শেখ হাসিনা জাতির পিতার কন্যা। আজকের বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের নেত্রী। তাকে পরাজিত করতে চাইলেও তিনি ফিরে এসেছেন শুধু জনগণের ভালোবাসায়। এ যেন সেই কথারই প্রতিধ্বনি, ‘তুমি যদি মানুষকে সত্যিই ভালোবাসো, তাহলে তারাও তোমাকে একই রকমভাবে ভালোবাসবে।’ সংগ্রামী নেত্রী থেকে রাজ্যের মসনদে বসা সেই মানুষটারই আজ জন্মদিন। ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন। সময়ের হিসাবে ৭৭তম জন্মদিনকে ছুঁয়ে ফেললেন জননেত্রী। দীর্ঘ চার দশকের রাজনীতিতে তিনি যেমন বিরোধী দলে ছিলেন, আবার বারবার নির্বাচিত হয়ে সরকারপ্রধান হিসেবে অধিষ্ঠিত হয়েছেন এবং এখনো আছেন। তার রাজনীতির নেতৃত্ব, বিচক্ষণতা এখন দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্ব অভিমুখে। সমগ্র বিশ্বের রাজনীতিবিদদের বা রাষ্ট্রনায়কদের শ্রদ্ধার আসনেও তিনি এখন সমাসীন।
বর্তমান পর্যায়ে আসতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে বহু ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করতে হয়েছে। ১৯৭৫ সালের পট পরিবর্তনের পর ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের নেতারা দলকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করতে শেখ হাসিনাকে সর্বসম্মতিক্রমে দলীয় সভাপতি নির্বাচিত করেন। বিদেশে ছয় বছরের নির্বাসিত জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে তিনি ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরেছিলেন এক বেদনাবিধূর ভগ্নহূদয় নিয়ে। বনানী কবরস্থানে গিয়ে মা ও নিহত পরিজনের সমাধিপাশে আকুল কান্নায় ভেঙে পড়েন। পঁচাত্তরের আগস্টের শোকের ছায়ায় নিজের বাবা, মা, ভাইদের ও পরিজনদের হারানোর শোক উথলে উঠল পুনর্বার। জিয়ারত শেষে মায়ের কবরের পাশে গিয়ে স্বগতোক্তি করেন, ‘মা, আমাকে কেন রেখে গেলে?’ তিনি যেদিকে তাকান, সেটি যেন শোকে মুহ্যমান। পরিবেশ বড়ই অচেনা, অজানা। কিন্তু তিনি সাহস পেলেন! জনগণের ভালোবাসার সাহস।
তাইতো সেদিনের সংবর্ধনাসভার শুরুতেই আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বললেন, ‘আসুন, আবার আমরা এক হই।’
নেতৃত্বের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক দল সফলতা অর্জন করতে পারে। আবার নেতৃত্বের জন্য দরকার জনসমর্থন। রাষ্ট্রনায়কত্বের সঙ্গে নেতৃত্বের গভীর সম্পর্ক আছে বলেই তিনি বিশ্ববাসীর কাছে ভবিষ্যত্ বাংলাদেশের পরিকল্পনার কথা বলতে পারেন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বের দূরদৃষ্টির কারণেই বাংলাদেশ এখন অনন্য। সাম্প্রতিক ভারতে অনুষ্ঠিত জি-২০-এর বিশ্বনেতাদের সম্মেলনে আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জোর দেন সংঘাতের বদলে সহযোগিতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের ওপর। আমন্ত্রিত অতিথি হয়েও শেখ হাসিনা তার ভাষণে আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে উল্লেখ করে বলেন, করোনা-পরবর্তী সমাজ থেকে জলবায়ু পরিবর্তন—এই সব চ্যালেঞ্জ আমাদের বাধ্য করছে এক বিশ্ব ও সমাজ আঁকড়ে ধরতে, যাতে শান্তি ও প্রগতির পাশাপাশি মানবসভ্যতার ভবিষ্যত্ সুরক্ষিত থাকে।
