বিভিন্ন ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা

গত সপ্তাহের বুধবার রাতে আসন্ন ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের রিপাবলিকান দলীয় সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে প্রথম ডিবেট হয়ে গেল। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তার ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সাবেক গভর্নর মাইক পেন্স, ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মিট রমনির রানিংমেট মানে ভাইস প্রেসিডেন্ট, পরবর্তী সময়ে ট্রাম্পের জাতিসংঘবিষয়ক রাষ্ট্রদূত, সাবেক গভর্নর ইন্ডিয়ান বংশোদ্ভূত নিকি হেইলি, নিউ জার্সির সাবেক গভর্নর, স্বনামধন্য অ্যাটর্নি ও অত্যন্ত সুপরিচিত রাজনীতিবিদ ক্রিস ক্রিস্টি, বয়সে অপেক্ষাকৃত তরুণ জরিপে ট্রাম্পের পর দ্বিতীয় স্থান অধিকারী প্রার্থী ফ্লোরিডার গভর্নর রনডি সেন্টিস, সাবেক গভর্নর আশা হাটসিনসনসহ আরো এক ভারতীয় বংশোদ্ভূত তরুণ ব্যবসায়ী হার্ভার্ড গ্র্যাজুয়েট ও ইয়েলের আইনের ডিগ্রিধারী ইমিগ্র্যান্ট পিতামাতার সন্তান পুরো ডিবেটের সবার টার্গেট বা আকর্ষণ এবং প্রথানুযায়ী ডিবেটের ভোটে প্রথম স্থান অধিকারী প্রার্থী বিলোনিয়ার বিবেক রামাসোয়ার্মি। সে হিসাবে তিনিই জরিপের ভোটে ৩ নম্বরে আছেন বলা যায়। ট্রাম্প ছাড়া মোট আটজন প্রার্থী এই ডিবেটে অংশ গ্রহণ করেন। রিপাবলিকান দলের ৯ জন প্রার্থীর মধ্যে দুই জনই ভারতীয় বংশোদ্ভূত, ইমিগ্রেন্ট পিতামাতার সন্তান নিকি হেইলি এবং মাত্র ৩৮ বছর বয়স্ক বিবেক রামাসোয়ার্মি। এ ঘটনাও নিঃসন্দেহে ইমিগ্র্যান্ট ও তাদের পরবর্তী প্রজন্মের আমেরিকানদের স্বপ্নজয়ের আরো একটি উজ্জ্বল মাইলফলক।

আমেরিকা তার অগ্রসরমান ঊর্ধ্বগতির অর্থনীতির ওপর প্রথম নির্মম বাধা বা হোঁচট খায় নাইন ইলেভেন বা সেপ্টেম্বর ইলেভেনের ঘটনার মাধ্যমে। আমি তখন নিউইয়র্কের ম্যানহাটন শহরের ডাউন টাউনের এক ল অফিসে বিকাল থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত কাজ করে দিনে ল স্কুলে ক্লাস করতাম।

প্রায় ১০-১৫ মিনিট পায়ে হেঁটে সাবওয়েতে উঠতে হতো। একা একা রাস্তায় হাঁটতাম আর ভাবতাম, এই সেই নিউ ইয়র্ক সিটি, যা কখনো ঘুমায় না বলে শুনতাম, আজ তা স্বচক্ষে দেখছি। শত শত গাড়ি সারা রাতই চলত, অনেকেই আবার আমার মতো হেঁটে হেঁটেই যার যা করার করত। একই রকম কর্মব্যস্ত রাত আর দিন। একই সাজসজ্জা, রাতের বার-রেস্তোরাঁগুলোও আলোঝলমল করত। অনেক বাঙালি, ভারতীয় বা পাকিস্তানি পেলেও কথা হওয়ার সুযোগ ছিল না। যার যার মতো গন্তব্যে ছুটছে তো ছুটছেই। বাস বা ট্রেনে বসেই বাকি ১০ জনের মতো ক্লান্তির শরীর এলিয়ে দিয়ে একটুখানি বিশ্রামের জন্য খানিক চোখ বুঝে ঝিমিয়ে নেওয়া। অল্প কজন যে বই-পত্রিকা পড়ত না, তা কিন্তু নয়। তবে কোনো গালগপ্পো শোনা যেত না। দিনের সকাল আর বিকেলের ট্রেন-বাস থাকত লোকে লোকারণ্য। মাঝামাঝি সময়ে কেউ কেউ ফোনে কথা বলতে বলতে যেত। রাতে বাসায় ফেরার সময় যখন সাবওয়ে ট্রেনের জন্য হাঁটতাম, তখন আমার কাছে সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগত হোটেল-রেস্তোরাঁর অতিরিক্ত খাবার গার্বেজ করা দেখে।

 বিভিন্ন সূত্রের রিসার্চে দেখা যায়, আমেরিকায় প্রতি বছর ১১৯ বিলিয়ন পাউন্ডের খাবার নষ্ট হয় বেশি হয়ে যাওয়া খাবার ফেলে দেওয়ার মাধ্যমে, যার মূল্য ৪০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি, যা কিনা সেই সময়ের কোনো কোনো উন্নয়নশীল দেশের এক বছরের অর্থ বাজেটেরও বেশি।

