টেকসই নগরায়ণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে চ্যালেঞ্জ

জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ১১তম অভীষ্টে টেকসই নগর ও জনপদের কথা উল্লিখিত আছে। আর জাতিসংঘভুক্ত দেশ হওয়ার সুবাদে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ। ভারসাম্যপূর্ণ ও ভালোভাবে বসবাসের জন্য নিরাপদ ও টেকসই নগরের গুরুত্ব অপরিসীম। সময়ে সময়ে পরিবর্তিত পরিবেশ পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সভ্যতায়ও ক্রমান্বয়ে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে, যার প্রভাব আমাদের আবাসনেও পড়তে আরম্ভ করেছে।

একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যসম্মত নিরাপদ আবাসস্থল নির্মাণ করা বর্তমানে অতীব প্রয়োজনীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর পেছনে সীমিত জায়গা, আর্থিক টানাপড়েন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি থেকে শুরু করে সার্বিক জীবনযাত্রার খরচের ঊর্ধ্বগামী প্রবণতা নিয়ামক হিসেবে ক্রিয়াশীল। এই দৃষ্টিকোণ থেকে অন্তত আমাদের নির্মীয়মাণ নগর ও জনপদ যদি সুষ্ঠু পরিকল্পনামাফিক উপায়ে গড়ে তোলা যায়, তাহলে সেটি টেকসই আবাসন হিসেবে আমাদের জন্য বড় সহায়ক ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে।

টেকসই উন্নয়নের স্বার্থেই টেকসই নগর-শহর ও জনপদ গড়ে তোলা দরকার। টেকসই নগরায়ণ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো—সবার জন্য নিরাপদ ও মূল্যসাশ্রয়ী গৃহায়ণ, মৌলিক সেবায় পর্যাপ্ত প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করা এবং বস্তিগুলোর মানোন্নয়নে পদক্ষেপ গ্রহণ করা। নগর ও জনবসতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যে চারটি বিষয়কে ভিত্তি করে অগ্রসর হতে হয় সেগুলো হলো—অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ, অভিঘাত-সহনশীল ও টেকসই। সুপেয় পানি, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, রাস্তাঘাট ও স্বাস্থ্যসেবাসহ অন্যান্য জনকল্যাণমূলক যাবতীয় বিষয় এর আওতাধীন।

সারা বিশ্বে উন্নয়নের ৮০ ভাগ জোগান দেয় শহর। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও শহরের ভূমিকা অনুরূপ বই ভিন্ন নয়। বাংলাদেশের জিডিপির ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ আসে শহরাঞ্চল থেকে। এটি একটি ক্রমবর্ধমান বাস্তবতা। অচিরেই সেটি ৮০ শতাংশে উন্নীত হওয়ার আশা করা হচ্ছে। পক্ষান্তরে এর পাশাপাশি নেতিবাচক দিকও রয়েছে। পুরো বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের মূল কারণ হলো কার্বন নিঃসারণ। আর এই নগরাঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত শিল্পকারখানাগুলো থেকেই ৭০ শতাংশ কার্বন নিঃসারণ হয়। কাজেই শহর একদিকে সমস্যাসংকুল এবং সেই সঙ্গে সম্ভাবনারও বটে।

২০১৬ সালে দেখা গেছে, মোট ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন জনগোষ্ঠী নগরাঞ্চলে বাস করছে, যা মোট বৈশ্বিক জনসংখ্যার ৫০ দশমিক ৫ শতাংশ। জনসংখ্যা বিশারদদের মতে, ২০৩০ সাল নাগাদ বৈশ্বিক জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশই বিভিন্ন বড় বড় নগর ও শহরে বসবাস করতে শুরু করবে। আর এর মধ্য দিয়ে গোটা বিশ্ব বা মানবগোষ্ঠী নগরায়িত হয়ে উঠবে। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পরিবেশ, অর্থনীতি এবং সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নগরায়ণ থেকে আকর্ষণীয় বা প্রভাবক হিসেবে আর কোনো প্রপঞ্চ লক্ষ করা যায় না। দ্রুত নগরায়ণের ফলে সৃষ্ট নব্য নগর জীবনব্যবস্থা এবং বৈচিত্র্য শুধু নতুন ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নিয়মনীতি ও সামগ্রিক ক্রমোচ্চতাকেই তৈরি করে না; বরং তা সামগ্রিক পরিবেশ, বিশেষ করে স্বাস্থ্যগত পরিবেশ এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করে থাকে।

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট-১১-এর খ-এ স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করে টেকসই ও অভিঘাত সহনশীল ভবন নির্মাণে স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিতে বলা হয়েছে। তাই এই কথা জোর দিয়ে দিয়ে বলতে চাই যে, যেসব ভবন-স্থাপনা এবং উড়ালসড়ক নির্মিত হচ্ছে, সেগুলো অনেক বেশি সহিষ্ণু হওয়া জরুরি। আর স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করা হলে প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ খরচ কমানো সম্ভব। এজন্য পরিকল্পনাবিদ ও বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ এ বিষয়টিকেও গুরুত্বারোপ করতে পারে।

অতি সম্প্রতি ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে যে, ঢাকার দুইটি সিটি করপোরেশনে মোট ওয়ার্ড রয়েছে ১২৯টি। এর মধ্যে ৪১টি ওয়ার্ডে কোনো খেলার মাঠ নেই। জরিপে আরো বলা হয়,  রাজধানীতে হাতে গোনা যে কয়টি মাঠ রয়েছে, তার বেশির ভাগই উন্নত এলাকায়। আর যেসব এলাকায় মাঠ রয়েছে, সেগুলোও শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি, জনপ্রতিনিধি, শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। নিরাপত্তার অভাব, পর্যাপ্ত সুবিধা ও পরিষেবার অভাবে নারী ও শিশুদের অধিকাংশ প্রবেশ করতে পারে না। সমীক্ষায় আরো উল্লেখ করা হয়েছে যে—নগর পরিকল্পনার মানদণ্ড অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরে ৭৯৫টি, চট্টগ্রামে ৫৪১টি, রাজশাহীতে ৩৭টি, খুলনায় ৬৫টি, সিলেটে ৪০টি ও বরিশাল নগরে ৪৫টি খেলার মাঠের ঘাটতি আছে। এতে এসব নগর এলাকার শিশু-কিশোর খেলাধুলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে স্বাভাবিক বিকাশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

ভূমিকম্প, জলাবদ্ধতা ও অগ্নিকাণ্ডের মতো অনভিপ্রেত দুর্যোগসমূহই নগরাঞ্চলের জন্য সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের। নগরাঞ্চলে ভূমিকম্পের ফলে অনেক সময় সড়কপথ, রেলপথ ও পাইপলাইন ভেঙে গিয়ে যাতায়াতব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। টেলিফোন লাইন, বড় বড় কালভার্ট, সেতু ও ভূপৃষ্ঠস্থিত বড় বড় বাঁধ ভূমিকম্পের দরূণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সুদূরপ্রসারী বিপর্যয়ের সৃষ্টি করে। অধিকন্তু সাম্প্রতিক সময়ে জলাবদ্ধতা দেশের কয়েকটি নগর এলাকাকে চরম ভোগান্তির মুখে ফেলেছে। সামান্য বৃষ্টির পানিতেই নগরীর রাস্তাঘাটগুলো পানিতে প্লাবিত হয়ে যায়। সবশেষ উদাহরণ হিসেবে আমরা চট্টগ্রাম নগরীর কথা বলতে পারি, যেখানে ঢাকনাবিহীন নালা খালে পড়ে নিয়মিত মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। গত দেড় মাসে শহরের বিভিন্ন এলাকা অন্তত আট বার পানিতে ডুবেছে। বৃষ্টি হলেই সেসব জায়গায় হাঁটুসমান পানি জমা হয়। পর্যাপ্ত স্ল্যাব না থাকায় নগরবাসীকে ঝুঁকি নিয়েই তখন চলাচল করতে হয়।

টেকসই নগরায়ণের আরেকটি অন্তরায় হলো অগ্নিকাণ্ড। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের তুলনায় নগরাঞ্চলের জনবসতির ঘনত্ব তুলনামূলক বেশি। ঢাকা শহরে রাসায়নিক গুদাম রয়েছে প্রায় ২৫ হাজার। এর মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার আবাসিক এলাকায় অবস্থিত। এসবের মাত্র ২ শতাংশ সিটি করপোরেশনের অনুমতি নিয়েছে। তাছাড়া প্রায় ৬০ শতাংশ ভবনে অগ্নিদুর্ঘটনার সময় জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা খুবই অপর্যাপ্ত।

সম্প্রতি, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)-এর একটি গবেষণা থেকে জানা যায় যে, শহরাঞ্চলে অধিকাংশ অগ্নিকাণ্ডের নেপথ্যে বৈদ্যুতিক ত্রুটি দায়ী। তাছাড়া ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বিদ্যুত্ ব্যবহার বা ওভারলোডিং, ত্রুটিপূর্ণ লাইন, নিম্নমানের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার, নিয়মিত বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের লাইন ও যন্ত্রপাতি চেকআপ না করা এবং ফায়ার সার্ভিসের ইকুইপমেন্ট সরবরাহ না করা প্রভৃতি অগ্নিদুর্ঘটনার সূত্রপাত ঘটায়।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের নিমিত্তে জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও সমন্বয়সাধনের মধ্য দিয়ে টেকসই নগরায়ণ বাস্তবায়ন করা উচিত। কেননা সমন্বিত দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় সেন্দাই ফ্রেমওয়ার্ক ও প্যারিস চুক্তির আলোকে জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন কৌশল ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা দরকার। সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি কর্তৃপক্ষ, দপ্তরসমূহ ও সরকারি মন্ত্রণালয়গুলোকে সমন্বয়সাধন করে কাজ করা উচিত।

দেশের প্রায় সব নগরাঞ্চলে স্থাপিত গার্মেন্টস, বিভিন্ন শিল্পকারখানা, মিল ফ্যাক্টরি প্রভৃতি নগর এলাকার বাইরে অনাবাদি জায়গা বরাদ্দ নিয়ে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে প্রতিস্থাপন করা উচিত। ফলে, জনস্বাস্থ্যের জন্য তীব্র হুমকিস্বরূপ যে কার্বনের নিঃসারণ হয়, সেটি হ্রাস পেয়ে বায়ু ও শব্দদূষণের মতো মারাত্মক বিপর্যয় থেকে নগরাঞ্চলের নিরাপত্তা বিধান সম্ভব হবে। সেই সঙ্গে কর্মসংস্থানের জন্য গ্রামাঞ্চল থেকে নগর এলাকার দিকে ধেয়ে আসা জনসে াতও ক্রমে হ্রাস পাবে। বস্তিতে বসবাসরত জনগোষ্ঠীও আস্তে আস্তে জীবনমান উন্নয়নের সুযোগ লাভ করবে।

লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়