কুক্ষিগত করিবার পরিণতি ভালো হয় না

প্রকৃত বন্ধু কে? যিনি মরুতপ্ত রোদে, তুষারাবৃত পথে, কৃষ্ণঘন রজনীতে কিংবা সকল ধরনের প্রতিকূল পরিবেশে পাশে থাকেন—তিনিই প্রকৃত বন্ধু। বন্ধুত্বের দর্পণে বাংলায় একটি প্রবাদ রহিয়াছে—‘সুসময়ে অনেকেই বন্ধু বটে হয়, অসময়ে হায় হায় কেহ কারো নয়।’ এই জন্য আমরা দেখিতে পাই—প্রকৃতিতে যখন ফুলের মেলা বসে, গাছে গাছে যখন সবুজ পাতার ছড়াছড়ি হয় তখনই প্রজাপতির মেলা বসে। মৌমাছি ব্যস্ত হয় মৌ সংগ্রহে। শীতের শীর্ণগাছে কোকিল বসিতে দেখা যায় না। কিন্তু বসন্তে গাছে গাছে যখন গজাইয়া উঠে নূতন কুঁড়ি আর হরিত্পত্র—বসন্তের কোকিল তখন কুহু কুহু রবে মাতোয়ারা করিয়া তোলে সারা এলাকা। যুগে যুগে বসন্তের কোকিলেরা এইভাবে সুসময়ে আসিয়া সমস্ত চরাচরে তাহাদের কণ্ঠের দাপটে রাষ্ট্র করিয়া দেয়—তাহারা আছে, তাহারা-ই কেবল আছে। জগতে যেন আর কেহ নাই। অতঃপর বসন্ত ফুরাইলে তাহারা আবার অন্তরালে চলিয়া যায়। আবার অপেক্ষায় থাকে নূতন বসন্তের।

ফুলবাগানের মৌ-লোভী মৌমাছি কিংবা বসন্তের কোকিলের মতোই সুযোগসন্ধানীদের কথা ইতিহাসের পাতায় পাতায় লিপিবদ্ধ আছে। আর ইতিহাসের দুই লাইনের ফাঁকে যেই না বলা কথাগুলি লুকাইয়া থাকে আছে—তাহা অনুধাবন করা চাই। নচেত্ ইতিহাসের পাঠ সম্পূর্ণ হয় না। ইতিহাসেই দেখা যায়, যাঁহারা সকল কিছু নিজের নিকট কুক্ষিগত করিতে চাহেন, তাঁহাদের অবস্থা শেষাবধি পরিহাসে পরিণত হয়। দশকের পর দশক ধরিয়া আফ্রিকা বিভিন্ন দেশে যাঁহারা ক্ষমতায় ছিলেন, তাঁহাদের যখন পতন হয় দেখা যায় যে—উহার নেপথ্যে রহিয়াছে তাহাদেরই তথাকথিত বিশ্বস্ত লোক। অথচ একটি সময় পর্যন্ত সকল কিছুই তাহাদের কুক্ষিগত ছিল। এককভাবে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কয়েক দশক ধরিয়া তাহারা ক্ষমতায় থাকিয়া সাময়িকভাবে লাভবানও হইয়াছিলেন বটে, কিন্তু পতনের পর তাহাদের পরিণতি হয় তাসের ঘরের মতো। সুতরাং সকল কিছু কুক্ষিগত করিবার সুদূরপ্রসারী এই প্রতিক্রিয়া উপেক্ষণীয় নহে। এই উদাহরণের শেষ নাই। নিকট প্রতিবেশীর ঘরেও এই উদাহরণ রহিয়াছে। পশ্চিমবঙ্গের ৩৪ বত্সরের বাম-জামানার সেইখানে বিন্দু হইতে সিন্ধু অবধি সকল কিছুর মধ্যে কেবল কাস্তে-হাতুড়ি ও লাল রং দেখা যাইত। লক্ষ লক্ষ পিপীলিকার স্রোতের মতো চারিদিকে ছিল কেবল তাহাদেরই কর্মী। কিন্তু যখন তাহাদের পতন ঘটিল, তাহার কয়েক বত্সর পর দেখা গেল, পতনের এপিটাফে প্রদীপ দেওয়ার মতো সামান্য কর্মীও নাই। কোথায় গেল সেই লক্ষ লক্ষ কর্মীর বাঁধভাঙা স্রোত? সুতরাং কাহারা বসন্তের কোকিল আর কাহারা প্রকৃত বন্ধু—সেই ব্যাপারে সচেতন না হইলে সিদ্ধান্ত গ্রহণেও ভুল হইতে পারে। যেমনটি হইয়াছিল বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলার। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে শুরুতে নবাব সিরাজউদ্দৌলা বুঝিতেই পারেন নাই তাঁহার সবচাইতে কাছের লোকজনই ষড়যন্ত্রে শামিল হইয়াছেন। যুদ্ধের একপর্যায়ে নবাবকে বিভ্রান্ত করিয়া যুদ্ধবিরতির পরামর্শ দেন তাঁহারই নিকটজন। সুতরাং শক্তিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকিলেও প্রকৃত বন্ধুর অভাবে পরাজয়ের শিকল পায়ে জড়াইতে পারে। 

ক্ষমতাকে যদি বসন্তের সহিত তুলনা করা যায়, তাহা হইলে এই বসন্তের সময় সকল পাখিই ‘কোকিল’ হইতে চাহে। সুতরাং প্রকৃত বন্ধু না চিনা এবং বসন্তের কোকিলদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হইবার পরিণতি ইতিহাসে যাহা লেখা আছে—তাহার পাঠ কম গুরুত্বপূর্ণ নহে।