হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ছিল এ দেশকে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলায় পরিণত করা। জাতির পিতার সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। দেশ আজ এগিয়ে চলেছে দ্রুতগতিতে। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের দেশের আপামর জনগোষ্ঠীর ভাগ্যোন্নয়নে ২০০৯ সালে গৃহীত যুগান্তকারী উদ্যোগটি ছিল রূপকল্প-২০২১। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য দূরীকরণের পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি প্রবর্তনসহ সবকিছুই রূপকল্প-২০২১-এ অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর সফল বাস্তবায়নই ছিল চলমান উন্নয়ন অভিযাত্রার মূল ভিত্তি।
দেশের অর্থনৈতিক সাফল্য দুর্বার গতিতে অগ্রসরমান। গত ১৪ বছরে জিডিপির গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ৭ শতাংশের বেশি। স্বাধীনতার পর মাত্র ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের জিডিপি নিয়ে যাত্রা শুরু করে গত অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৬০ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৩৫তম বৃহত্ অর্থনীতির দেশ। মাথাপিছু আয় ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ৬৮৬ মার্কিন ডলার থেকে চার গুণ বেড়ে ২০২১-২২ অর্থবছরে ২ হাজার ৭৯৩ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশের এই অসামান্য অগ্রগতি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। ইউরোপের Think Tank, Spectator Index অনুযায়ী কোভিড-পূর্ববর্তী ১০ বছরে বাংলাদেশ ১৮৮ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করে সারা বিশ্বে প্রথম স্থানে অবস্থান করেছে। বিশ্বখ্যাত অ্যাকাউন্টিং ফার্ম PricewaterhouseCoopers বলেছে, ২০৩০ সালে বিশ্বের ২৮তম অর্থনীতি হবে বাংলাদেশ। যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান Centre for Economics and Business Research বলেছে, বাংলাদেশ ২০৩৭ সালে হবে বিশ্বের ২০তম বৃহত্ অর্থনীতির দেশ।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক সূচকেও আমাদের সাফল্য অনেক। দারিদ্র্যের হার ২০০৫ সালের ৪০ শতাংশ থেকে অর্ধেকেরও বেশি হ্রাস পেয়ে ২০২২ সালে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে এসেছে, অতি দারিদ্র্যের হার ২৫ দশমিক ১ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে। দারিদ্র্য হ্রাসের এই অভূতপূর্ব অর্জন সম্ভব হয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী সিদ্ধান্তে গৃহীত সমাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের জন্য। দেশের দুস্থ, দরিদ্র, অবহেলিত, অনগ্রসর, সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। সামাজিক নিরাপত্তা খাতের বরাদ্দ গত ১৪ বছরে ৯ গুণ বাড়ানো হয়েছে। ‘আশ্রয়ণ প্রকল্পের’ মাধ্যমে জলবায়ু উদ্বাস্তু, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, তৃতীয় লিঙ্গ, ভিক্ষুক, বেদে, দলিত, হরিজনসহ সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য জমিসহ ঘর প্রদান করা হচ্ছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ব্যারাক, ফ্ল্যাট, ঘর ও মুজিববর্ষের একক গৃহে মোট ৫ লাখ ৫৪ হাজার ৫৯৭টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন আর দারিদ্র্য দূরীকরণের পরেই বর্তমান সরকার যে খাতগুলোকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব প্রদান করেছে, তার মধ্যে রয়েছে কৃষি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা। শিক্ষা খাতে বিগত ১৪ বছরে বর্তমান সরকারের অনুসৃত নীতিকৌশলের কারণেই কাঙ্ক্ষিত আর্থসামাজিক অগ্রগতি অর্জিত হচ্ছে। দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিকেও বিশেষভাবে গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণের ফলেই দেশে কৃষি উত্পাদন বাড়িয়ে খাদ্য ঘাটতি দূর হয়েছে। দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ।
উন্নয়নের সুফল প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে দিতে বর্তমান সরকার অবকাঠামো নির্মাণে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশের যোগাযোগব্যবস্থার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি যুগান্তকারী ও সাহসী পদক্ষেপটি ছিল নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ। দেশব্যাপী যোগাগোগব্যবস্থা উন্নয়নের প্রশ্নে অনেক দূর এগিয়ে গেছি আমরা। দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য বিদ্যুত্ উত্পাদন ও বিতরণ সক্ষমতা সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
দেশের আর্থসামাজিক প্রতিটি খাতে ক্রমাগত উন্নয়নের মাধ্যমে আমরা জাতিসংঘের Millennium Development Goals অত্যন্ত সফলভাবে অর্জনে সক্ষম হই, যা সমস্ত বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে। Sustainable Development Goals বাস্তবায়নে বাংলাদেশ যথাযথভাবে কাজ করে যাচ্ছে, এরই স্বীকৃতিস্বরূপ Sustainable Development Solutions Network মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘SDG Progress Award’ প্রদান করেছে। তার পাশাপাশি ২০১৫ সালে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের মানদণ্ড অনুযায়ী নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় একটি অনন্য মাইলফলক। দেশরত্ন শেখ হাসিনার লক্ষ্য হলো ২০৩১ সালের মধ্যে দেশকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত, জ্ঞানভিত্তিক স্মার্ট বাংলাদেশে পরিণত করা।
স্মার্ট বাংলাদেশের যে চার স্তম্ভ :স্মার্ট সিটিজেন, স্মার্ট গভর্নমেন্ট, স্মার্ট ইকোনমি ও স্মার্ট সোসাইটি। ২০৪১ সালের স্মার্ট সিটিজেন তথ্য প্রযুক্তিতে দক্ষ হওয়ার পাশাপাশি সরকারি সেবার মানোন্নয়ন ও নীতি প্রণয়নের সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। ‘স্মার্ট গভর্নমেন্ট’-এর মূল লক্ষ্য শতভাগ পেপারলেস অফিস প্রণয়নের মধ্য দিয়ে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কৃষি, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, গণনিরাপত্তা প্রভৃতি নিশ্চিত করা হবে। ‘স্মার্ট ইকোনমি’র অনুষঙ্গ হবে দ্রুত ও নিরাপদ লেনদেন, ক্যাশলেস সোসাইটি, স্টার্টআপ ইত্যাদি। ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আইটি ইন্ডাস্ট্রি তৈরি হবে, বিনিয়োগ পৌঁছাবে জিডিপির ৪০ ভাগে, কর-জিডিপির অনুপাত হবে ২০ ভাগ, যা সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা হবে। সর্বোপরি ‘স্মার্ট সোসাইটি’ হবে এমন সোসাইটি, যা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’-এর অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করবে এবং সবার অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনায় স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের মাধ্যমেই আমরা এ দেশকে পরিণত করব বঙ্গবন্ধুর আজন্ম লালিত স্বপ্নের সোনার বাংলায়। জননেত্রী শেখ হাসিনার শুভ জন্মদিনে এই হোক আমাদের অঙ্গীকার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে জন্মদিনের আন্তরিক শুভেচ্ছা।
লেখক: সংসদ সদস্য, ১৬০ নেত্রকোনা-৪