পঞ্চমবার এবং টানা চতুর্থ বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আজ শপথ নিতে যাচ্ছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ তনয়া শেখ হাসিনা। গতকাল তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। অভিনন্দন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ জনবহুল ১৭ কোটি মানুষের একটি দেশে বহু ধরনের সমস্যা এখনো বিদ্যমান; তা আমরা যেমন জানি তার চেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অধিক ওয়াকিবহার।
কিন্তু যত সমস্যাই থাকুক, পিতার মতোই শেখ হাসিনার দৃঢ় মনোবল দেশবাসীর মধ্যে আশা জাগিয়ে তোলে। মানুষ জানে, এমন করে একটি দেশকে নেতৃত্ব দেওয়া কত কঠিন। কিন্তু আমরা যতটা হতাশ হই, শেখ হাসিনা তা হন না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পেয়েছিলেন নিঃস্ব একটি ভৌগোলিক সীমানা। তার পরও তিনি আশাহত হননি। বলেছিলেন, ‘নতুন করে গড়ে উঠবে এই বাংলা। বাংলার মানুষ হাসবে, বাংলার মানুষ খেলবে। বাংলার মানুষ মুক্ত হাওয়ায় বাস করবে। বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত খাবে। এই আমার জীবনের সাধনা, এই আমার জীবনের কাম্য।’
দুঃখের বিষয়, তিনি সময় পাননি তার স্বপ্ন পূরণের। ঘাতকরা তার জীবনের সঙ্গে বাংলার জন্য দেখা স্বপ্নকেও হত্যা করেছিল। তারপর অনেক চড়াই-উতরাই পার করে শেখ হাসিনা পিতার রেখে যাওয়া স্বপ্নকে কাঁধে নিয়েছেন। আর তিনিও তার পিতার মতোই স্বপ্ন পরিপূর্ণ করতে নিরলস লড়াই করে যাচ্ছেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ তার কবিতায় লিখেছেন, চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,/ জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর/ আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী/ বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি...’।
শেখ হাসিনাও ভয়শূন্য চিত্তে তার শির উঁচু করে বারবার উঠে আসছেন মানুষের মধ্যে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি বলেছেন, ‘জনগণের সরকার হিসেবে মানুষের জীবনমান উন্নয়ন করা আমাদের দায়িত্ব এবং কর্তব্য বলে আমি মনে করি। গত ১৩ বছরে আমরা আপনাদের জন্য কী কী করেছি তা আপনারাই মূল্যায়ন করবেন। আমি দৃঢ়ভাবে বলতে পারি, আমরা যেসব ওয়াদা দিয়েছিলাম, আমরা তা সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পেরেছি। মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে শতভাগ মানুষের ঘরে বিদ্যুত্ পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, আমরা সে প্রতিশ্রুতি অক্ষরে অক্ষরে পূরণ করেছি।’
আক্ষরিক অর্থেই অনেক কিছু তিনি টানা তিন দফা সরকার পরিচালনাকালে অর্জন করেছেন। দেশবাসী বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করেছে তার উন্নয়ন। দলের সমর্থক বা বিরোধী সবাই এক বাক্যে তার উন্নয়নের কথা স্বীকার করেন, করবেন। শুধু বিদ্যুত্ নয়, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, টানেল, পরমাণু বিদ্যুকেন্দ্র, নিজস্ব স্যাটেলাইট থেকে শুরু করে কী না করেছেন! সত্যিই এক এলাহি কারবার। এমন কোনো সেক্টর নেই যেখানে শেখ হাসিনার হাতের ছোঁয়া পড়েনি। সারা দেশে জালের মতো বিছিয়ে দিয়েছেন সড়কপথ। রেলওয়েতে দেখতে না দেখতে বিপ্লব ঘটিয়েছেন। তার উন্নয়নের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছে দেশ-বিদেশের বহু অর্থনীতিবিদ, উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী।
