নির্বাচন কমিশনের সূত্র অনুযায়ী আগামী নভেম্বরের শুরুর দিকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করা হইবে এবং নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে। এই উপলক্ষে সকল রকমের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হইতেছে। সেই প্রস্ততির অংশ হিসাবে কিছুদিন পূর্বে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট আয়োজিত ইউএনও বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কর্মশালার উদ্বোধন করিয়াছেন। ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের প্রধান দায়িত্ব হইল ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা, ভোটার রেজিস্ট্রেশন কাজে নিয়োজিত তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজারদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি করা। এই প্রতিষ্ঠানের মিশন বা অভিলক্ষ্য হইল—নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সহিত সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের জ্ঞান, দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের জন্য অবাধ, সুষ্ঠু, বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকর নির্বাচনের ব্যবস্থা করা; কিন্তু প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য যতই মহৎ হউক, গ্রাউন্ড সিচ্যুয়েশন বা নির্বাচনের মাঠে-ময়দানের খবর যাহারা রাখেন, তাহাদের নিকট এই প্রশিক্ষণের গুরুত্ব তেমন একটা আছে বলিয়া প্রতীয়মান হয় না।
বর্তমানে মাঠে-ঘাটে, শহরে-বন্দরে, গ্রামগঞ্জে—সকল ক্ষেত্রে আলোচনা চলিতেছে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন লইয়া। এখন দেখিতে হইবে কাহারা প্রশিক্ষণ দিতেছেন এবং কাহারা নির্বাচন অনুষ্ঠানে পালন করিবেন মুখ্য ভূমিকা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে যাহারা নির্বাচন কমিশন সচিবালয় বা সরকারের অন্যান্য মন্ত্রণালয় কিংবা বিভাগে কর্মরত, তাহারাই এখন প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করিতেছেন। যেইখানে প্রশাসনসহ সকল ক্ষেত্রে দলীয় পক্ষপাতপুষ্ট লোকের ছড়াছড়ি, সেইখানে তাহারা কী প্রশিক্ষণ দিবেন, তাহাও ভাবিয়া দেখিবার বিষয়। ইহা ছাড়া নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলিতেছেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ডিসি বা জেলা প্রশাসকরাই রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করিবেন। ইউএনও বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা থাকিবেন সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসাবে। প্রতি ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করিবেন প্রিজাইডিং অফিসার, যাহাদের সংখ্যা এবার ৫২ হাজারেরও অধিক। প্রতি ভোটকক্ষে একজন করিয়া আড়াই লক্ষাধিক সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার দায়িত্ব পালন করিবেন। তাহারা হইলেন—সরকারের প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা, সরকারি-বেসরকারি স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, ব্যাংক কর্মকর্তা প্রমুখ। ইতিমধ্যে তাহাদের যেই তালিকা প্রস্তুত করা হইয়াছে, সেই সম্পর্কে অনেক ক্ষেত্রে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা অবগত নন বলিয়া জানা যায়। ইহার পর রহিয়াছে পোলিং অফিসার, পোলিং এজেন্ট, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ইত্যাদি—সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে যাহাদের প্রত্যেকের ভূমিকা কম গুরুত্বপূর্ণ নহে; কিন্তু বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় কর্মরত এই কর্মকর্তাদের পক্ষে রাখিতে ইতিমধ্যে দৌড়ঝাঁপ শুরু হইয়া গিয়াছে বলিয়া জানা যায়। কোনো কোনো ইউএনও ও ডিসির প্রকাশ্য কথাবার্তাও সুবিধাজনক মনে হইতেছে না। যেইখানে নির্বাচনে তাহাদের নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করিবার কথা, সেইখানে তাহারা কোনো কোনো ক্ষেত্রে অর্থের নিকট বিক্রয় হইয়া যান। স্থানীয় নেতা-পাতি নেতাদের হুকুম মতো চলেন, যাহাদের হামলা-মামলার কারণে সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা ঘরেই থাকিতে পারিতেছেন না, নির্বাচনি মাঠে দাঁড়াইয়া থাকা তো দূরের কথা। এই কারণেও অনেকে চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন।
উপর্যুক্ত নেতা-পাতিনেতাদের বেপরোয়া আচরণের কারণে অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠান লইয়া প্রশ্ন দেখা দিয়াছে। তাহাদের প্রভাবে ইউএনও-ওসি ও ডিসি-এসপিরা যে পক্ষপাতমূলক আচরণ করিবেন না, তাহার নিশ্চয়তা কোথায়? একযোগে সমগ্র দেশে ৩০০ আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে। সেই ক্ষেত্রে প্রত্যন্ত অঞ্চলসমূহে নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণ কতটা থাকিবে, যেইখানে এখনই কোনো কোনো ক্ষেত্রে ওসি-এসপিরা নির্বাচন কমিশনকে পরোয়া করিতেছেন না? যাহারা প্রশিক্ষণ দিতেছেন তাহারা এই দেশেরই সন্তান। তৃণমূল পর্যায়ের এই পরিস্থিতি সম্পর্কে তাহারা অবগত নন—এমন দাবি আমরা করি না। তাহা ছাড়া ইহার পূর্বে আমরা দেখিয়াছি—নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয় নাই। ম্যাজিস্ট্রেট হাতেনাতে সিসিটিভি ক্যামেরার তার বিচ্ছিন্নকারীদের ধরিলেও কমিশন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে পারে নাই। যদিও সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনকালীন প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা নির্বাচন কমিশনের অধীনস্থ; কিন্তু ইতিপূর্বেকার ছোট ছোট নির্বাচনে তাহার প্রমাণ পাওয়া যায় নাই। এই পরিস্থিতিতে প্রশিক্ষণ দিয়া কী লাভ—এমন প্রশ্ন করা কি অযৌক্তিক?