বিশ্বকাপ, ফিরে দেখা

বোল্ট-স্টার্কের যুদ্ধ, শেষের নায়ক উইলিয়ামসন

ভারতের মাটির ২০২৩ বিশ্বকাপ সামনে রেখে ‘দৈনিক ইত্তেফাক’-এ চলছে আগের বিশ্বকাপগুলোর স্মৃতিচারণা পর্ব ‘ফিরে দেখা’। আজ এই পর্বের দ্বিতীয় কিস্তিতে থাকছে ২০১৫ বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার সেই গ্রুপ পর্বের ম্যাচটি। ম্যাচটি দুই দলের দুই পেসার ট্রেন্ড বোল্ট ও মিচেল স্টার্কের ‘যুদ্ধ’ হিসেবেই ঠাঁই করে নিয়েছে ইতিহাসের পাতায়।

বোল্ট ও স্টার্কের অগ্নিঝরা বোলিং প্রদর্শনীতে লো স্কোরিং ম্যাচটিও রূপ নিয়েছিল চরম উত্তেজনাকর এক ম্যাচে। ‘দ্য ক্রিকেট মান্থলি’র বিচারে অকল্যান্ডের ইডেন পার্কের সেই ম্যাচ জায়গা করে নিয়েছে সর্বকালের সেরা ওয়ানডে তালিকার ১৬ নম্বরে। মজার বিষয় হলো, বোল্ট ও স্টার্কের সেই যুদ্ধের শেষের নায়ক ছিলেন কেন উইলিয়ামসন। স্টার্কের তোপের মুখে দলের উইকেট পতনের মিছিলেও এক প্রান্ত আগলে রেখে তিনি যেভাবে বুক চিতিয়ে লড়াই করে নিজ দল নিউজিল্যান্ডকে জয় পাইয়ে দিয়েছিলেন, তা সত্যিই অবিশ্বাস্য।

দুই প্রতিবেশী দেশ অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের যৌথ আয়োজনের ২০১৫ আসরটি ছিল বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম রানপ্রসবা। আসরের বেশির ভাগ ম্যাচেই দলগুলো ৩০০ পেরোনো স্কোরের নজির গড়ে। এমনকি তিন বার দেখে ৪০০ পেরোনো স্কোরও। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ চারটি দলীয় সংগ্রহের ইনিংসের তিনটিই ঐ বিশ্বকাপে। তার মধ্যে আছে বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহের ইনিংসটিও। ৪১৭/৭-এর  সেই কীর্তিটা গড়ে অস্ট্রেলিয়া, আফগানিস্তানের বিপক্ষে। ওপরে উল্লেখিত নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে রোমাঞ্চকর ম্যাচের ঠিক পরের ম্যাচেই।

অথচ ২৮ ফেব্রুয়ারি অকল্যান্ডের ইডেন পার্কের আলোচিত ম্যাচটিতে দুই দল মিলে করেছিল ৩০৩ রান! ৫০-৫০, ১০০ ওভারের ম্যাচে দুই দল মিলে ব্যাট করে মাত্র ৫৫.৩ ওভার। তার পরও ম্যাচটি স্নায়ুক্ষয়ী উত্তেজনার প্রদর্শনী হয়ে ওঠার কারণ, ঐ ৫৫.৩ ওভার স্থায়িত্বের ম্যাচেই উইকেট পড়ে ১৯টি! হারতে হারতে নিউজিল্যান্ড ম্যাচ জেতে ১ উইকেটে—কেন উইলিয়ামসন ছক্কা মেরে দলকে পৌঁছে দেন লক্ষ্যে। অস্ট্রেলিয়া ৩২.২ ওভারে অলআউট হয় ১৫১ রানে। নিউজিল্যান্ড ২৩.১ ওভারে ৯ উইকেট হারিয়ে করে ১৫২।

ইডেন পার্কের পিচ ছিল এক কথায় পেস বোলিংয়ের মঞ্চ। দুই দলের পেসাররাই মেতে ওঠেন গতি, বাউন্স আর সুইং প্রদর্শনীর খেলায়। পেস বোলারদের আগুনে বোলিংয়ের সামনে ব্যাটসম্যানদের কোমর সোজা করে দাঁড়িয়ে থাকাই হয়ে উঠেছিল দায়!  বিশেষ করে বোল্ট ও স্টার্ক ব্যাটসম্যানদের জন্য বড় যমদূত হয়ে উঠেছিলেন। বোল্টের গতি-সুইং-বাউন্সের প্রদর্শনীতে প্রথমে ব্যাট করতে নামা অস্ট্রেলিয়া মাত্র ১৫১ রানে অলআউট হয়ে যায়। সেটাও ১০৬ রানে ৯ উইকেট হারানোর  ব্র্যাড হাডিন ও প্যাট কামিন্সের ৪৫ রানের শেষ জুটিতে। ৪৩ রান করে হাডিন শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হন। কামিন্স অপরাজিত থাকেন ৭ রানে। বোল্ট ১০ ওভারে ২৭ রান দিয়ে নেন ৫ উইকেট।

নিজ দলের বোলারদের বোলিং দেখেই কিউইরা বুঝে যান, লক্ষ্য ছোট হলেও ভয়ংকর পিচে ধীরেসুস্থে ব্যাটিং নীতিতে হাঁটাটা হবে আত্মঘাতী। তাই ব্রেন্ডন ম্যাককালাম ব্যাট হাতে শুরুতেই ঝড় তোলেন। ৩টি ছক্কা ও ৭ চারে ২২ বলেই হাফ সেঞ্চুরি করে আউট হন। তার ইনিংসের সুবাদে নিউজিল্যান্ড ৭.৪ ওভারেই ১ উইকেটে করে ফেলে ৭৮ রান। এর পরই শুরু হয় ভেট্টোরি, কামিন্স ও স্টার্কের তাণ্ডব। বিশেষ করে স্টার্ক হয়ে ওঠেন সাক্ষাৎ অগ্নিমূর্তি। তবে বোল্টের গতি-সুইংয়ের জবাবে স্টার্ক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে একের পর এক উইকেট নিলেও কেন উইলিয়াসমনকে আউট করতে পারেননি। স্টার্ক-তাণ্ডবে ১৪৬ রানে ৯ উইকেট হারানোর পরও তাই বিজয়ী হয় নিউজিল্যান্ড। কামিন্সকে ছক্কা মেরে ম্যাচ খতম করে দেন উইলিয়ামসন। অপরাজিত ৪৫ রানের ইনিংস খেলে তিনি মাঠ ছাড়েন বিজয়ীর বেশে। ২৮ রান খরচায় ৬ উইকেট নিয়েও স্টার্ককে মাঠ ছাড়তে হয় পরাজয়ের বেদনায় মাথা নিচু করে। আইসিসির ম্যাচ অ্যাডজুকেটিভদের রায়ে ম্যাচ-সেরা হয়েছিলেন ট্রেন্ট বোল্ট। তবে জনতার ম্যাচ-সেরা ছিলেন উইলিয়ামসনই।