‘আমার সামনেই সন্ত্রাসীরা আমার স্বামীকে কুপিয়ে হত্যা করেছে। আমি শত চেষ্টা করেও তাকে রক্ষা করতে পারিনি। হামলার সময় কোনো লোক এগিয়ে আসেনি।’ —কান্না জড়িত কণ্ঠে এ কথা বলেন নিহত রিফাত শরীফের স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে বরগুনা পুলিশ লাইনের কাছে বাবার বাড়িতে বসে তিনি এ কথা বলেন। আয়শার দাবি, নয়ন, রিশান ফরাজী ও রিফাত ফরাজী এই হামলা চালিয়েছে। তিনি বলেন, নয়ন বিভিন্ন সময় আমাকে বিরক্ত করত, এসব ঘটনা পরিবারকে না জানাতে হুমকি দিত।
গতকাল বরগুনায় দিনদুপুরে স্ত্রীর আয়শা সিদ্দিকা মিন্নির সামনে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করা হয়। নিহত রিফাতের বাড়িতে গিয়ে গতকাল দেখা যায়, একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে দিশেহারা মা মোসা. ডেইজি আক্তার। থেকে থেকে আহাজারি করছেন তিনি। রিফাতের প্রতিবেশী হালিম বলেন, ‘এলাকায় ভদ্র ছেলে হিসেবে পরিচিত ছিলেন রিফাত। তাকে যেভাবে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা দুঃখজনক। আমরা বিচার চাই।’
চোখের সামনে স্বামীকে হত্যার বর্ণনা দিতে গিয়ে বারবার কেঁদেছেন মিন্নি। বললেন, আমার চোখের সামনেই আমার স্বামীকে কুপিয়ে হত্যা করেছে তারা। অনেক চেষ্টা করেও স্বামীকে বাঁচাতে পারিনি আমি। মিন্নি বলেন, সকাল ৯টার দিকে স্বামী রিফাত শরীফের সঙ্গে বরগুনা কলেজে আসি আমি। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কলেজ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য রওনা দেই আমরা। বরগুনার কলেজ সড়কের ক্যালিক্স কিন্ডার গার্টেনের সামনে পৌঁছালে বেশ কয়েকজন যুবক আমাদের গতিরোধ করে। সেই সঙ্গে রিফাত শরীফকে মারধর শুরু করে তারা। এর মধ্যেই চাপাতি নিয়ে ঘটনাস্থলে হাজির হয় নয়ন ও রিফাত ফরাজী।
মিন্নি বলেন, নয়ন ও রিফাত ফরাজী চাপাতি নিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রিফাত শরীফকে জাপটে ধরে রিফাত ফরাজীর ছোট ভাই রিশান ফরাজী। এরপরই রিফাত শরীফকে নির্মমভাবে চাপাতি দিয়ে কোপাতে থাকে নয়ন ও রিফাত ফরাজী। আমি তাদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কিছুতেই তাদের থামাতে পারিনি। রিফাতকে উপর্যুপরি কুপিয়ে রক্তাক্ত করে চলে যায় তারা। মিন্নি বলেন, ভিডিওতে যাদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে মূলত তারাই প্রথমে রিফাত শরীফ ও আমার পথ আটকে দিয়েছিল। সেই সঙ্গে তিন-চারজন রিফাত শরীফকে মারতে শুরু করেছিল। নয়ন ও রিফাত ফরাজী চাপাতি দিয়ে রিফাত শরীফকে কোপাতে শুরু করলে তারা পাশে দাঁড়িয়ে দেখেছিল। এরপর আমি প্রাণপণ চেষ্টা করেও রিফাতকে বাঁচাতে পারিনি।
মিন্নি জানান, রিফাতের সঙ্গে দুই মাস আগে বিয়ে হয় তার। তবে এর আগে থেকেই এলাকার বখাটে সাব্বির হোসেন নয়ন তাকে উত্ত্যক্ত করত। মিন্নি বলেন, ‘বিয়ের আগে থেকেই নয়ন আমাকে বিরক্ত করত। তার সঙ্গে ফোনে কথা বলতে হবে, কথা না বললে মেরে ফেলবে, রাস্তাঘাটে আমার রিকশায় জোর করে উঠবে, এসব কথা কাউকে বললে মেরে ফেলবে বলে বিভিন্ন সময় হুমকি দিয়ে আসছিল। এরপর বিষয়টি পরিবারকে জানালে রিফাতের সঙ্গে আমার পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। তবে বিয়ের আগ থেকেই রিফাতের সঙ্গে আমার ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল।’ সন্ত্রাসীরা আঘাতের পর আঘাত করেছে রিফাতকে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে লড়াকু এই নারী বলেন, ‘বিয়ের পরও নয়ন আমাকে বিরক্ত করে আসছিল। বিষয়টি আমি আমার স্বামীকেও জানিয়েছিলাম। তিনি দাবি করেন, রিফাতকে যখন দুই তিনজন রাম দা নিয়ে কোপাচ্ছিল, তখন আশপাশে এদের সহকারীরা দাঁড়িয়ে ছিল। ওই ছেলেগুলোই প্রথমে রিফাতকে মারধর করেছিল।