পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবি (স.)

আজ পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (স.)। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর জন্ম ও মৃত্যুর পুণ্যস্মৃতিময় দিন। ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের এই দিনে, অর্থাৎ ১২ রবিউল আউয়াল তিনি আরবের মক্কা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। আবার এই দিনে তিনি ৬৩ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। আজকের দিনটি তাই ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের জন্য অত্যন্ত পবিত্র ও মহিমান্বিত।

‘ঈদ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ খুশি হওয়া, ফিরিয়া আসা, আনন্দ উদযাপন করা ইত্যাদি। আর ‘মিলাদ’ শব্দের অর্থ জন্মতারিখ, জন্মদিন, জন্মকাল ইত্যাদি। এই জন্য ‘মিলাদুন্নবী’ (স.) বলিতে নবিজির আগমনকে বুঝায়। আর ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ (স.) বলিতে বোঝায় নবী করিম (স.)-এর আগমনে আনন্দ উদযাপন করা। মহানবী হজরত মুহাম্মদ মুস্তাফা (স.) সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব। পৃথিবীর ইতিহাসে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যাহার স্মরণ সকল জাতি সকল যুগে করিয়াছে। তিনি সেই মহামানব, যাহার নাম পবিত্র ইঞ্জিল ও তাওরাত শরিফে উল্লেখ করা হয়; যেখানে তাহাকে সম্বোধন করা হইয়াছে ‘আহমদ’ নামে আর কুরআন পাকে ‘মুহাম্মদ’ নামে। (তাফসিরে ইবনে কাসির, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-৩২৪)। তিনি রাহমাতুল্লিল আলামিন বা সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপ। নবুয়ত লাভের পূর্বেই তিনি সততা ও সত্যবাদিতার জন্য ‘আল আমিন’ উপাধিতে ভূষিত হন এবং বিবদমান সকল সম্প্রদায় তাহাকে প্রিয় নেতা হিসাবে মানিয়া লয়। সমাজসংস্কারক হিসাবেও তিনি সর্বকালের এক মহান আদর্শ।

মহানবী (স.) যে রাতে জন্মগ্রহণ করেন, সেই রাতে পারস্যের রাজপ্রাসাদে প্রবল ভূকম্পনের সৃষ্টি হয়; যাহার ফলে তৎক্ষণাৎ সেই প্রাসাদের ১৪টি গম্বুজ ভাঙিয়া পড়ে। মহানবী (স.)-এর জন্মের দিন পারস্য তথা ইরানের আগুন নিভিয়া যায়, যাহা হাজার বছর ধরিয়া প্রজ্বলিত ছিল। [বায়হাকি, দালাইলুন নবুয়্যাহ্ (প্রথম খণ্ড) পৃষ্ঠা-১২৬]  মহানবী (স.)-এর জন্মদিন হওয়ার কারণে প্রতি সোমবার সিয়াম (রোজা) পালন করা মুস্তাহাব। নবীকে (স.) সোমবারের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হইলে তিনি বলেন, ‘এই দিনে আমি জন্মগ্রহণ করিয়াছি এবং এই দিনে আমাকে নবুওয়াত দান করা হইয়াছে (সহিহ্ মুসলিম :১১৬২)। পূর্বে উল্লিখিত হাদিসের আলোকে উম্মতে মুহাম্মদি হিসাবে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবিতে আমাদের করণীয় হইল—এই দিনে সকল মুসলিমের রোজা পালন করা, তাহার প্রতি অধিক পরিমাণে দরুদ ও সালাম প্রেরণ করা। অন্য এক হাদিসে নবী করিম (স.) বলেন, ‘সোমবার ও বৃহস্পতিবার বান্দার আমলনামা আল্লাহর দরবারে উপস্থাপন করা হয়। সুতরাং রোজা অবস্থায় আমার আমলনামা উপস্থাপন করা হউক, ইহাই আমি পছন্দ করি।’ (সুনানে তিরমিজি :৭৪৭)। তাই মহানবী (স.)-এর জন্মের দিনে নফল রোজা রাখা প্রকৃত নবিপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ।

মানবেতিহাসের এক যুগসন্ধিকালে, অন্ধকারতম সময়ে তিনি মহান আল্লাহর বাণী লইয়া আগমন করেন। তাহার উদাত্ত আহ্বান, নিষ্ঠাপূর্ণ কর্মসাধনা, উচ্চতম নীতি-আদর্শ ও অমলিন পবিত্র-মাধুর্যের মাধ্যমে তিনি অল্প দিনে এক আলোকোজ্জ্বল ও সর্বোন্নত জীবনব্যবস্থা বাস্তবায়ন করেন। তিনি অজ্ঞতা, কুসংস্কার এবং অনাচার, পাপাচার ও বিশ্বাসহীনতার কলুষ দূরীভূত করিয়া শান্তি, সভ্যতা, নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদার এক নূতন পথ রচনা করেন। তাই তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ নবী, সাইয়্যেদুল মুর্সালিন ও খাতামুন্ নাবিয়্যিন। এখানে যে কথাটিকে অধিক গুরুত্ব দিতে হইবে তাহা হইল, মহানবী (স.)-এর জন্মের ঘটনার চাইতেও তাহার আদ্যোপান্ত জীবনাদর্শ আমাদের জীবন চলার পথে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পাথেয়। ইহা সকল যুগ ও মানুষের জন্য সর্বদা অনুসরণীয় ও অনুকরণীয়। পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (স.) উপলক্ষে আমরা সকলকে জানাই সালাম ও মুবারকবাদ।