিগত বাসস্থান, গাড়ি, এমন কি শিশুপুত্রকে ব্যবহার করেন এই সব টিকটিক ভিডিওতে। এতে করে মালিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা উন্মুক্ত হয়ে পরে স্যোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে। এই টিকটকের মাধ্যমে ড্রাইভার ও গৃহকর্মীর মধ্যে এক ধরনের অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠে। গৃহপরিচারিকাদের এই অপকর্মের আরেক গৃহকর্মী ও মূল ফটকের নিরাপত্তা কর্মীও জড়িত। পরবর্তীতে পুরো ঘটনা জানতে পেরে বাড়ির মালিকের চক্ষু তো চড়ক গাছে। 

BeFunky-collage (5)

অথচ এই গৃহকর্মীরা জানেই না, কারো সন্তান এবং ব্যক্তিগত বাসস্থান, গাড়ি, জিনিসপত্রে অনুমতি ছাড়া স্যোশাল মিডিয়াতে প্রকাশ করা অপরাধ। স্যোশাল মিডিয়া ব্যবহারের যে শিষ্টাচার রয়েছে, এ বিষয়ে এই শ্রেণির ব্যবহারকারীদের নূন্যতম ধারণাই নেই। অথচ স্যোশাল মিডিয়াতে এই শ্রেণির ব্যবহারকারীর সংখ্যাই বেশি। 

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬ (২০১৩ সংশোধিত) ধারা ৫৭ এ বলা হয়েছে, অন্যের ব্যক্তিগত পরিবেশ অনুমতি ছাড়া কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো অনলাইন বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে প্রকাশ বা সম্প্রচার করে, যার দ্বারা মানহানি ঘটে বা ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়, তাহলে এগুলো হবে অপরাধ। এর শাস্তি সর্বোচ্চ ১৪ বছর কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন ৭ বছর কারাদণ্ড এবং ১ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা। উভয় (কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড) দণ্ড দেওয়ার বিধানও এই আইনে রয়েছে।  তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন ২০০৬ (সংশোধনী ২০১৩)-এর আওতায় থানায় এজাহার দায়েরের মাধ্যমে মামলা করা যাবে।

সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে সর্বস্তরের মানুষই কিন্তু এখন পারফর্মার। শাহরুখ খান থেকে শুরু করে হিরো আলম, টিকটক অপু সকলেই পারফর্মার। নিজের ছোট্ট গন্ডিতে বসে নিজেকে রাজা ভাবার এই সুযোগ কি হাতছাড়া করা যায়? তাই ঘরে ঘরে এখন গায়ক, নায়ক, সংবাদকর্মী। সবাই যদি পারফর্ম করে দর্শকটা আসলে কে হবে? ফলে নতুন এক শ্রেণির উৎপত্তি হলো, সেটা হল ট্রলবাজ শ্রেণি। এরা যেকোনো ভালো উদ্যোগকে সযত্নে এড়িয়ে গিয়ে ওঁত পেতে থাকে ট্রল করবার যোগ্য ঘটনা বা কন্টেন্ট এর অপেক্ষায়।

66

২০১৬ সালে চীনে টিকটকের জন্ম। অতিমাত্রায় টিকটকের ব্যবহার যে একটি সামাজিক ব্যাধি তা আগেই টের পেয়েছিলো চীন, তাই সেই চীনেই টিকটক এখন নিষিদ্ধ। অথচ বাংলাদেশের রাস্তাঘাট অলগলিতে এই টিকটকারদের শুটিংয়ের যন্ত্রণায় এলাকাবাসী বিরক্ত। এদের কারণে রাস্তাঘাটে হাঁটাই যায় না। যেখানে সেখানে এরা শুটিং করতে নেমে যায়। রাজধানীর আগারগাঁও একটি রাস্তা আছে তার নামই হয়ে গেছে ‘টিকটক পাড়া’।

ভাইরাল হওয়ার এই অসুস্থ প্রতিযোগিতায় কারণে সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্টটাও অনেক বেড়ে গেছে। ক্রাইম বেড়েছে প্রচুর। টিকটকারদের আছে নানা রকম গ্যাং বা গ্রুপ। যোগাযোগের জন্য রয়েছে ম্যাসেঞ্জার চ্যাট গ্রুপ। যেখানে নানারকম অবৈধ কর্মকাণ্ডের আলাপ আলোচনা চলে রাতভর। অভিযোগ আছে, টিকটক ব্যবহার করে অনেকেই জড়িয়ে পড়েছেন চাঁদাবাজি, মাদকসহ নারীসংক্রান্ত নানা অবৈধ কাজে। টিকটক পার্টির নামে জুয়ার আসর, মাদক কেনাবেচা আর সেবনের কার্যক্রমও চলে হরহামেশা, গড়ে উঠছে কিশোর গ্যাং ।  

55

টিকটক এক দিকে যেমন অশ্লীল কর্মকাণ্ডের বিস্তার ঘটাচ্ছে অন্য দিকে তৈরি করছে মানসিক বৈকল্য। অর্থহীন এ প্রতিযোগিতায় নিজেকে এগিয়ে রাখতে অনেকে নিচ্ছেন জীবনের ঝুঁকি। ঘটেছে প্রাণহানির ঘটনাও। অন্যের মনোযোগ আকর্ষণ করে নিজেকে আলোচনা আনার এমন প্রবণতাকে ভয়াবহ মানসিক অসুস্থতা বলছেন মনোবিদরা। 

এ প্রসঙ্গে  জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, টিকটকে আসক্তি একটা মানসিক রোগ। আর মানসিক রোগ মানেই নানা ধরনের সংকট বেড়ে যাওয়া। টিকটকারদের কারণে সমাজে নানা ধরনের অপরাধ অনেক বেড়ে গেছে। তারা নিজেরাও মানসিক সংকটে ভুগছে তেমনি সমাজেও নানা অশান্তি, ঝামেলা আর বিবাদ তৈরি করছে। তাই তাদের সুস্থ করতে হলে উপযুক্ত চিকিৎসা করাতে হবে। মনো চিকিৎসা ও কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে তাদের সুস্থ করা সম্ভব। 

কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই বাংলাদেশ থেকে পরিচালিত হয় না। ফলে প্রতিষ্ঠাতারা তাদের নিজ দেশের আইন-কানুন মেনে এগুলো পরিচালনা করে। সব চেয়ে দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রবেশের জন্য কারও পরিচিতি নিশ্চিত করার প্রয়োজন হয় না। এটা না থাকার ফলে আমাদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলো কাউকেই সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পারে না।

এতক্ষণ তো সমস্যা দেখালাম। উত্তরণের পথ কি নেই তাহলে? পথ একটাই, আরেকটি রেনেসাঁ। এ্যাপ্রিসিয়েশন বা প্রশংসা না থাকলেও নিজের ভালো কাজগুলোকে জারি রাখতে হবে। ১৫ শতকের অন্ধকার যুগে দ্য ভিঞ্চি বা মাইকেল অ্যাঞ্জেলোরা যদি কাজ না করে অ্যাপ্রিসিয়েশনের আশায় বসে থাকতেন, পৃথিবীর শিল্পমাধ্যমের এই যুগান্তরারী উন্নয়ন কি আদৌ সম্ভব হতো? মানতে হবে আমরা ইতিমধ্যেই ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত। ক্রমেই সত্য-সুন্দরের সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে আসছে। তবুও অটল বিশ্বাসের আলোকবর্তিকা হাতে কাউকে না কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতেই হবে।