নিষ্ঠুরতার নেপথ্যে মাদক

দেশের তরুণদের মধ্যে মাদক সেবনের প্রবণতা বাড়ছে। শখের বসে মাদক সেবন শুরু করে শেষ পর্যন্ত মাদকের দাসে পরিণত হচ্ছে তরুণরা। এরপর নিজেরা জড়িয়ে পড়ছে মাদক ব্যবসায়, ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মারামারি ও সংঘর্ষে। ততোদিনে সুস্থ স্বাভাবিক চিন্তাভাবনা লোপ পেয়ে সে স্থান দখল করে নেয় অস্বাভাবিক আচরণে। হরহামেশা মাদকসেবীরা চরম নিষ্ঠুর ও বর্বর কর্মকা্লে লিপ্ত হচ্ছে। এমনই কিছু তরুণ গত বুধবার বরগুনায় প্রকাশ্যে স্ত্রীর সামনে কুপিয়ে হত্যা করেছে তার স্বামীকে। অন্যদিকে ঠাকুরগাঁওয়ে মাদকসেবী এক বখাটের ছুরিকাঘাতে আহত এক নার্স গতকাল মারা গেছেন।       সমাজবিজ্ঞানী ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলাপকালে তারা এমনটা জানিয়েছেন। তারা আরো বলেন, মাদক সেবন ও অতিরিক্ত হতাশা থেকে দিন দিন নিষ্ঠুরতার দিকে ঝুঁকছে তরুণরা। ছোট ছোট অপরাধ থেকে ধীরে ধীরে বড় অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে তারা। কিশোর-তরুণরা পাড়া-মহল্লায় গ্যাং তৈরি করছে। অনেক সময় দেখা যায় তারা একত্রে মাদক সেবন করছে। তুচ্ছ কোনো বিষয়ে এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের সঙ্গে সংঘর্ষ আর হানাহানিতে জড়িয়ে পড়ছে। মাদকসেবীদের মধ্যে অস্বাভাবিক আবেগ দেখা যায়। কোনো কারণে প্রেমে বিচ্ছেদ বা নারী ঘটিত কোনো সমস্যা দেখা দিলে চরম ভয়ংকর কা্ল ঘটিয়ে দেয় তারা। অতিরিক্ত মাদক গ্রহণের ফলে তাদের বোঝার ক্ষমতা নেই এটি অন্যায় বা অবৈধ।  যে কোন নৃশংস কাজ করতেও দ্বিধা করে না তারা। প্রতিশোধ কিংবা অন্যকোনো জিঘাংসা থেকে তারা যেকোনো কিছুই ঘটিয়ে দিতে পারে।

বিখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. অধ্যাপক মোহিত কামাল বলেন, চরম হতাশা ও মাদক সেবনের কারণে সহিংস হয়ে উঠতে পারে তরুণরা। এছাড়া বিভিন্ন মহল্লায় গড়ে উঠা কিশোর গ্যাংয়ের সাথে সংযুক্ত হয়ে অপরাধ কর্মকা্লে জড়িয়ে পড়ে তারা। সামপ্রতিক সময়ে দেশের ৭০ থেকে ৮০ ভাগ তরুণ মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত। যার কারণে তারা এমন অপরাধ করছে। অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের খোঁজ খবর রাখেন না। তারা কি করে, কোথায় যায় জানেন না। অভিভাবকদের শৈথিল্যে সন্তানরা খুব সহজেই বিপথে চলে যেতে পারে। দেখা যায় এভাবে পিতামাতার অগোচরে অনেকেই মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এরা যেকোনো তুচ্ছ কারণে যে কোনো ঘটনা ঘটিয়ে দিতে পারে। 

আরেক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম বললেন কী কারণে এমনটি ঘটছে। তিনি বলেন, আগে খুন হতো গোপনে, আর এখন তা প্রকাশ্যেই ঘটছে। কারণ যে এসব ঘটাচ্ছে তার মধ্যে একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছে যে এসব করে যে কোনো ভাবে ছাড়া পাওয়া সম্ভব। আর আইনের বিভিন্ন ফাঁক দিয়ে এরা ছাড়াও পাচ্ছে। যার ফলে অন্যদের ওপর এর প্রভাব পড়ছে। আর এ কারণে নৃশংস হয়ে উঠছে তরুণরা। তাই এসব ঘটনার সম্পৃক্তদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। তা না হলে আরো ভয়ংকর কিছু অপক্ষো করছে আমাদের জন্য। আর মাদকাসক্তির বিষয়েও সন্তানদের অভিভাবকের খোঁজ খবর নেওয়া উচিত। তাহলেই এসব নিষ্ঠুরতা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। তা না হলে ভবিষেত নিরব দর্শকের মত এসব নৃশংসতা প্রতিনিয়ত আমাদের দেখতে হবে। এজন্য মাদকের আগ্রাসন এখনি থামানো প্রয়োজন।

বরগুনার ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সানজিদা মুর্শেদ ইত্তেফাককে বলেন, ঘাতক ব্যক্তিকে কোনোভাবে মানসিক রোগী বলার সুযোগ নেই। তবে অতিরিক্ত মাদক গ্রহণের ফলে ম্যানিয়া অব বাইফোলার দেখা দিতে পারে তার মধ্যে।