তৃতীয় বিশ্বের দেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা ললাটের লিখনে পরিণত হইয়াছে। বর্তমানে নাইজারে যাহা ঘটিতেছে, তাহা দেখিয়া যে কোনো বিবেকবান মানুষ বলিবেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতি হইতে পরিত্রাণের কি কোনো পথ নাই? চার দেশের রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করা হইলেও প্রভাবশালী এই সকল দেশের শাসকরা বলিতেছেন, তাহারা ইহা মানেন না। কেননা, যেই সরকার জবর দখলদারি ও অবৈধ, তাহার বহিষ্কারাদেশের কোনো মূল্য নাই। অবৈধতা, অন্যায়-অনিয়ম-অবিচার, গুম, খুন, সন্ত্রাস, জুলুম-নিপীড়ন, দুর্নীতি-লুটপাট ইত্যাদির আশ্রয় লইয়া শেষ পর্যন্ত কেহ পার পাইতে পারে না। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির রাজনীতির মাঠ সাংবৎসরিক এই জন্যই উত্তপ্ত থাকে। এই সকল দেশের জনগণ কবে এমন অরাজকতা হইতে মুক্তি পাইবেন তাহা কাহারো জানা নাই।
উন্নয়নশীল বিশ্বের কোনো কোনো দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত এমন পর্যায়ে উপনীত হয় যে, সেইখানে দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও সংঘর্ষ অনিবার্য হইয়া উঠে, সেইখানে কথায় কথায় একে অপরকে হুমকিধমকি দেওয়া হয়। যাহার হুমকি দেওয়ার ক্ষমতা নাই, তাহারাও হুংকার ছাড়েন। এই সকল দেশে বামপন্থিদের মতো চলে নিশ্চিহ্নের রাজনীতি, দমন-পীড়ন ও জেল-জুলুমের রাজনীতি। একে অপরকে দেখিয়া নেওয়া ও শেষ করিয়া দিবার ভয় বা হুমকি দেওয়া হয় কথায় কথায়, উঠিতে ও বসিতে। মিছিলে-মিটিংয়ে যে ডাইরেক্ট অ্যাকশনের স্লোগান দেওয়া হয়, তাহাও খুবই বিপজ্জনক। এই সকল দেশের বিসমিল্লায় গলদ তথা রাজনীতিটা আগে ঠিক না হওয়ায় তাহারা কখনো মাথা উঁচু করিয়া দাঁড়াইতে পারে না। বরং বিভেদ-বিসংবাদ, মারামারি-কাটাকাটি, হানাহানি ইত্যাদির কারণে দেশের মানুষের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কখনো দূর হয় না। নির্বাচন আসিতেই নিজ দলীয় নেতাকর্মীদের সহিতও অনেক সময় কথা বলা হয় হুমকির ভাষায়। বলা হয় যে, বিরোধীপক্ষ ক্ষমতায় আসিলে তাহারা প্রাণে বাঁচিয়া থাকিতে পারিবে না। তাহার অর্থ কি এই যে, আর কোনো উপায় নাই, নির্বাচনে দলকে যে করিয়াই হউক জিতাইতে পিছুটান দেওয়া যাইবে না? এই রকম মনোভাব শেষ পর্যন্ত আরো রেষারেষির জন্ম দেয়।
স্বভাবতই এখানে প্রশ্ন উঠে, তাহারা কী এমন অপরাধ করিয়াছেন যে, তাহাদের নিশ্চিহ্ন করিয়া দেওয়া হইবে? কী ভয়াবহ কথা! এই সকল কথার ন্যূনতম মানে বুঝিলেও যে কাহারও শরীর শিহরিত হইয়া উঠিবে। জীবনের শেষ প্রান্তে আসিয়া যখন কেহ এমন কথা উচ্চারণ করেন, তখন সাধারণ মানুষের মনে এমন প্রশ্ন উঠাটা অস্বাভাবিক নহে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি এই অবস্থায় পৌঁছায় কেন? অবশ্য এই অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি হইতে শিক্ষা গ্রহণ করিবার ও নিজেদের শুধরাইবার সময় যে একেবারে শেষ হইয়া আসিয়াছে—তাহা নহে। কিন্তু ইতিহাস হইতে তেমন কেহই শিক্ষা গ্রহণ করেন না। আবার উন্নয়নশীল দেশের নেতারা শেষ পর্যন্ত কতটা নিজেদের শুধরাইতে পারেন, তাহাও গভীর চিন্তাভাবনার বিষয়। তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশেই ক্ষমতার মদমত্তে শত শত নিরপরাধ মানুষকে হত্যা কিংবা গুম করিবার ঘটনাও ঘটে। এই অবস্থায় তাহাদের পিছু হটিবার সুযোগ থাকে কম। আবার ঐ সকল দেশে এমন অবস্থা তৈরি হয়, যাহাতে মানুষের প্রতিবাদ করিবারও উপায় থাকে না।
নাইজেরিয়ার শাসকরা এমন কী অপরাধ করিয়াছেন যে, আজ তাহাদের দুর্বিষহ জীবন যাপন করিতে হইতেছে? আবার এখন যাহারা জোরপূর্বক ক্ষমতায় আছেন, তাহারাও যে একসময় একই দোষে সাব্যস্ত হইবেন না, তাহা নিশ্চয়তা দিয়া বলা যায় না। উন্নয়নশীল দেশের মানুষ সত্যিই অসহায় ও দুর্ভাগা। ইহার কার্যকারণ গভীরভাবে বিশ্লেষণ করিয়া আত্মসমালোচনা না করিলে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে কখনোই শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হইবে না, নিশ্চিত হইবে না তাহাদের জীবনমানের টিকসই উন্নয়নও।