আমেরিকান রাজনীতিবিদগণ দেশের জনগণের জন্য তাদের জাতির জনকদের প্রতিশ্রুতি লাইফ লিবার্টি ও পারস্যুট অব হ্যাপিনেসকে কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পেরেছেন বা চেষ্টা করেছেন, তা বিশ্লেষণ করে উপসংহারে পৌঁছানো যাবে না। তবে বর্তমান বিশ্ব রাজনৈতিক ও অসম অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতামূলক প্রেক্ষাপটে বলা যায় যে, অন্য সব দেশের মতোই আমেরিকাও তাদের নিজেদের বেশ কিছু সংকট কাটিয়ে উঠতে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন আছে। পৃথিবীর সর্ববৃহত্ অর্থনীতির দেশ হিসেবে তাদের নিজেদের চাপটাও বৃহত্। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন চড়াই-উতরাই পার হতে হয়েছে তাদের। ভেতরে-বাইরের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে এখনো তাদের প্রভাব অক্ষুণ্ন রাখাটা আদৌ সহজ সমীকরণের বিষয় নয়। বিশ্ব মোড়লিপনার প্রতিযোগিতায় তাদের শ্রেষ্ঠত্ব ঠিকিয়ে রাখতে এখনো যারপরনাই স্বচেষ্ট তারা।

আমেরিকান জনগণ বর্তমানে আমেরিকান হ্যাপিনেস অর্জনে সমাজ, রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে কী কী ধরনের প্রতিবন্ধকতা, প্রতিকূলতা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে এবং এর প্রভাব কতটুকু আছে, সে বিষয়ে আলোকপাত করার যথেষ্ট অবকাশ আছে।

আমেরিকান পারসুয়েট অব হ্যাপিনেসের প্রধান বাধাসমূহ কী হতে পারে? রেসিজম বা বর্নবাদ, পুঁজিবাদ, সেপ্টেম্বর ইলেভেনের অ্যাট্যাক, ইরাক ও আফগানিস্তান দখল বা ক্ষমতা পরিবর্তন, নিজেদের গণতান্ত্রিক প্রতিবন্ধকতা, ট্রাম্পের প্রভাবে হোয়াইট সুপ্রেমেসির উত্থান, ৬ জানুয়ারির মতো ঘটনা, নাকি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে নাক গলানো ও মাত্রারিক্ত সাহায্যদান, অন্য দেশের রাজনীতিতে অত্যধিক মাথা ঘামানো, ইমিগ্রেশন বা বিদেশি ছাত্র, শ্রমিক, কর্মচারী, কর্মকর্তা নিয়ে আসা, অতিরিক্ত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যয়, শিশু-কিশোরদের মাদকাসক্তি না অবাধ অস্ত্র প্রাপ্তি। এ ব্যাপারে বিস্তর আলোচনা করে একক সিদ্ধান্তে আসাও সহজসাধ্য নয়।

সেপ্টেম্বর ইলেভেনের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোর কথা বিশেষ করে আমার মতো যারা নিউ ইয়র্ক শহরে বসবাস করতেন, তারা কোনো দিন ভুলবে না। ভুল বোঝাবুঝি বা ঝগড়া-ফ্যাসাদের জন্য নয়, ভয়-আশঙ্কা আর মানুষের বিপদে মানুষকে এগিয়ে এসে সাহায্য করার প্রবণতা, একে অন্যের দুঃখ-দুর্দশার ভাগীদার হতে ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে বিপদ মোকাবিলায় নিউ ইয়র্ক যে উদাহরণ ও সাহসিকতা দেখিয়েছে, তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অর্জনের চেয়েও বেশি ছিল বলে অনেকের ধারণা। অল্প সামান্য বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া অফিস ব্যবসা-বাণিজ্য কাজ যথারীতি শুরু হলেও আগের মতো সেই জৌলুশ সারা রাত না ঘুমানোর যে কর্মযজ্ঞ প্রতিভাত হতো তা যেন রাতারাতি পরিবর্তিত হয়ে যায়। রাত ১২টায় হেঁটে আসতে যে ব্যবসা দোকানপাট হোটেল-রেস্তোরাঁ আলোঝলমল ও লোকে লোকারণ্য থাকত, তা যেন হঠাত্ করেই ম্লান হয়ে গেল। কিছুদিন পরই রাতের অফিসগুলোর কাজ বন্ধ হয়ে গেল। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যে দোকান বা চেইন জিনস বা সু স্টোর প্রতিদিন গড়ে ৫০ হাজার ডলার থেকে ১ লাখ বা তারও বেশি বেচাকেনা করত, তার বেচাকেনা রাতারাতি নেমে চলে আসে ২০ বা ৩০ হাজারে। অনেক মানুষ রাতারাতিই কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে যায়।

চতুর্দিকে টেররিস্ট দমনের প্রক্রিয়া, ব্যাপক কর্মযজ্ঞ, বিভিন্ন দেশ ও জনগোষ্ঠীর সমর্থন আদায়সহ ইরাক আক্রমণ, সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে তা দখলে নিয়ে আবার পুনর্গঠন, সার্বিক কার্যক্রম চালানো ছিল অতিশয় চ্যালেঞ্জের কাজ। অন্যদিকে বিশ্বজনমত ধরে রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার তীব্র গতিতে বিস্মিত হয়েছি। বিশ্বব্যাংক, এডিবি বা জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশে টেররিস্ট দমনের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে আর্থিক সহায়তাদান, পরবর্তী সময়ে আবার আফগানিস্তান দখল ও এর পুনর্গঠন ও পরিচালনাসহ অনেক কাজই করতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করতে হয়েছে আমেরিকার।

লেখক :বাংলাদেশি আমেরিকান, আইনজীবী