অংশীজন ও বিশিষ্ট নাগরিকদের সহিত জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করিবার অর্থ হইল তাহাদের মতামত ও পরামর্শকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া ও আমলে নেওয়া; কিন্তু যদি তাহাদের মতামতের কোনো মূল্যই না থাকে এবং তাহাদের পরামর্শকে অবজ্ঞা ও উপেক্ষা করা হয়, তাহা হইলে এমন সংলাপ বা আলাপ-আলোচনার কি কোনো অর্থ থাকিতে পারে? ইহা কি ঢাকঢোল পিটাইয়া ডাকিয়া আনিয়া অপমানের শামিল নহে? কেননা ফলাফলহীন আলাপে লাভ কী? দেখা যাইতেছে, তাহারা তাহাদের মতো করিয়াই কাজ করিয়া যাইতেছেন। এমন অভিযোগও রহিয়াছে যে, তাহারা তাহাই করিতেছেন যাহা তাহাদের অ্যাসাইনমেন্ট করা হইয়া থাকে, যদিও তাহারা সংবিধানের ১১৮ ধারা অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন। এমন পরিস্থিতিতে তাহারা যদি আবার একই ইস্যুতে আলাপ করিবার জন্য আমন্ত্রণ জানান, তখন সেইখানে যাইয়া আলোচকদের কি মুখ রক্ষা হইবে?
এইখানে আরো উল্লেখ্য যে, অংশীজনদের উপদেশ-পরামর্শ গ্রহণ তো করা হয়ই না, উপরন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাহাদের সহিত ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করা হয়। এমনকি তাহাদের দুর্নীতি ও অনিয়মেও জড়াইয়া পড়িতে দেখা যায়। এই পরিপ্রেক্ষিতে পুনরায় আলাপ-আলোচনার কথা বলা হইতেছে কেন? আলোচনা করিলেও তাহারা যে পূর্বের মতোই আচরণ করিবেন না, তাহার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে? সংবিধান যখন এইরূপ একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে যথেষ্ট ক্ষমতা দিয়াছে, তখন সেই ক্ষমতার প্রয়োগ না করিয়া কেন কোনো কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের দিকে চাহিয়া থাকিতে হয়? ইহাতে তাহাদের স্বাধীনতা থাকিল কীভাবে? এইরূপ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে কী ক্ষমতা দেওয়া হইয়াছে তাহা আমাদের সকলেরই জানা। সংবিধানের ১২৫ ধারা অনুযায়ী তাহাদের কোনো কোনো পদক্ষেপের বিষয়ে আদালতে পর্যন্ত প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না। যুক্তিসংগত নোটিশ বা শুনানির সুযোগ প্রদান না করিয়া আদালত অন্তর্বর্তী বা অন্য কোনো রূপ আদেশ বা নির্দেশও প্রদান করিতে পারিবেন না। আবার ১২৬ ধারায় বলা হইয়াছে যে, তাহাদের দায়িত্বপালনে সহায়তা করা সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য। এত বড় ক্ষমতা লইয়াও তাহারা কোনো কোনো ক্ষেত্রে কীভাবে ঠুঁটো জগন্নাথের মতো ভূমিকা পালন করেন? যাহারা তাহাদের কাজে হস্তক্ষেপ করেন, তাহারাই-বা কীসের ভিত্তিতে করেন তাহাও আমাদের বোধগম্য নহে। কেননা এই ক্ষমতা যখন তাহাদের দেওয়া হয়, তখন এই সম্পর্কিত বিল পার্লামেন্ট ও ইহার সংশ্লিষ্ট কমিটিতে গিয়াছে। তাহারা হস্তক্ষেপই যদি করিবেন, তবে তাহারা কেন তাহাদের এমন ক্ষমতা দিলেন? সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হইলেও তাহারা কি সংবিধানের ঊর্ধ্বে?
এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি সুন্দর সুন্দর কথাবার্তা বলিয়া থাকেন; কিন্তু কাজ যাহা করেন তাহা ন্যক্কারজনক। এখন বলা হইতেছে, আলোচনা করা হইবে প্রত্যাশা ও বাস্তবতা লইয়া। প্রত্যাশার কথা তো অনেকেই ইতিমধ্যে বলিয়া আসিয়াছেন। আর বাস্তবতা কী, তাহা যাহারা মাঠে-ময়দানে কাজ করেন, তাহাদের চাইতে ভালো আর কে জানেন। তাহারা ইহাকে সংলাপ বলিতেও নারাজ। তাহাদের ভাষায় ইহা একধরনের সেমিনারের মতো। তাহারা কেন ইহাকে সংলাপ বলিতে চান না? কারণ পূর্বের সংলাপের ফলাফল শূন্য। ইহা অশ্বডিম্ব ছাড়া আর কিছুই নহে। তাই এইবার নূতন মোড়কে আলাপ-আলোচনার কথা বলা হইতেছে কি না, তাহাও প্রশ্ন। তবে অংশীজনের সহিত এমন আলোচনার কথা বলা হইলেও প্রকৃতপক্ষে যাহারা অংশীজন তথা রাজনৈতিক দলগুলোর সহিত আলাপ করা হইবে কি না, সেই ব্যাপারে এখনো সিদ্ধান্তই গ্রহণ করা হয় নাই। কথায় বলে, ‘যার বিয়া তার খবর নাই, পাড়াপড়শির ঘুম নাই’। ইহাও কি একপ্রকার রসিকতা নহে?