বিস্ময়ের সঙ্গে আমরা লক্ষ করেছি করোনাকাল। বাংলাদেশের মতো একটি দরিদ্র দেশে তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় যেভাবে করোনা নিয়ন্ত্রণ এবং ভ্যাকসিন জোগাড় করা হয়েছে, তা অনেক মধ্য আয়ের দেশও করতে পারেনি। বিগত ১০ বছরের উন্নয়ন যদি সরলরেখায় এগোতে থাকে, তাতে আগামী ২০২৯ সালে দেশের চেহারা আমুল পালটে যাবে—এতে কোনো সন্দেহ নেই।
কিন্তু ধাক্কা খেতে হয়েছে তার সরকারকে কিছু বিষয়ে। করোনার অথনৈতিক ক্ষতি, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে খাদ্য সরবরাহ বিঘ্ন হওয়া এবং এই যুদ্ধসহ নানা কারণে মুদ্রাস্ফীতি। তার পরও মানুষের কষ্ট হলেও দেশকে তিনি এমন এক জায়গায় নিয়ে গিয়েছেন যে, কোনো মানুষকে না-খেয়ে মরতে হয়নি। আমরা অনুন্নত দেশগুলিতে এমনকি উন্নয়নশীল দেশের সামান্য অর্থনৈতিক ধাক্কা লাগলে মানুষের জীবনের দুর্বিপাক দেখতে পাই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। কিন্তু বাংলাদেশের এত প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও সেরকম কোনো দৃশ্য দেখা যায়নি। এর পেছনে শেখ হাসিনার অক্লান্ত পরিশ্রম রয়েছে।
এই মুহূর্তে দেশের অর্থনীতিকে মুদ্রাস্ফীতির লড়াই করতে হচ্ছে। কিন্তু সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দৃঢ় পদক্ষেপ নেবেন নিশ্চয়ই।
তার মধ্যে সহজাতভাবে আছে স্টেটম্যানসুলভ চরিত্র। পিতার যোগ্য কন্যা বলে কথা। কোনো দেশই কখনো পুরোপুরি তার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারে না, তা যত ধনী দেশই হোক। কিন্তু স্বপ্নের কাছাকাছি যেতে পারা স্বপ্নকে ছুঁয়ে ফেলারই শামিল। আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশ এবং বিশ্বের সামনে যে চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে, তা মোকাবিলার জন্য একজন শেখ হাসিনাকেই যেন আল্লাহ বারবার ক্ষমতায় নিয়ে আসছেন। ঠিক যেমন এ দেশটাকে পাকিস্তানি শোষকদের হাত থেকে মুক্ত করতে তারই পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাঠিয়েছিলেন।
রাষ্ট্র চালাতে হলে অকুতোভয় হতে হয়। ভীতু কেবল পেছন দিকেই যেতে পারে। এদিক দিয়ে দেশ সৌভাগ্যবান যে শেখ হাসিনার মতো একজন অকুতোভয় নেত্রীর হাতে দেশ আবার সোপর্দ হয়েছে। প্রয়াত ভারতের প্রেসিডেন্ট ও বিজ্ঞানী এ পি জে আবদুল কালাম বলেছিলেন, ‘নেতা কে, সে সম্পর্কে আমি একটি কথা বলি। নেতা সে-ই, যার মধ্যে ভিশন আছে এবং প্যাশন আছে। যিনি কোনো সমস্যাকে ভয় পান না। যিনি জানেন, সেই ভয়কে কীভাবে জয় করতে হবে। তার চেয়ে বড় কথা, যিনি ঐকান্তিক চেষ্টা করে যাবেন।’
আমরা আবারও তাকে পঞ্চম বার এবং টানা চতুর্থ বার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণে অভিনন্দন জানাই। তিনি আগামী পাঁচ বছরে বাংলার মানুষকে পৃথিবীর মানুষের কাছে একটি গর্বিত জাতি হিসেবে দাঁড় করাবেন। শুধু দেশবাসীই নয়, পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মাও শান্তি পাবে।
লেখক: সাংবাদিক

