গরু ও মুরগির খাবারে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার

আগে দুধে ভেজাল দেওয়া বলিতে আমরা কেবলই পানি মিশানোকেই বুঝিতাম। কিন্তু আদর্শ খাবার দুধে এখন বহু প্রকার ভেজালের খবর পাওয়া যাইতেছে। দুধে পানি মিশানো এক প্রকারের প্রতারণা। এই দুধ খাইয়া আর্থিক ছাড়া তেমন কোনো ক্ষতি নাই। কিন্তু দুধে যদি এমন ভেজালের অস্তিত্ব খুঁজিয়া পাওয়া যায়, যেখানে শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কা সর্বাধিক, তাহা হইলে তাহা বিপজ্জনকই বটে। সমপ্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের পরীক্ষায় বাজারে প্রচলিত সাতটি পাস্তুরিত দুধে মানব চিকিত্সায় ব্যবহূত মাত্রাতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি পাওয়া গিয়াছে। ইহা ছাড়া পাস্তুরিত দুধের সাতটি নমুনার তিনটিতে ও অপাস্তুরিত দুধের তিনটিতে পাওয়া গিয়াছে ডিটারজেন্ট। ফরমালিনের উপস্থিতি মিলিয়াছে পাস্তুরিত ও অপাস্তুরিত দুধের মোট ১০টি নমুনার একটিতে। সমপ্রতি খাদ্যপণ্যের গুণগত মান নিয়া সরকার ও জনগণের উদ্বেগ প্রকাশের কারণে বাজার হইতে বেশ কয়েকটি খাদ্যপণ্য সংগ্রহ করিয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টার ও ফার্মেসি অনুষদের বিভিন্ন ল্যাবরেটরিতে বিএসটিআইয়ের মানের সঙ্গে তুলনা করিয়া পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়।

সেই পরীক্ষায় পাস্তুরিত ও অপাস্তুরিত দুধের ১০টি নমুনাতেই সলিড নট ফ্যাট যে পরিমাণ থকিবার কথা, তাহার অনেক কম পাওয়া গিয়াছে। তাহা ছাড়া অ্যাসিডিটি অ্যানালাইসিস, টোটাল ব্যাকটেরিয়া ও কলিফর্ম কাউন্টেও তাহা মানোত্তীর্ণ হইতে পারে নাই। সবচাইতে উদ্বেগজনক বিষয় হইল পাস্তুরিত দুধে অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি। সেইখানে মানবচিকিত্সায় ব্যবহূত অ্যান্টিবায়োটিক লেভোফ্লক্সসিন, অ্যান্টিবায়োটিক সিপ্রফ্লক্সসিন ও অ্যান্টিবায়োটিক এজিথ্রোমাইসিনের উপস্থিতি লক্ষ করা গিয়াছে।  মাত্রাতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক যে গরুকে খাওয়ানো হয়, সেই গরুর দুধ পান ও মাংস ভক্ষণের কারণে আমাদের শরীরের ওপর তাহার ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। শুধু গরু নহে, ব্রয়লার মুরগিতেও অতিমাত্রায় ব্যবহূত হইতেছে অ্যান্টিবায়োটিক। খামারিরা এই ব্যাপারে তেমন সচেতন নহে। ইহাতে সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়িতেছে। সম্প্রতি এক ল্যাব টেস্টে ব্রয়লার মুরগি ও মুরগির ডিমের ১৪টি নমুনার সব কয়টিতে ক্রোমিয়াম পাওয়া গিয়াছে। আর রিটেইল মার্কেট পর্যায়ে মুরগিতে ই-কোলাই ও সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়া এবং পাঁচ ধরনের ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি পাওয়া গিয়াছে।

খামারের গরু ও মুরগির দ্রুত বৃদ্ধি ও অসুখ-বিসুখ প্রতিরোধে মাত্রাতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহূত হইতেছে। ইহার প্রভাবে মানুষের রোগ-প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়া যাইতেছে। বাংলাদেশ একটি স্বল্প আয়তনের দেশ, যেখানে প্রায় ১৭ কোটি মানুষ বসবাস করে। জনবহুল এই দেশে পুষ্টির চাহিদা মিটানো চ্যালেঞ্জ স্বরূপ। এইজন্য খামারে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করিতে হইবে, ইহাতে কোনো সন্দেহ নাই। কিন্তু সেই সঙ্গে ইহাও দেখিতে হইবে, যাহাতে মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কোনো উপাদান ব্যবহার করা না হয়। গরু বা মুরগির খামারে কী ধরনের ও কী মাত্রায় খাবার ও  ঔষধপত্র ব্যবহার করা হইতেছে, তাহা সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণ সংস্থার নজরদারির মধ্যে থাকা উচিত। জাতীয় স্বাস্থ্য ও চিকিত্সাব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাইতেই খামারের গরু ও পোলট্রি মুরগির ওপর মাত্রাতিরিক্ত অ্যান্টিবায়েটিকের ব্যবহার অবশ্যই বন্ধ করিতে হইবে।