মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ ও নির্যাতনের ভয়াবহতা দীর্ঘ ছয় বছরেও ভুলতে পারেনি বেঁচে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা। কক্সবাজারের ক্যাম্পে অবস্থানরত মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত লাখ লাখ রোহিঙ্গারা নিজ বাসভূমে ফেরার আশায় দিন গুনছেন। বেঁচে যাওয়া রোহিঙ্গারা স্বজন হারানো ন্যায়বিচারের দাবিতে স্বোচ্চার। তাদের আশা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর অপরাধী সদস্যদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে। গত শুক্রবার কক্সবাজারের কুতুপালং ক্যাম্প ও আশেপাশের এলাকায় রোহিঙ্গা সম্প্রদায় ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নিধন অভিযানে বেঁচে যাওয়া রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলাপ করে এই মত পাওয়া যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের (সিজিএস) আয়োজনে কয়েকজন গণমাধ্যম প্রতিনিধি ও গবেষকদের একটি টিম রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। কুতুপালং ক্যাম্পে রোহিঙ্গা ঢলের ছয় বছর পূর্তিতে আয়োজিত রোহিঙ্গা সমাবেশ দেখে সাংবাদিক ও গবেষকদের এই প্রতিনিধি দল। মোট ১২টি স্থানে প্রায় ২৫ হাজার রোহিঙ্গা এসব সমাবেশে যোগ দেয়। সিজিএসের পরিচালক অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন এই প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৬৮ বছর বয়সী আব্দুল জব্বার জানান, ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনী মংডুতে তার ছেলেকে হত্যা করে। প্রথমে গুলি করে তারপর মাথার দুই পাশে পেরেক ঠুকে দেয়। তখন প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেন তিনি। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্মমতার বর্ণনা দেন ৫৭ বছর বয়সী শফিউর রহমান। তার বাবা ও ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। ফায়াজুল হকের বয়স ৪৪ বছর। তিনি ৬ বছর আগে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার বর্ণনা দিয়ে বলেন, আমার সন্তান সম্ভাবা স্ত্রী ও দাইমা, শ্বাশুড়িসহ সাত জনকে সেনারা হত্যা করেছে। পরিবারের বাকি চারজনকে নিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিই। আমি পরিবার শূন্য, যারা এখনও অবশিষ্ট আছে তাদের নিয়ে ফিরে যেতে চাই। এটাই জীবনের শেষ চাওয়া।
নূরজাহান নামে এক নারী রোহিঙ্গা বলেন, সেদিন যেভাবে আমাদের কেটেছে, মেরেছে তা এখনো চোখে ভাসছে। এখন নিরাপত্তা না দিলে আমরা কীভাবে যেতে পারি। তিনি বলেন, সভ্য দুনিয়া যদি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে তাহলে আমরা যেতে চাই। শামসুন্নাহার, আমেনা বেগম, রাজিয়া বেগমেরও একই মত।
নিহত রোহিঙ্গা নেতা মহিবুল্লাহর স্থলাভিষিক্ত আরাকান রোহিঙ্গা সোসািটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের নেতা ডা. মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, রোহিঙ্গার সংখ্যা লাখে লাখে বাড়ছে। এভাবে চললে কয়েক বছরে রোহিঙ্গার সংখ্যা দ্বিগুণ হতে বাধ্য। বাংলাদেশে তাদের জায়গা হবে না। তাই আমরা আমাদের নিজ বাসভূমে ফিরে যেতে চাই। আন্তর্জাতিক মহলকে মিয়ানমারের ওপর চাপ দিতে হবে। অপর রোহিঙ্গা নেতা সাইয়েদ উল্লাহ বলেন, আমাদেরকে রাখাইন রাজ্যে আমাদের নিজ বাড়িতে ফেরত পাঠাতে হবে। কোনও মডেল ভিলেজে পাঠালে হবে না।
জাতিসংঘের মানবাধিকার সংক্রান্ত হাইকমিশন রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নিষ্ঠুরতাকে জাতিগত নিধন বলে অভিহিত করেছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) রাষ্ট্র হিসেবে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে এবং ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্টে (আইসিসি) দমন-পীড়নে অংশ নেওয়া মিয়ানমারের সেনা ও বেসামরিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা মামলার কাজও চলছে।
মিয়ানমারের বর্তমান সামরিক জান্তা আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে থাকায় পাইলট প্রকল্পের অধীনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর জন্য কিছুটা আগ্রহ দেখাচ্ছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় সহায়তার মাধ্যমে পদক্ষেপের চিন্তা করা হলেও পশ্চিমারা মনে করে, প্রত্যাবাসনের মতো নিরাপদ পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি।