রোববার, ১৪ আগস্ট ২০২২, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

পরিবেশদূষণ মানবজাতির জন্য হুমকি 

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০২২, ০৩:৪৫

পরিবেশ বিপর্যয় ও পরিবেশদূষণের কারণে ঘটছে জলবায়ুর পরিবর্তন। এই জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে শঙ্কিত পুরো বিশ্ব। পরিবেশের চারটি উপাদানের মধ্যে মাটি, পানি, বায়ু—তিনটিই মানবসৃষ্ট দূষণের শিকার। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শব্দদূষণ। মানুষের মৌলিক চাহিদা খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের জন্য যেসব বস্তুর প্রয়োজন হয়, তার সবগুলোরই উৎস মাটি। মাটির দূষণ হচ্ছে মাটির প্রয়োজনীয় উপাদান হ্রাস ও অবাঞ্ছিত পদার্থসমূহের সঞ্চয়। 

ভূমিক্ষয়, রাসায়নিক দ্রব্য ও বর্জ্যের স্তূপ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অনিয়ন্ত্রিত বৃক্ষনিধন, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, অনিয়ন্ত্রিত কৃষিকাজ, পলিথিন বর্জ্য, পারমাণবিক বর্জ্য, রাসায়নিক মিশ্রণ, মেডিকেল বর্জ্য, ই-বর্জ্য মাটিদূষণের অন্যতম কারণ। এছাড়া নগরায়ণ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধিও মাটিদূষণের কারণ। দূষণের কারণে মাটি হারাচ্ছে উর্বরতা আর বাড়ছে উৎপাদনে ঘাটতি। ফলে বিশ্বব্যাপী দেখা দিচ্ছে খাদ্যের সংকট। বাড়ছে খাদ্যপণ্যের দাম। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে, মাটিদূষণ একটি বিশ্বব্যাপী হুমকি। এই দূষণ বিশ্বের মাটির এক-তৃতীয়াংশকে প্রভাবিত করছে। 

এফএওর মতে, দূষিত ভূমি থেকে আবাদযোগ্য মাটির ১ সেন্টিমিটার স্তর তৈরি করতে এক হাজার বছর সময় লাগবে। মাটির অবক্ষয়ের কারণে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক ক্ষতি বিশ্বের বার্ষিক জিডিপির ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। শুধু মাটিদূষণের কারণে পৃথিবীর প্রায় ২৫ বিলিয়ন টন উপরিভাগের মূল্যবান মাটি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মাটিদূষণের কারণে ভয়ংকর লিউকিমিয়া রোগ থেকে ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে। মাটিদূষণে যেমন জমির উবর্রতা নষ্ট হচ্ছে, কমছে নাইট্রোজেন ফিক্সেশন, হারিয়ে যাচ্ছে মাটির উপকারী অণুজীব, তেমনি কমছে ব্যবহার্য জমির পরিমাণ। ফলে অণুজীব, জমির পুষ্টি গুণাগুণ এবং খাদ্যশস্যের যে প্রাকৃতিক খাদ্যশৃঙ্খল রয়েছে, তা-ও নষ্ট ও ধ্বংস হচ্ছে। মাটির মতোই দূষণের শিকার পানি। পানির ব্যবহার ব্যাপক ও সর্বত্র। পৃথিবীর শতকরা প্রায় ৯৭ ভাগ পানিই লবণাক্ত সাগরের পানি। বাকি মাত্র তিন ভাগ মিঠাপানি। আবার এই তিন ভাগের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ মানুষের আওতাধীন, বাকিটা মেরু-অঞ্চল ও হিমবাহের বরফে রূপান্তরিত। এই পরিমাণ মিঠাপানি পৃথিবীর সব মানুষের প্রয়োজন মেটাতে যথেষ্ট। কিন্তু অসম নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও পানিদূষণের কারণে মানুষ তার প্রাপ্য পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পানিদূষণের বিভিন্ন কারণের মধ্যে গৃহস্থালির বর্জ্য এবং কলকারখানা থেকে নির্গত বর্জ্যই উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু দ্বারা দূষিত পানি ব্যবহারের কারণে মানুষের কলেরা, টাইফয়েড, ডাইরিয়া, আমাশয়, পরিপাকতন্ত্রে প্রদাহ, যকৃতে প্রদাহসহ বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি হয়। প্রতি বছর প্রায় ১৮ লাখ মানুষ পানিদূষণজনিত রোগে ভুগে মারা যায়। কর্মক্ষেত্রে দূষণ ৮ লাখ মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী। 

ল্যানসেটের প্রতিবেদনমতে, পানিদূষণ ১৪ লাখ মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী। বাংলাদেশে পানিদূষণের অন্যতম প্রধান কারণ আর্সেনিক। দেশের প্রায় ৫ কোটি ৭০ লাখ মানুষ যে পানি ব্যবহার করে, সেখানে আর্সেনিকের মাত্রা প্রতি লিটারে ৫০ মাইক্রোগ্রাম। যেখানে ডব্লিউএইচও নির্ধারিত সর্বোচ্চ সহনীয় মাত্রা প্রতি লিটারে ১০ মাইক্রোগ্রাম। জীবজগতের প্রায় ৯৯ শতাংশ জীব বায়ুজীবী। বর্তমানে অস্বাভাবিক হারে শিল্পকারখানা গড়ে ওঠা এবং গ্যাসোলিনচালিত যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে বায়ু মানুষের ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। ভূপৃষ্ঠের ঊর্ধ্বে ৩০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বায়ুমণ্ডল বিস্তৃত। পারমাণবিক বিস্ফোরণসহ দুর্ঘটনাজনিত তেজস্ক্রিয় নির্গমণ, কলকারখানা নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া, যানবাহন নির্গত ধোঁয়া, অস্বাস্থ্যকর প্রক্রিয়ায় পৌর ও গৃহস্থালির আবর্জনা জমানো ও অপসারণ, যথেচ্ছ বৃক্ষনিধন, ব্যাপক কয়লা ও কাঠ পোড়ানো, অতিরিক্ত অ্যারোসল ও অন্যান্য স্প্রে ব্যবহার এবং কৃষিকাজ ও মশা-মাছি নিধনে ব্যবহৃত রাসায়নিক কীটনাশক ইত্যাদি কারণে বায়ুদূষণ ঘটছে।বায়ুদূষণের প্রধান কারণ জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো। 

গ্লোবাল বারডেন অব ডিজিজের প্রতিবেদনমতে, বায়ু ও বিষাক্ত বর্জে্যর দূষণে পরিবেশ দূষিত হয়ে ২০১৫ সাল থেকে প্রতি বছর বিশ্ব জুড়ে আনুমানিক ৯০ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। বাংলাদেশে মারা গেছে ২ লাখের বেশি। দূষণে মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ। বায়ু, পানি, সিসা ও কর্মক্ষেত্রে দূষণের শিকার হয়ে বাংলাদেশে মারা গেছে ২ লাখ ১৫ হাজার ৮২৪ জন। দূষণে মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে প্রথম অবস্থানে ভারত। দেশটিতে মারা গেছে ২৩ লাখ ৫৭ হাজার ২৬৭ জন। বায়ুদূষণে মৃত্যুর দিক থেকেও ভারত শীর্ষে, তারপর বাংলাদেশ, নেপাল ও পাকিস্তানের অবস্থান। শিল্পপণ্য উত্পাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে নগরায়ণের ফলে ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বিশ্বে বায়ুদূষণের কারণে মৃত্যু ৭ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৭ সালে একই গবেষণামতে, দূষণে প্রতি বছর প্রায় ৯০ লাখ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। অর্থাৎ, ছয় জনে এক জনের মৃত্যুর কারণ দূষণ। এতে করে প্রতি বছর বিশ্ব অর্থনীতির ৪ লাখ ৬০ হাজার কোটি ডলার ক্ষতি হচ্ছে। 

গবেষণামতে, পরিবেশদূষণে সর্বাধিক মৃত্যু দেখা দেশগুলো যথাক্রমে চাদ, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, নাইজার, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, দক্ষিণ আফ্রিকা, উত্তর কোরিয়া, লেসোথো, বুলগেরিয়া, বুরকিনা ফাসো। পৃথিবীতে ৮০ কোটি, অর্থাৎ প্রতি তিনটি শিশুর মধ্যে একটি শিশুর রক্তে ৫ মাইক্রোগ্রাম অথবা এর বেশি মাত্রায় সিসা রয়েছে। ১৯ বছর বয়সের নিচে এই শিশুরা বেশির ভাগই উন্নয়নশীল দেশের বাসিন্দা। 

ল্যানসেটের প্রতিবেদনমতে, ২০১৯ সালে বৈশ্বিকভাবে গৃহস্থালি ও কলকারখানাসহ বিভিন্ন বাহ্যিক বায়ুদূষণে ৬৭ লাখ মানুষ মারা গেছে; সিসাদূষণ ৯ লাখ মানুষকে অকালমৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। ২০১৯ সালে যেখানে মরণব্যাধি ম্যালেরিয়ায় মৃত্যু ঘটেছে ৬ লাখ ২০ হাজার মানুষের, ১৯৯০ সাল থেকে সিসাদূষণের কারণে বিশ্বব্যাপী মৃত্যুহার বৃদ্ধি পেয়েছে ২১ শতাংশ। শব্দ মানুষের ভাব বিনিময়ের প্রধান মাধ্যম হলেও শব্দদূষণ মানুষের মানসিক ও শারীরিক অসুবিধারও কারণ। শব্দের তীক্ষ্ণতার ওপর নির্ভর করে শব্দদূষণ নির্ণয় করা হয়। মানুষের স্বাভাবিক শ্রবণমাত্রা ৬০-৭৫ ডেসিবেল মাত্রার শব্দ। শব্দের মাত্রা ৭৫ ডেসিবেল অতিক্রম করলেই সেটা শব্দদূষণ। যানবাহনের চলাচল ও জোরালো হর্ন, কলকারখানার নির্গত শব্দ, বিভিন্ন নির্মাণকাজের শব্দ, অনিয়ন্ত্রিত লাউড স্পিকার ব্যবহার, উড়োজাহাজের শব্দ, আবাসিক এলাকায় কলকারখানার অবস্থান, প্রচণ্ড জনকোলাহল ইত্যাদি শব্দদূষণের মূল কারণ। ঘরে ব্যবহৃত আধুনিক যন্ত্রপাতি যেমন—ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, ফুড ব্লেন্ডার, বাসন ধোয়ার যন্ত্র, ফুড গ্রাইন্ডার, টেলিভিশন, পাখা ইত্যাদি থেকেও শব্দদূষণ সৃষ্টি হতে পারে। শব্দদূষণকে বলা হয় নীরব ঘাতক। 

পরিবেশ অধিদপ্তরের জরিপমতে, মাত্রাতিরিক্ত শব্দের কারণে ইতিমধ্যে দেশের প্রায় ১২ শতাংশ মানুষের শ্রবণশক্তি হ্রাস পেয়েছে। ‘ফ্রন্টিয়ারস-২০২২: নয়েজ, বে­জেস অ্যান্ড মিসম্যাচেসের প্রতিবেদনমতে, শব্দদূষণের তালিকায় বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার অবস্থান প্রথম। ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ১ দশমিক ১ বিলিয়ন মানুষ অত্যধিক শব্দযুক্ত বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে শ্রবণশক্তি হ্রাস হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ৬০ ডেসিবেলের অধিক শব্দ যদি দীর্ঘ সময় ধরে থাকে, তাহলে সাময়িক বধিরতা আর ১০০ ডেসিবেলের বেশি হলে স্থায়ী বধিরতা হতে পারে। সারা বিশ্বে ৫ শতাংশ মানুষ শব্দদূষণের শিকার। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের মতে, শব্দের মাত্রা প্রতি ১০ ডেসিবেল বৃদ্ধি পেলে যে কোনো বয়সে স্ট্রোকের ঝুঁকি ১৪ শতাংশ করে বাড়তে থাকে। আর যদি তা হয় ৬৫ বছরের বেশি বয়সে, তাহলে প্রতি ১০ ডেসিবেল বাড়লে স্ট্রোকের ঝুঁকি ২৭ শতাংশ করে বাড়তে থাকে। শব্দদূষণ এমনকি মায়ের গর্ভের শিশুর শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধিকেও প্রভাবিত করে। সারা পৃথিবীতে পরিবেশের সংকট ক্রমেই ঘনিয়ে আসছে। বর্তমানকালে সচেতন মানবসমাজ বায়ু, পানি ও মাটিদূষণ, গ্রিনহাউজ প্রতিক্রিয়া, ওজোন স্তরের ক্ষয়, অ্যাসিড-বৃষ্টি ইত্যাদি ঘটনা নিয়ে বেশ শঙ্কিত। সোভিয়েতের চেরনোবিলে পারমাণবিক চুল্লিতে বিস্ফোরণ, ভারতের ভূপালে কীটনাশক কারখানায় দুর্ঘটনা এবং ভারতের প্লেগ-মহামারি, ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে জায়ারে ইবোলা ভাইরাসে মৃত্যু, ১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দে পুনর্বার জায়ারে ইবোলা ভাইরাস আক্রমণ, বাংলাদেশের প্রায় ৫২টি জেলায় আর্সেনিক দূষণের ঘটনা আর ২০২০ সালে করোনার হানা বিশ্ববাসীকে উদ্বিগ্ন করেছে। আর এসবের মূলে রয়েছে পরিবেশদূষণ। 

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনমতে, বাংলাদেশে প্রতি বছর যত মানুষের মৃত্যু হয়, তার ২ শতাংশই মারা যায় পরিবেশদূষণজনিত অসুখ-বিসুখের কারণে। কিন্তু সারা বিশ্বে এ ধরনের মৃত্যুর গড় মাত্র ১৬ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের ২০১৫ সালের পরিসংখ্যানমতে, শহরাঞ্চলে দূষণের মাত্রা উদ্বেগজনক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। দূষণের কারণে ২০১৫ সালে বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে ৮০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আইকন স্কুল অব মেডিসিনের অধ্যাপক ফিলিপ ল্যান্ডরিগান বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের চেয়ে পরিবেশদূষণ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটা নানা দিক দিয়ে মানবজাতির স্বাস্থ্য ও সুস্থতার ওপর একটি গভীর ও বিস্তৃত হুমকি।’ তাই এখনই আমাদের পরিবেশদূষণ রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, সবাইকে সচেতন হতে হবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে শঠতার অভিযোগ বিশ্বকে জানানো হোক

আইনের শাসন বজায় রাখতেই হবে

মুজিব দর্শন ভক্তি প্রজ্ঞা ও যুক্তির মেলবন্ধন 

চীন-ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক: কিছু সত্য, কিছু উপলব্ধি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

হিরোশিমা ও নাগাসাকি ট্র্যাজেডি

পবিত্র আশুরার তাৎপর্য ও মাহাত্ম্য

স্বাধীনতার নেপথ্যে প্রেরণাদাত্রী 

বন্ধুত্ব, সে তো চিরদিনের