রাজনীতি বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয়, নেতৃত্বের অবদান থাকবে সমাজজীবনের প্রতিটি স্তরে। রাষ্ট্রে, সমাজে, পরিবারে, কলকারখানায়, অফিস-আদালতে, খেলার মাঠে, অর্থাত্ সর্বস্তরে। আমরাও তাই দেখছি, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের কারণে বয়স্ক, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্ত, প্রতিবন্ধী ও মুক্তিযোদ্ধা ভাতাসহ প্রান্তিক মানুষের জন্য বিভিন্ন ভাতা চালু হয়েছে। এসব ভাতাভোগীর সংখ্যা এবং টাকার পরিমাণ উভয়ই বাড়ানো হয়েছে। সমাজের সব অনগ্রসর শ্রেণির মানুষ যেমন—হিজড়া, বেদে, হরিজন, সুইপার, চা-শ্রমিক—এদের জন্য বাসস্থান, চিকিত্সা, শিক্ষাভাতা ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় এখন প্রায় সাড়ে ৪ কোটি মানুষ উপকৃত হচ্ছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলে থাকেন, যোগ্য নেতৃত্বের প্রভাবে একটি সমাজ সফলতার শিখরে আরোহণ করতে পারে।
বিশ্ব এখন অতিমারির যুগ অতিক্রম করে রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে নানামুখী সংকটে আবর্তিত হচ্ছে। ইউরোপের উন্নত দেশসহ এশিয়ার অনেক দেশ অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। বেকার হয়ে গেছে পৃথিবীর কয়েক কোটি মানুষ। বন্ধ হয়ে গেছে অনেক শিল্পকারখানা। কিন্তু আমাদের দেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অর্থনৈতিকভাবে আমরা এখনো সচল আছি। ইতিহাসবিদ ইয়োভাল নোয়া হারারি এই বছরের শুরুর দিকে বিবিসিকে বলেছিলেন, ‘বিশ্বায়নের পরিবর্তে জাতীয়তাবাদী একলা চলো নীতি অনুসরণ করবে অনেক রাষ্ট্র।’ রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে এটা ক্রমশ স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে। বিশ্ব নানামুখী সংকটে আবর্তিত হচ্ছে। এই সংকট মোকাবিলার জন্য শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক ফোরামে কথা বলা শুরু করেছেন। গত ২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৭৮তম অধিবেশনে তিনি বিশ্বব্যাপী নানা সংকট মোকাবিলায় বিশ্বের সব রাষ্ট্রকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি যথার্থই বলেছেন, ‘সবার জন্য নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ ও টেকসই ভবিষ্যত্ গড়ে তোলার জন্য অভিন্ন সংকট মোকাবিলায় আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এজন্য আমাদের অবশ্যই বিভাজন, সংকীর্ণতা ও বিচ্ছিন্নতার বিপরীতে একতা, সহমর্মিতা ও বহুপাক্ষিকতা বেছে নিতে হবে। শান্তি ও টেকসই সমৃদ্ধি অর্জনের উদ্দেশ্যে আমাদের অবশ্যই সুবিচার, ন্যায় ও ন্যায্যতার নীতি অনুসরণ করতে হবে, যার ভিত্তি হবে জাতিসংঘ সনদ এবং ২০৩০ এজেন্ডা।’
আজকের বাংলাদেশের এই সফলতার পেছনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবদান অনেক। দুঃসময়ে রাজনীতির হাল ধরেছিলেন বলেই তিনি আজ বিশ্বনেতৃত্বের কাতারে। আজ প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানাই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংগীতাংশের মাধ্যমে—‘ব্যক্ত হোক জীবনের জয়/ ব্যক্ত হোক তোমামাঝে/ অসীমের চিরবিস্ময়।’
লেখক: অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক উপ-উপাচার্য, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়